
কারাগারের দরজা একজন মানুষের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে, কিন্তু তার শোক, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা মানবিক অনুভূতি কেড়ে নিতে পারে না। একজন বন্দীর বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাই-বোন মারা গেলে শেষবারের মতো প্রিয়জনের কাছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। সেই মানবিক প্রয়োজনের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, প্যারোলের প্রশ্নটি মূলত সেখানেই।
বাংলাদেশে প্যারোল নিয়ে আলোচনা আবার সামনে এসেছে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা দীপু মনির স্বামী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তৌফীক নাওয়াজের মৃত্যুর পর। ১৮ আগস্ট রাতে তৌফীক নাওয়াজ মারা যাওয়ার পর স্বামীর জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে দীপু মনির প্যারোলের আবেদন করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে চার দিনের প্যারোল চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ২০ আগস্ট সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার প্যারোল অনুমোদন করেছেন।
এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু এ কারণে নয় যে একজন সাবেক মন্ত্রী প্যারোলে যাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি সরকার কারাবন্দীদের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে নতুন নীতিমালা জারি করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, ভিআইপি ও অন্যান্য সব শ্রেণির কয়েদি বা হাজতি বন্দীর নিকট আত্মীয়: মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তির সুযোগ রয়েছে। প্যারোলের সময়সীমা সাধারণভাবে ১২ ঘণ্টার বেশি হবে না। বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার সময় কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে।
এখানে ‘ভিআইপি ও অন্যান্য সব শ্রেণি’ কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নীতিগতভাবে এর অর্থ হলো, প্যারোল কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক মর্যাদার বিশেষ সুবিধা হওয়ার কথা নয়। সাবেক মন্ত্রী যেমন নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে এই সুযোগ পাবেন, তেমনি কোনো সাধারণ বন্দীও একই পরিস্থিতিতে একই নীতিমালার আওতায় পড়বেন। কিন্তু বাস্তবে এই সমতা কতটা বজায় থাকে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
প্যারোলকে প্রথমেই জামিন থেকে আলাদা করে দেখা দরকার। জামিন হলো মূলত বিচারাধীন মামলায় আদালতের মাধ্যমে সাময়িক মুক্তির ব্যবস্থা। প্যারোল হলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বন্দীকে সীমিত সময়ের জন্য কারাগারের বাইরে যাওয়ার অনুমতি। আবার সাজা স্থগিত বা সাজা মওকুফও প্যারোল নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় সরকারকে দণ্ডিত ব্যক্তির সাজার কার্যকারিতা স্থগিত অথবা তার ওপর আরোপিত শাস্তির সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক মওকুফের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাই জামিন, প্যারোল, সাজা স্থগিত ও সাজা মওকুফ একই ধরনের আইনি ব্যবস্থা নয়। এগুলোর উদ্দেশ্য, প্রকৃতি ও প্রয়োগের ক্ষেত্র আলাদা। ২০২০ সালে খালেদা জিয়ার মুক্তির ক্ষেত্রেও প্যারোল নয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় তার সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশের প্যারোল ব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জানুয়ারি মাসে কারাবন্দী জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যু হলে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। তবে এ ঘটনায় প্যারোলের আবেদন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশাসন ও পরিবারের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। পরে তাদের মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নিয়ে গিয়ে তাকে শেষবারের মতো দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়।
তবে এই ঘটনাকে সরাসরি ‘প্যারোলের আবেদন করেও প্রত্যাখ্যান’ হিসেবে উপস্থাপন করলে পুরো তথ্যটি বলা হয় না। যশোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্যারোলের কোনো লিখিত বা মৌখিক আবেদন পাওয়া যায়নি। বাগেরহাট প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সাদ্দাম তখন যশোর কারাগারে থাকায় প্যারোলের আবেদন সংশ্লিষ্ট যশোর কর্তৃপক্ষের কাছে করার কথা ছিল। পরে পরিবারের মৌখিক আবেদনের ভিত্তিতে মানবিক কারণে কারাফটকে মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।
এই ঘটনাটি তাই অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। প্যারোলের আবেদন করার প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পরিষ্কার? একজন বন্দীর পরিবার জানবে কীভাবে, কোন জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হবে? কোন পরিস্থিতিতে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে? কত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে হবে? আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে কারণ কী?
আইনের শাসন শুধু একটি আইন বা নীতিমালা থাকার নাম নয়। সেই আইন মানুষের কাছে বোধগম্য হওয়া এবং একইভাবে প্রয়োগ হওয়াও জরুরি।
নতুন নীতিমালায় প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কথা বলা হয়েছে। কোনো বন্দী যে জেলার কারাগারে আটক আছেন, সেই জেলার ভেতরে প্যারোলের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক এখতিয়ার নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সাদ্দামের ঘটনা দেখিয়েছে, বন্দী এক জেলা থেকে অন্য জেলার কারাগারে থাকলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে।
দীপু মনির ঘটনা এই জায়গায় নতুন নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। তার স্বামী মারা গেছেন, আর স্বামী বা স্ত্রীকে নিকট আত্মীয়ের সংজ্ঞায় রাখা হয়েছে। ফলে তার ক্ষেত্রে প্যারোলের আবেদনটি নীতিমালায় উল্লেখিত একটি নির্দিষ্ট মানবিক পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এখানে তার রাজনৈতিক পরিচয়টি আলোচনার বিষয় হতে পারে, কিন্তু আইনি সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। তিনি সাবেক মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের নেতা, এটি রাজনৈতিক পরিচয়। প্যারোলের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, তিনি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছেন কি না, নিরাপত্তাজনিত কোনো বাধা আছে কি না এবং নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনটি যথাযথভাবে করা হয়েছে কি না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে কারাগারে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিচয়ও বদলায়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় আচরণের অবস্থানও বদলাতে পারে। যদি প্যারোল রাজনৈতিক আনুগত্য বা প্রশাসনিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই নিরাপদ থাকবে না।
তাই প্যারোল ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত–ব্যক্তি নয়, নিয়ম। একই সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। প্যারোলে মুক্ত বন্দীকে পুলিশের তত্ত্বাবধানে নিয়ে অনুমোদিত সময়ের মধ্যে কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ মানবিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ভারসাম্য রাখার ব্যবস্থাও নীতিমালায় আছে।
সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন নিরাপত্তার যুক্তি একজনের ক্ষেত্রে একভাবে এবং অন্যজনের ক্ষেত্রে অন্যভাবে প্রয়োগ করা হয়। অথবা কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলেও পরিবারকে তার কারণ স্পষ্টভাবে জানানো হয় না।
এ কারণে প্যারোলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আরও বাড়ানো দরকার। আবেদন গ্রহণ, সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময়সীমা, মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যানের কারণ এসব বিষয়ে লিখিত ও সহজবোধ্য প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিকট আত্মীয়ের মৃত্যুর মতো ঘটনায় সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে প্যারোলের মানবিক উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যর্থ হয়ে যায়।
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। প্যারোলকে সরাসরি সাংবিধানিক অধিকার বলা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অযৌক্তিক বৈষম্য না থাকা এবং একই পরিস্থিতিতে একই ধরনের নীতি প্রয়োগের যে মৌলিক ধারণা, তার সঙ্গে এই সমতার নীতির সম্পর্ক রয়েছে।
দীপু মনির প্যারোল তাই শুধু একজন সাবেক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা নয়। একই সঙ্গে এটি নতুন প্যারোল নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগের একটি পরীক্ষা। আর জুয়েল হাসান সাদ্দামের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই ব্যবস্থায় সাধারণ বন্দীর জন্যও নিয়মটি কতটা সহজ, স্পষ্ট ও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দীপু মনি বা জুয়েল হাসান সাদ্দামকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, একই পরিস্থিতিতে একজন রাজনৈতিক পরিচয়হীন সাধারণ বন্দী কী আচরণ পাবেন।
কোনো সাবেক মন্ত্রী তার স্বজনের শেষ বিদায়ে যেতে পারেন, সেটি মানবিকতার পরিচয়। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পরিচয়হীন ও ক্ষমতাহীন বন্দীর ক্ষেত্রেও যদি একই নিয়ম ও মানবিক বিবেচনা কার্যকর হয়, তখনই সেটি হবে আইনের শাসনের পরিচয়।
কারাগার রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে থাকা মানুষের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে, কিন্তু তাদের মানবিক মর্যাদা সীমিত হওয়ার কথা নয়। প্যারোলের প্রকৃত সাফল্য তাই কতজন প্রভাবশালী বন্দী এই সুবিধা পেলেন, তা দিয়ে নয়। বরং মাপা উচিত, ক্ষমতাহীন একজন বন্দী একই পরিস্থিতিতে পড়লে তিনিও একই নিয়মের সুরক্ষা পান কি না। আইনের শাসনের আসল পরীক্ষা সেখানেই।
লেখক: শিক্ষানবিশ আইনজীবী
আরটিভি/এমএম


