ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

প্যারোলের প্রশ্নে আইনের সমতা কোথায়?

সানজিদা জান্নাত পিংকি

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম
সানজিদা জান্নাত পিংকি : ছবি সংগৃহীত

কারাগারের দরজা একজন মানুষের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে, কিন্তু তার শোক, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা মানবিক অনুভূতি কেড়ে নিতে পারে না। একজন বন্দীর বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাই-বোন মারা গেলে শেষবারের মতো প্রিয়জনের কাছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। সেই মানবিক প্রয়োজনের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, প্যারোলের প্রশ্নটি মূলত সেখানেই।

বাংলাদেশে প্যারোল নিয়ে আলোচনা আবার সামনে এসেছে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা দীপু মনির স্বামী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তৌফীক নাওয়াজের মৃত্যুর পর। ১৮ আগস্ট রাতে তৌফীক নাওয়াজ মারা যাওয়ার পর স্বামীর জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে দীপু মনির প্যারোলের আবেদন করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে চার দিনের প্যারোল চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ২০ আগস্ট সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার প্যারোল অনুমোদন করেছেন।

এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু এ কারণে নয় যে একজন সাবেক মন্ত্রী প্যারোলে যাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি সরকার কারাবন্দীদের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে নতুন নীতিমালা জারি করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, ভিআইপি ও অন্যান্য সব শ্রেণির কয়েদি বা হাজতি বন্দীর নিকট আত্মীয়: মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তির সুযোগ রয়েছে। প্যারোলের সময়সীমা সাধারণভাবে ১২ ঘণ্টার বেশি হবে না। বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার সময় কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে।

আরও পড়ুন

এখানে ‘ভিআইপি ও অন্যান্য সব শ্রেণি’ কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নীতিগতভাবে এর অর্থ হলো, প্যারোল কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক মর্যাদার বিশেষ সুবিধা হওয়ার কথা নয়। সাবেক মন্ত্রী যেমন নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে এই সুযোগ পাবেন, তেমনি কোনো সাধারণ বন্দীও একই পরিস্থিতিতে একই নীতিমালার আওতায় পড়বেন। কিন্তু বাস্তবে এই সমতা কতটা বজায় থাকে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

প্যারোলকে প্রথমেই জামিন থেকে আলাদা করে দেখা দরকার। জামিন হলো মূলত বিচারাধীন মামলায় আদালতের মাধ্যমে সাময়িক মুক্তির ব্যবস্থা। প্যারোল হলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বন্দীকে সীমিত সময়ের জন্য কারাগারের বাইরে যাওয়ার অনুমতি। আবার সাজা স্থগিত বা সাজা মওকুফও প্যারোল নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় সরকারকে দণ্ডিত ব্যক্তির সাজার কার্যকারিতা স্থগিত অথবা তার ওপর আরোপিত শাস্তির সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক মওকুফের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাই জামিন, প্যারোল, সাজা স্থগিত ও সাজা মওকুফ একই ধরনের আইনি ব্যবস্থা নয়। এগুলোর উদ্দেশ্য, প্রকৃতি ও প্রয়োগের ক্ষেত্র আলাদা। ২০২০ সালে খালেদা জিয়ার মুক্তির ক্ষেত্রেও প্যারোল নয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় তার সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের প্যারোল ব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জানুয়ারি মাসে কারাবন্দী জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যু হলে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। তবে এ ঘটনায় প্যারোলের আবেদন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশাসন ও পরিবারের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। পরে তাদের মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নিয়ে গিয়ে তাকে শেষবারের মতো দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়।

আরও পড়ুন

তবে এই ঘটনাকে সরাসরি ‘প্যারোলের আবেদন করেও প্রত্যাখ্যান’ হিসেবে উপস্থাপন করলে পুরো তথ্যটি বলা হয় না। যশোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্যারোলের কোনো লিখিত বা মৌখিক আবেদন পাওয়া যায়নি। বাগেরহাট প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সাদ্দাম তখন যশোর কারাগারে থাকায় প্যারোলের আবেদন সংশ্লিষ্ট যশোর কর্তৃপক্ষের কাছে করার কথা ছিল। পরে পরিবারের মৌখিক আবেদনের ভিত্তিতে মানবিক কারণে কারাফটকে মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।

এই ঘটনাটি তাই অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। প্যারোলের আবেদন করার প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পরিষ্কার? একজন বন্দীর পরিবার জানবে কীভাবে, কোন জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হবে? কোন পরিস্থিতিতে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে? কত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে হবে? আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে কারণ কী?

আইনের শাসন শুধু একটি আইন বা নীতিমালা থাকার নাম নয়। সেই আইন মানুষের কাছে বোধগম্য হওয়া এবং একইভাবে প্রয়োগ হওয়াও জরুরি।

নতুন নীতিমালায় প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কথা বলা হয়েছে। কোনো বন্দী যে জেলার কারাগারে আটক আছেন, সেই জেলার ভেতরে প্যারোলের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক এখতিয়ার নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সাদ্দামের ঘটনা দেখিয়েছে, বন্দী এক জেলা থেকে অন্য জেলার কারাগারে থাকলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে।

দীপু মনির ঘটনা এই জায়গায় নতুন নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। তার স্বামী মারা গেছেন, আর স্বামী বা স্ত্রীকে নিকট আত্মীয়ের সংজ্ঞায় রাখা হয়েছে। ফলে তার ক্ষেত্রে প্যারোলের আবেদনটি নীতিমালায় উল্লেখিত একটি নির্দিষ্ট মানবিক পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

আরও পড়ুন

এখানে তার রাজনৈতিক পরিচয়টি আলোচনার বিষয় হতে পারে, কিন্তু আইনি সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। তিনি সাবেক মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের নেতা, এটি রাজনৈতিক পরিচয়। প্যারোলের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, তিনি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছেন কি না, নিরাপত্তাজনিত কোনো বাধা আছে কি না এবং নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনটি যথাযথভাবে করা হয়েছে কি না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে কারাগারে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিচয়ও বদলায়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় আচরণের অবস্থানও বদলাতে পারে। যদি প্যারোল রাজনৈতিক আনুগত্য বা প্রশাসনিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই নিরাপদ থাকবে না।

তাই প্যারোল ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত–ব্যক্তি নয়, নিয়ম। একই সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। প্যারোলে মুক্ত বন্দীকে পুলিশের তত্ত্বাবধানে নিয়ে অনুমোদিত সময়ের মধ্যে কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ মানবিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ভারসাম্য রাখার ব্যবস্থাও নীতিমালায় আছে।

সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন নিরাপত্তার যুক্তি একজনের ক্ষেত্রে একভাবে এবং অন্যজনের ক্ষেত্রে অন্যভাবে প্রয়োগ করা হয়। অথবা কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলেও পরিবারকে তার কারণ স্পষ্টভাবে জানানো হয় না।

এ কারণে প্যারোলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আরও বাড়ানো দরকার। আবেদন গ্রহণ, সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময়সীমা, মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যানের কারণ এসব বিষয়ে লিখিত ও সহজবোধ্য প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিকট আত্মীয়ের মৃত্যুর মতো ঘটনায় সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে প্যারোলের মানবিক উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যর্থ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। প্যারোলকে সরাসরি সাংবিধানিক অধিকার বলা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অযৌক্তিক বৈষম্য না থাকা এবং একই পরিস্থিতিতে একই ধরনের নীতি প্রয়োগের যে মৌলিক ধারণা, তার সঙ্গে এই সমতার নীতির সম্পর্ক রয়েছে।

দীপু মনির প্যারোল তাই শুধু একজন সাবেক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা নয়। একই সঙ্গে এটি নতুন প্যারোল নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগের একটি পরীক্ষা। আর জুয়েল হাসান সাদ্দামের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই ব্যবস্থায় সাধারণ বন্দীর জন্যও নিয়মটি কতটা সহজ, স্পষ্ট ও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দীপু মনি বা জুয়েল হাসান সাদ্দামকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, একই পরিস্থিতিতে একজন রাজনৈতিক পরিচয়হীন সাধারণ বন্দী কী আচরণ পাবেন।

কোনো সাবেক মন্ত্রী তার স্বজনের শেষ বিদায়ে যেতে পারেন, সেটি মানবিকতার পরিচয়। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পরিচয়হীন ও ক্ষমতাহীন বন্দীর ক্ষেত্রেও যদি একই নিয়ম ও মানবিক বিবেচনা কার্যকর হয়, তখনই সেটি হবে আইনের শাসনের পরিচয়।

কারাগার রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে থাকা মানুষের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে, কিন্তু তাদের মানবিক মর্যাদা সীমিত হওয়ার কথা নয়। প্যারোলের প্রকৃত সাফল্য তাই কতজন প্রভাবশালী বন্দী এই সুবিধা পেলেন, তা দিয়ে নয়। বরং মাপা উচিত, ক্ষমতাহীন একজন বন্দী একই পরিস্থিতিতে পড়লে তিনিও একই নিয়মের সুরক্ষা পান কি না। আইনের শাসনের আসল পরীক্ষা সেখানেই।

লেখক: শিক্ষানবিশ আইনজীবী

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সন্ধিক্ষণ...
মহালয়া আসলে কোনো নির্দিষ্ট দিনের নাম নয়, মানুষের অস্তিত্বের ভেতরে বারবার ফিরে আসা এক সন্ধিক্ষণের নাম।
সন্ধিক্ষণ...
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের শঙ্কায় ট্রাম্প
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শঙ্কায় আছেন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদী কার্যকালের দুই বছর পর ঠিক মাঝপথে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে বলা হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের শঙ্কায় ট্রাম্প
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
আজ মহান শিক্ষক দিবস। জীবনের এই বিশেষ দিনে সবার আগে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই আমার জীবনের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক—আমার আম্মুকে। আমার জীবনের প্রতিটি ভালো অর্জনের পেছনে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। তার ভালোবাসা, শাসন, ত্যাগ ও নিরন্তর অনুপ্রেরণাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। এরপর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার স্কুলজীবনের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের—প্রধান শিক্ষক দীন ইসলাম স্যার, ফরিদা ইয়াসমিন (আমার চাচি), নিপা মেম, হেলানা মেম ও ফাতেমা মেমকে। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্নেহেই চতুর্থ শ্রেণিতে আমার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করেছিল। তাদের শেখানো অনেক কথাই আজও আমার পথচলার অনুপ্রেরণা। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যখন মাধ্যমিক জীবনে পা রাখলাম, তখন নতুন করে কিছু মানুষ আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাদের স্নেহ, শাসন ও অনুপ্রেরণায় পেয়েছি নতুন পথের সন্ধান। তাদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক রেহানা মেম, শিলা মেম, তানিয়া মেম, দোলা মেম, হুজুর স্যার ও রাসেল স্যার অন্যতম। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই পেয়েছি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এরপর এলো কলেজজীবন। জীবনের এই অধ্যায়েও কিছু মানুষ আমার স্বপ্নকে আরও বড় করে তুলেছেন। রাবেয়া মেম, দীপ্তি মেম, শামীম স্যার, দেলোয়ার স্যার ও আবুবকর স্যার—তাদের নাম আমি কখনোই ভুলতে পারব না। তারা আমাকে শুধু পড়াননি; বরং স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন এবং বিশ্বাস করিয়েছেন—‘আমি পারব।’ তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার ফলেই আজ আমি দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তাদের অনুপ্রেরণায়ই ঢাবিতে (কলা অনুষদের নরমাল সাবজেক্টে), রাবি ও চবিতে ভর্তির সুযোগ হয়েছিল। আমার জীবনের সেই সময়ে তাদের উৎসাহ ও বিশ্বাস আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। বর্তমানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পথচলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদানও আমি কখনো ভুলব না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের যে স্নেহ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা—তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, বরং জীবনকে কীভাবে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে হয়, সেটিও শেখার সুযোগ পাচ্ছি। শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের বাইরেও আমার জীবনে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে আমার চাচাতো বড় বোন মিম আপুর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে অনেক অঙ্ক অনুশীলন করিয়েছেন। তার সেই পরিশ্রম ও সময় দেওয়ার সুফল আমি আজও পাচ্ছি। অনেক সময় একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে থাকেন না, কিন্তু তার শেখানোটা সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়—মিম আপু আমার জন্য তেমনই একজন। এর পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা আমার শেখার জগৎকে আরও বিস্তৃত করেছে। সাংবাদিকতা করার সুবাদে আরটিভির অনলাইন ইনচার্জ আজাদ ভাই এবং শিফট ইনচার্জ ইমতিয়াজ ভাইয়ের কাছ থেকেও প্রতিনিয়ত অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি। সংবাদকে কীভাবে দেখতে হয়, তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং কাজের প্রতি আন্তরিকতা— এসব বিষয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাদের প্রতিও রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো শিক্ষক আমার হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন। কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়, কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে কঠিন সময়ে হাল না ছেড়ে এগিয়ে যেতে হয়, আবার কেউ আমার ওপর বিশ্বাস রেখে আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। আজ আমি যে পরিচয়ে পরিচিত, তার পেছনে আমার বাবা-মায়ের পাশাপাশি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের দেওয়া শিক্ষা, শাসন, স্নেহ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। আমার জীবনের পথচলায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রত্যেকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা। শিক্ষক শুধু একটি পেশার নাম নয়; একজন শিক্ষক একটি জীবন বদলে দিতে পারেন। আর জীবনের এই দীর্ঘ পথে কিছু মানুষ শিক্ষক না হয়েও আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে যান। তাই এই মহান দিবসে আমার শিক্ষকদেরসহ বিশ্বের সকল শিক্ষকের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা। শুভ শিক্ষক দিবস। আবুবকর সম্পদ জবি সংবাদদাতা, আরটিভি আহ্বায়ক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি আরটিভি/এমএইচজে
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় মতামত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের জন্য বড় সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থ, সময়, মানসিক চাপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—চিকিৎসা নিয়ে প্রত্যাশা। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার কাছে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়—দ্বিতীয় মতামত নেওয়া। দ্বিতীয় মতামত মানে প্রথম চিকিৎসককে অবিশ্বাস করা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিকিৎসা সিদ্ধান্তের আগে আরেকজন যোগ্য বিশেষজ্ঞের মতামত জানা। এতে রোগী ও পরিবার রোগের অবস্থা, চিকিৎসার বিকল্প, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দেশে বা বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন। আমাদের দেশে কোনো জটিল রোগ ধরা পড়লেই অনেক পরিবার প্রথমে বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবেন। আবার কেউ পরিচিত কারও অভিজ্ঞতাকে নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্তের ভিত্তি করেন। কিন্তু একই রোগ হলেও প্রতিটি রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং ঝুঁকি এক নয়। তাই একজনের ভালো অভিজ্ঞতা অন্যজনের জন্য একই ফল নিশ্চিত করে না। আমার দৃষ্টিতে, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?” এর উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় জানা দরকার। রোগটি ঠিক কী? চিকিৎসার উদ্দেশ্য কী? দেশে এই চিকিৎসার উপযুক্ত সক্ষমতা আছে কি না? বিদেশে গেলে অতিরিক্ত কী সুবিধা পাওয়া যাবে? সম্ভাব্য খরচ কত? আর চিকিৎসার পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ কীভাবে হবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং চিকিৎসক ও রোগীর যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে। চিকিৎসার মান শুধু একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে না; নিরাপত্তা, রোগীকেন্দ্রিকতা, সময়োপযোগিতা এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে একটি চিকিৎসা করিয়ে দেশে ফিরে আসার পর পরবর্তী চিকিৎসা কোথায় হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কোথায় হবে এবং চিকিৎসার তথ্য স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে—এসবও সিদ্ধান্তের অংশ হওয়া উচিত। কারণ চিকিৎসা একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া মানেই চিকিৎসা পরিবর্তন করতে হবে—এমন নয়। অনেক সময় দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের মতামত প্রথম চিকিৎসা পরিকল্পনাকেই আরও পরিষ্কার করে। আবার কখনো নতুন কোনো বিকল্প সামনে আসতে পারে। মূল বিষয় হলো—রোগী যেন নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া ভুল—এমন কথা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিদেশে গেলেই ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। আবার অনেক চিকিৎসার জন্য দেশের মধ্যেই উপযুক্ত সক্ষমতা থাকতে পারে। তাই আমার কাছে বিদেশে চিকিৎসার প্রশ্নটি “দেশ না বিদেশ”—এভাবে দেখার চেয়ে “প্রয়োজনের জন্য সঠিক জায়গা কোথায়?”—এই প্রশ্নে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীকে কোনো একটি সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয় না। বরং তাকে সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় বিকল্প এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত রোগী বিদেশে যাবেন, নাকি দেশে চিকিৎসা নেবেন—সিদ্ধান্তটি তার। আমাদের দায়িত্ব হলো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট তথ্য ও আস্থার সুযোগ দেওয়া। কারণ চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কখনো কখনো আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতামত শুধু একটি অতিরিক্ত পরামর্শ নয়— এটি হতে পারে আরও সচেতন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম। আরটিভি/ এসকেডি
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় মতামত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের কেন্দ্রে (হাব) পরিণত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
আরও পড়ুন
দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে আগে রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে: আইনমন্ত্রী
ইউনিয়ন নির্বাচনে দলের কেউ মুনাফিকি করলে ক্ষমা করবেন না প্রধানমন্ত্রী: আইনমন্ত্রী
গর্ব করে বলতে পারি, আমার দলের কোনো কর্মী চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নয়: আইনমন্ত্রী
সার ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে: আইনমন্ত্রী