
অনেকেই নানান কারণে টিন সার্টিফিকেট করেছেন। কিন্তু তা আর কাজে আসছে না। তাই জেনে নিন যেভাবে অনলাইনে টিন সার্টিফিকেট চাইলেই বাতিল করা যায়।
ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন হলো করদাতার জন্য নির্ধারিত একটি ইউনিক নম্বর। বাংলাদেশে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আয়কর-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে এই নম্বর ব্যবহার করা হয়। করদাতার পরিচিতি হিসেবেও কাজ করে টিআইএন বা টিন সার্টিফিকেট। আয়, কর পরিশোধ এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্যের সঙ্গে করদাতাকে শনাক্ত করতে সরকারের কাছে এর গুরুত্ব রয়েছে।
অনেকেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ভিসার আবেদন কিংবা বিভিন্ন দাপ্তরিক প্রয়োজনের কারণে টিন সার্টিফিকেট করে থাকেন। কিন্তু পরে সেই প্রয়োজন না থাকলেও টিআইএন সক্রিয় থেকে যায়। এর ফলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া নিয়ে অনেকেই সমস্যায় পড়েন।
টিআইএন থাকলে ব্যক্তির ওপর আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। কারো করযোগ্য আয় বা সম্পদ না থাকলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী শূন্য রিটার্ন (জিরো রিটার্ন) দাখিলের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অনেকেই বিষয়টি না জানায় বা ঝামেলা এড়াতে রিটার্ন জমা দেন না। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে টিন সার্টিফিকেট বাতিলের সুযোগ রয়েছে। এর জন্য সাধারণত আলাদা কোনো ফি দিতে হয় না। অবশ্য শুধু টিআইএন আর ব্যবহার করছেন না এমন কারণেই যে সেটি বাতিল করা যাবে, তা নয়। নির্দিষ্ট কারণ ও শর্ত পূরণ করতে হয়।
কোন পরিস্থিতিতে টিন সার্টিফিকেট বাতিল করা যায়?
টিআইএন বাতিলের ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়। যেমন-
ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট টিআইএন বাতিলের প্রয়োজন হতে পারে।
ভুল করে একাধিক টিআইএন হলে
কোনো কারণে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক টিআইএন তৈরি হয়ে গেলে প্রয়োজনীয় একটি রেখে অন্যটি বাতিল করার আবেদন করা যেতে পারে।
টিআইএন আর ব্যবহার করার প্রয়োজন না থাকলে
কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য টিআইএন নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সেটির আর প্রয়োজন না থাকলে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে।
আয় করসীমার নিচে নেমে গেলে
কোনো ব্যক্তির আয় কমে গিয়ে যদি তিনি করযোগ্য সীমার বাইরে চলে যান এবং টিআইএন রাখার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে বাতিলের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি
কোনো বাংলাদেশি নাগরিক কাজের কারণে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকেন এবং বাংলাদেশে তার কোনো করযোগ্য আয় না থাকে, তাহলে দেশে থাকা অবস্থায় নেওয়া টিআইএন বাতিলের জন্য আবেদন করতে পারেন।
করদাতার মৃত্যু হলে
কোনো করদাতা মারা গেলে তার টিআইএন আর প্রয়োজন না থাকায় সেটি বাতিল করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আবেদন করতে হয়।
তবে মৃত ব্যক্তির নামে কোনো ব্যবসা বা এমন কার্যক্রম থাকলে, টিআইএন বাতিলের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যবসার কাগজপত্রও বাতিল করে নতুন করে করার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকারীরা টিআইএন বাতিলের আবেদন করতে পারবেন না এ বিষয়টি আগে যাচাই করা জরুরি।
কীভাবে টিন সার্টিফিকেট বাতিল করবেন?
টিন সার্টিফিকেট বাতিলের প্রক্রিয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অনলাইনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কাগজপত্রের মাধ্যমেও আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে।
অনলাইনে টিআইএন বাতিলের আবেদন
বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ই-টিন সার্টিফিকেট বাতিল করার জন্য একটি সহজ অনলাইন পদ্ধতি চালু করেছে। এজন্য-
# প্রথমে এনবিআর nbr.gov.bd ওয়েবসাইটে যান।
# লগইন করুন।
# যদি আপনার এনবিআর ই-টিন অ্যাকাউন্ট না থাকে, তাহলে সবার আগে সাইন আপ করে অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। যদি অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে লগইন করুন।
# এনবিআর-এর সাইটে গিয়ে টিন বাতিলের জন্য আবেদন ফর্ম পূরণ করুন। এই ফর্মে আপনাকে আপনার টিন নম্বর, পণ্য/সেবা বা ব্যবসার বিবরণ এবং বাতিলের কারণ সহ বিভিন্ন তথ্য দিতে হবে।
# ফর্ম পূরণ করার পর সেটি সাবমিট করুন।
# প্রয়োজন হলে আপনাকে জানানো হবে।
# আবেদন গৃহীত হলে আপনাকে টিন বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হবে।
#অফলাইনেও টিন সার্টিফিকেট বাতিল করা সম্ভব।
যদি অনলাইনে আবেদন করা সম্ভব না হয়, তবে আপনি স্থানীয় রেজিস্ট্রেশন অফিস বা কাস্টমস অফিসে বাতিলের আবেদন করতে পারেন। এজন্য-
প্রথমে আপনার ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানের সব তথ্য প্রস্তুত করুন। যেমন: টিন নম্বর, প্রতিষ্ঠানের নাম/ব্যক্তির নাম, ব্যবসার বা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা (বন্ধ/অবসর) ইত্যাদি।
যখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করবেন, তখন আপনাকে নির্দিষ্ট কাগজপত্র জমা দিতে হবে, যেমন-টিন সার্টিফিকেট, প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার বন্ধ হওয়ার ঘোষণা (যদি প্রযোজ্য হয়), আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র।
পর পর কমপক্ষে তিন অর্থ-বছরের শূন্য কর রিটার্ন দাখিলের প্রাপ্তি স্বীকার পত্রের ফটোকপি সঙ্গে দিতে হবে।
এই কাগজপত্রগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে দাখিল করার পর, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আপনার আবেদন পর্যালোচনা করবে এবং তারপর টিন বাতিল করা হবে।
একবার আপনার টিন সনদ বাতিল হলে, আপনাকে একটি টিন বাতিলের সনদ প্রদান করা হবে, যা আপনি পরে ব্যবহার করতে পারবেন।
টিন সার্টিফিকেট বাতিলের পর কী হবে?
আবেদন অনুমোদিত হলে টিআইএন বাতিলের সনদ দেওয়া হতে পারে। একবার টিন সার্টিফিকেট বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট টিন ব্যবহার করে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না এবং ওই টিআইএনের সঙ্গে সম্পর্কিত আয়কর নথি বা দায়ও প্রযোজ্যতার ভিত্তিতে আর থাকবে না। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি টিন সার্টিফিকেট একবার বাতিল হয়ে গেলে পুরোনো টিন সার্টিফিকেট পরে আবার ব্যবহার করা যাবে না। ভবিষ্যতে যদি আবার টিন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়, তাহলে নতুন করে টিআইএনের জন্য আবেদন করতে হবে।
তাই শুধু রিটার্ন জমা দেওয়ার ঝামেলা এড়াতে তাড়াহুড়ো করে টিআইএন বাতিলের সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগে নিজের বর্তমান আয়, সম্পদ, ব্যবসা এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনা করা উচিত। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ বা কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
আরটিভি/এমএ



