ঢাকা রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

পলিথিনের বিষাক্ত ফাঁদে বিশ্ব: বায়োপলিব্যাগ ও কাগজেই কি সুস্থ পৃথিবীর চাবিকাঠি?

মো. খাদেমুল ইসলাম

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।

সকালবেলা কাঁচাবাজারের থলে থেকে শুরু করে শপিং মল, মুদি দোকান কিংবা রেস্তোরাঁর খাবারের পার্সেল—আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপেই পলিথিন ও সাধারণ প্লাস্টিক ব্যাগের উপস্থিতি অনস্বীকার্য। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবহার শেষে ছুড়ে ফেলা এই প্লাস্টিক সামগ্রীই আজ আমাদের সামগ্রিক পরিবেশের জন্য সবচেয়ে স্থায়ী অভিশাপে পরিণত হয়েছে।

রাস্তার পাশে জমে থাকা প্লাস্টিক, ড্রেন বা নিকাশী নালায় জট পাকানো পলিথিন কিংবা নদীর তলদেশে জমা হওয়া বর্জ্যের পাহাড় কেবল আমাদের পরিবেশগত অসচেতনতার দীর্ঘস্থায়ী চিহ্নই নয়, বরং মাটির উর্বরতা ধ্বংস করে এবং বাস্তুসংস্থানকে এক মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসচেতনতা জমানো এই অপচনশীল বর্জ্যই আজ বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান অনুঘটক। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে পরিবেশকে রক্ষা করতে প্রচলিত প্লাস্টিকের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় শুধু উপস্থিতই হয়নি, বরং তা জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রচলিত প্লাস্টিক মাটি ও জলাশয়ের সঙ্গে সহজে মিশতে পারে না। শত শত বছর ধরে এটি মাটিতে অপরিবর্তিত অবস্থায় পচে না গিয়ে থেকে যায় এবং চারপাশের পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য হিসেবে ফেলা এই পলিথিন জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা তৈরি করার পাশাপাশি সামুদ্রিক ও স্থলজ জীববৈচিত্র্যকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই বিশাল বিশ্বজনীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত প্লাস্টিকের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে পচনশীল বায়ো-পলিব্যাগ এবং পরিবেশবান্ধব কাগজের তৈরি ক্যারি ব্যাগের অবদান এক যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ্বের উন্নত ও বিকাশমান দেশগুলো ইতিমধ্যে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর পরিবেশনীতির আলোকে পচনশীল বায়ো-ব্যাগের ব্যবহারকে শিল্প ও বাণিজ্য স্তরে প্রভূত জনপ্রিয় ও বাধ্যতামূলক করে তুলেছে। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্লাস্টিক ব্যবহারকারী দেশ চীন ২০২০ সাল থেকে ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার পর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বায়োডিগ্রেডেবল পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহারের শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রহণ করেছে। এমনকি ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোও এখন তাদের সুপারমার্কেট এবং চেইন শপগুলোতে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্ববাণিজ্যের একটি বিরাট অংশকে শতভাগ পচনশীল বায়ো-প্যাকেজিংয়ের আওতায় আনার বৈশ্বিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ ও কাগজের ব্যাগ পলিথিনের সবচেয়ে যোগ্য বিকল্প? এর প্রধান কারণ বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগের রাসায়নিক গঠন ও প্রাকৃতিক উৎস। সাধারণ পলিথিন যেখানে খনিজ তেল থেকে তৈরি পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক এবং যা পচতে ৪০০ থেকে ৫০০ বছর পর্যন্ত সময় নেয়, সেখানে বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ মূলত উদ্ভিদজাত উপাদান—যেমন আলু, ভুট্টা এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের প্রাকৃতিক স্টার্চ বা মাড় থেকে প্রস্তুত করা হয়। ফলে ব্যবহারের পর প্রাকৃতিক আর্দ্রতা ও বায়ুমণ্ডলের অণুজীবের কার্যকর প্রক্রিয়া বা ডিঅ্যাক্টিভেশনের মাধ্যমে এটি মাত্র তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে মাটিতে সারের মতো মিশে যেতে পারে। ঠিক একইভাবে, কাগজের তৈরি ব্যাগও মাটি ও পানির স্পর্শে অতি দ্রুত মিশে যায় এবং এটি বহুমাত্রিকভাবে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল উপযোগী।

কেবলমাত্র কেনাকাটার থলে বা শপিং ব্যাগের মধ্যেই এই বিকল্পের সম্ভাবনা সীমাবদ্ধ নয়। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বেকারির সুস্বাদু পণ্য প্যাকেজিং, দৈনন্দিন মুদি মালামাল সরবরাহ এবং প্রসাধন ও ওষুধ শিল্পের মতো বিশাল খাতগুলোতে বায়ো-প্যাকেজিং এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। ব্যবসায়িক প্যাকেজিংয়ের গুণমান ও স্থায়িত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি এটি পরিবেশের ওপর সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি চাপ বহুগুণে কমায়।

বাংলাদেশেও এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের হাওয়া বয়তে শুরু করেছে। দেশের স্বনামধন্য শপিং মল এবং বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যেই বায়োডিগ্রেডেবল পলিব্যাগ ও কাগজের ব্যাগের ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এই উদ্যোগকে কেবল গুটি কতক ব্র্যান্ড বা শহরের নির্দিষ্ট এলাকার বাণিজ্যিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দেশের সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না। ২০০২ সালে বিশ্বজুড়ে প্রথম দেশ হিসেবে পলিথিন নিষিদ্ধকরণের যে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বাংলাদেশ নিয়েছিল, তার প্রকৃত সুফল পেতে হলে এই পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিংকে সাধারণ প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলতে হবে।

এই বাস্তবতায় আশার আলো দেখাচ্ছে বায়োডিগ্রেডেবল পলিব্যাগ ও টেকসই কাগজের তৈরি প্যাকেজিং সামগ্রী। তবে এই পরিবেশবান্ধব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সমন্বিত শিল্পনীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ। সাধারণ প্লাস্টিক কারখানার মালিকদের বায়োপ্লাস্টিক উৎপাদনে উৎসাহিত করতে সরকারি প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের সংস্থান করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি বায়ো-ব্যাগের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিয়ে এর উৎপাদন খরচ কমানো গেলে সাধারণ ভোক্তারাও পলিথিন ছেড়ে সাশ্রয়ী মূল্যে এই বিকল্প গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবে।

আমরা এমন এক সবুজ ও নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে দৈনন্দিন কেনাকাটার সামান্য একটি ব্যাগ বছরের পর বছর মাটিকে বিষাক্ত করবে না কিংবা নদীর পলি সঞ্চয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। প্লাস্টিক দূষণ একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এর সমাধানও এক নিমেষে সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের এই শুভ সূচনা হতে পারে আজই, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট একটি সচেতন সিদ্ধান্ত থেকে। ক্ষতিকর প্লাস্টিক বর্জন করে বায়ো-পলিথিন ও কাগজের ব্যাগ গ্রহণ করাই হতে পারে এক দূষণমুক্ত, সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশের দিকে আমাদের সবচেয়ে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।

লেখক: মো. খাদেমুল ইসলাম
প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার এক তাৎপর্যপূর্ণ, সময়োপযোগী ও ভারসাম্যের প্রতিফলন। 
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরল ইতিহাস
১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের একই মঞ্চে ভাষণ দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরল ইতিহাস
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
আরও পড়ুন
পলিথিনের ব্যাগে ‘বিশ্বকাপ ট্রফি’নিয়ে ভাইরাল কুকুরেয়া
সোনালি আঁশের সোনালি ব্যাগ: পাটের হাত ধরেই কি বিদায় নেবে পলিথিন?
কালো পলিথিনের প্যাকেটে ছিল নবজাতক, ইউএনওর উদ্যোগে চলছে চিকিৎসা
চাঁদপুরে অবৈধ পলিথিন কারখানা সিলগালা