ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

প্যারোলের প্রশ্নে আইনের সমতা কোথায়?

সানজিদা জান্নাত পিংকি

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম
সানজিদা জান্নাত পিংকি : ছবি সংগৃহীত

কারাগারের দরজা একজন মানুষের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে, কিন্তু তার শোক, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা মানবিক অনুভূতি কেড়ে নিতে পারে না। একজন বন্দীর বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাই-বোন মারা গেলে শেষবারের মতো প্রিয়জনের কাছে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। সেই মানবিক প্রয়োজনের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আইনের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, প্যারোলের প্রশ্নটি মূলত সেখানেই।

বাংলাদেশে প্যারোল নিয়ে আলোচনা আবার সামনে এসেছে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতা দীপু মনির স্বামী, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তৌফীক নাওয়াজের মৃত্যুর পর। ১৮ আগস্ট রাতে তৌফীক নাওয়াজ মারা যাওয়ার পর স্বামীর জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে দীপু মনির প্যারোলের আবেদন করা হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে চার দিনের প্যারোল চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ২০ আগস্ট সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার প্যারোল অনুমোদন করেছেন।

এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু এ কারণে নয় যে একজন সাবেক মন্ত্রী প্যারোলে যাচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি সরকার কারাবন্দীদের প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে নতুন নীতিমালা জারি করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী, ভিআইপি ও অন্যান্য সব শ্রেণির কয়েদি বা হাজতি বন্দীর নিকট আত্মীয়: মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তির সুযোগ রয়েছে। প্যারোলের সময়সীমা সাধারণভাবে ১২ ঘণ্টার বেশি হবে না। বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার সময় কমানো বা বাড়ানোর ক্ষমতা রাখে।

আরও পড়ুন

এখানে ‘ভিআইপি ও অন্যান্য সব শ্রেণি’ কথাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নীতিগতভাবে এর অর্থ হলো, প্যারোল কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক মর্যাদার বিশেষ সুবিধা হওয়ার কথা নয়। সাবেক মন্ত্রী যেমন নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে এই সুযোগ পাবেন, তেমনি কোনো সাধারণ বন্দীও একই পরিস্থিতিতে একই নীতিমালার আওতায় পড়বেন। কিন্তু বাস্তবে এই সমতা কতটা বজায় থাকে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

প্যারোলকে প্রথমেই জামিন থেকে আলাদা করে দেখা দরকার। জামিন হলো মূলত বিচারাধীন মামলায় আদালতের মাধ্যমে সাময়িক মুক্তির ব্যবস্থা। প্যারোল হলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বন্দীকে সীমিত সময়ের জন্য কারাগারের বাইরে যাওয়ার অনুমতি। আবার সাজা স্থগিত বা সাজা মওকুফও প্যারোল নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় সরকারকে দণ্ডিত ব্যক্তির সাজার কার্যকারিতা স্থগিত অথবা তার ওপর আরোপিত শাস্তির সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক মওকুফের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তাই জামিন, প্যারোল, সাজা স্থগিত ও সাজা মওকুফ একই ধরনের আইনি ব্যবস্থা নয়। এগুলোর উদ্দেশ্য, প্রকৃতি ও প্রয়োগের ক্ষেত্র আলাদা। ২০২০ সালে খালেদা জিয়ার মুক্তির ক্ষেত্রেও প্যারোল নয়, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১(১) ধারায় তার সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের প্যারোল ব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় আরেকটি ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জানুয়ারি মাসে কারাবন্দী জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যু হলে তাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। তবে এ ঘটনায় প্যারোলের আবেদন করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশাসন ও পরিবারের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। পরে তাদের মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নিয়ে গিয়ে তাকে শেষবারের মতো দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়।

আরও পড়ুন

তবে এই ঘটনাকে সরাসরি ‘প্যারোলের আবেদন করেও প্রত্যাখ্যান’ হিসেবে উপস্থাপন করলে পুরো তথ্যটি বলা হয় না। যশোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্যারোলের কোনো লিখিত বা মৌখিক আবেদন পাওয়া যায়নি। বাগেরহাট প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সাদ্দাম তখন যশোর কারাগারে থাকায় প্যারোলের আবেদন সংশ্লিষ্ট যশোর কর্তৃপক্ষের কাছে করার কথা ছিল। পরে পরিবারের মৌখিক আবেদনের ভিত্তিতে মানবিক কারণে কারাফটকে মরদেহ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়।

এই ঘটনাটি তাই অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। প্যারোলের আবেদন করার প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পরিষ্কার? একজন বন্দীর পরিবার জানবে কীভাবে, কোন জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হবে? কোন পরিস্থিতিতে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে? কত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে হবে? আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে কারণ কী?

আইনের শাসন শুধু একটি আইন বা নীতিমালা থাকার নাম নয়। সেই আইন মানুষের কাছে বোধগম্য হওয়া এবং একইভাবে প্রয়োগ হওয়াও জরুরি।

নতুন নীতিমালায় প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কথা বলা হয়েছে। কোনো বন্দী যে জেলার কারাগারে আটক আছেন, সেই জেলার ভেতরে প্যারোলের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক এখতিয়ার নির্ধারণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সাদ্দামের ঘটনা দেখিয়েছে, বন্দী এক জেলা থেকে অন্য জেলার কারাগারে থাকলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে।

দীপু মনির ঘটনা এই জায়গায় নতুন নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। তার স্বামী মারা গেছেন, আর স্বামী বা স্ত্রীকে নিকট আত্মীয়ের সংজ্ঞায় রাখা হয়েছে। ফলে তার ক্ষেত্রে প্যারোলের আবেদনটি নীতিমালায় উল্লেখিত একটি নির্দিষ্ট মানবিক পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

আরও পড়ুন

এখানে তার রাজনৈতিক পরিচয়টি আলোচনার বিষয় হতে পারে, কিন্তু আইনি সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। তিনি সাবেক মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের নেতা, এটি রাজনৈতিক পরিচয়। প্যারোলের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, তিনি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করছেন কি না, নিরাপত্তাজনিত কোনো বাধা আছে কি না এবং নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনটি যথাযথভাবে করা হয়েছে কি না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে কারাগারে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পরিচয়ও বদলায়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় আচরণের অবস্থানও বদলাতে পারে। যদি প্যারোল রাজনৈতিক আনুগত্য বা প্রশাসনিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সেই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই নিরাপদ থাকবে না।

তাই প্যারোল ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত–ব্যক্তি নয়, নিয়ম। একই সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। প্যারোলে মুক্ত বন্দীকে পুলিশের তত্ত্বাবধানে নিয়ে অনুমোদিত সময়ের মধ্যে কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ মানবিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার ভারসাম্য রাখার ব্যবস্থাও নীতিমালায় আছে।

সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন নিরাপত্তার যুক্তি একজনের ক্ষেত্রে একভাবে এবং অন্যজনের ক্ষেত্রে অন্যভাবে প্রয়োগ করা হয়। অথবা কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলেও পরিবারকে তার কারণ স্পষ্টভাবে জানানো হয় না।

এ কারণে প্যারোলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আরও বাড়ানো দরকার। আবেদন গ্রহণ, সিদ্ধান্ত দেওয়ার সময়সীমা, মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যানের কারণ এসব বিষয়ে লিখিত ও সহজবোধ্য প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে নিকট আত্মীয়ের মৃত্যুর মতো ঘটনায় সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে প্যারোলের মানবিক উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যর্থ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। প্যারোলকে সরাসরি সাংবিধানিক অধিকার বলা যাবে না। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অযৌক্তিক বৈষম্য না থাকা এবং একই পরিস্থিতিতে একই ধরনের নীতি প্রয়োগের যে মৌলিক ধারণা, তার সঙ্গে এই সমতার নীতির সম্পর্ক রয়েছে।

দীপু মনির প্যারোল তাই শুধু একজন সাবেক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত শোকের ঘটনা নয়। একই সঙ্গে এটি নতুন প্যারোল নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগের একটি পরীক্ষা। আর জুয়েল হাসান সাদ্দামের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই ব্যবস্থায় সাধারণ বন্দীর জন্যও নিয়মটি কতটা সহজ, স্পষ্ট ও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি দীপু মনি বা জুয়েল হাসান সাদ্দামকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, একই পরিস্থিতিতে একজন রাজনৈতিক পরিচয়হীন সাধারণ বন্দী কী আচরণ পাবেন।

কোনো সাবেক মন্ত্রী তার স্বজনের শেষ বিদায়ে যেতে পারেন, সেটি মানবিকতার পরিচয়। কিন্তু একই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পরিচয়হীন ও ক্ষমতাহীন বন্দীর ক্ষেত্রেও যদি একই নিয়ম ও মানবিক বিবেচনা কার্যকর হয়, তখনই সেটি হবে আইনের শাসনের পরিচয়।

কারাগার রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে থাকা মানুষের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে, কিন্তু তাদের মানবিক মর্যাদা সীমিত হওয়ার কথা নয়। প্যারোলের প্রকৃত সাফল্য তাই কতজন প্রভাবশালী বন্দী এই সুবিধা পেলেন, তা দিয়ে নয়। বরং মাপা উচিত, ক্ষমতাহীন একজন বন্দী একই পরিস্থিতিতে পড়লে তিনিও একই নিয়মের সুরক্ষা পান কি না। আইনের শাসনের আসল পরীক্ষা সেখানেই।

লেখক: শিক্ষানবিশ আইনজীবী

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের কেন্দ্রে (হাব) পরিণত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
৪৬ লাখ মামলা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কত দীর্ঘ?
আদালতের একটি তারিখ মানে অনেকের জীবনে আরেকটি অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা কখনো জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার, কখনো পাওনা টাকা আদায়ের, কখনো অপরাধের বিচার পাওয়ার, আবার কখনো নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার। আদালতের নথিতে এসব কেবল মামলা নম্বর ও পক্ষের নাম কিন্তু প্রতিটি মামলার পেছনে থাকে মানুষের জীবনের একটি করে গল্প। বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা যখন ৪৬ লাখ ছাড়িয়ে যায়, তখন এটিকে শুধু বিচার বিভাগের ওপর জমে থাকা কাজের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের সব স্তরের আদালতে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা অধস্তন আদালতেই। এত বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। তবে মামলার সংখ্যা দিয়েই পুরো বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা মাপা যায় না। মামলা বাড়ার পেছনে যেমন নতুন বিরোধের সৃষ্টি আছে, তেমনি আছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সাক্ষ্য ও নথি ব্যবস্থাপনার সমস্যা, মুলতবি এবং আপিলের মতো স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘মামলা এত বেশি কেন’ নয়। বরং আরও জরুরি প্রশ্ন হলো, একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে এত সময় লাগে কেন এবং সেই অপেক্ষার মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেন? ৩১ মার্চ ২০২৬-এর হিসাবটি দেখলে সমস্যার ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়। আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি এবং অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা বিচারাধীন। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ৮৮ শতাংশই অধস্তন আদালতে। অধস্তন আদালতের এই চাপের মধ্যে দেওয়ানি মামলা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি এবং ফৌজদারি মামলা ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি। এখানে বিচারকের সংখ্যা ও আদালতের সক্ষমতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্যে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ জন নতুন সিভিল জজ নিয়োগসহ আদালতের সহায়ক জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে। নতুন আদালত ও বিচারকের পদ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই মামলার জট কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি মামলার নিষ্পত্তির সঙ্গে বিচারকের পাশাপাশি যুক্ত থাকে আদালতের প্রশাসন, সমন জারি, সাক্ষীর উপস্থিতি, তদন্ত, নথি প্রস্তুত, আইনজীবী ও পক্ষগুলোর প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা। এসব জায়গার কোনো একটিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো মামলার ওপর। তাই মামলার জটকে শুধু বিচারকের স্বল্পতার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির একটি অংশই দেখা হবে। বিচারের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব সংবিধানও স্বীকার করেছে। সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্বকে শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও নির্দিষ্ট মামলার বিচার শেষ করার সময়সীমা রয়েছে। ৩৩৯সি ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার গ্রহণের পর ১৮০ দিনের মধ্যে এবং সেশনস জজ, অতিরিক্ত সেশনস জজ বা সহকারী সেশনস জজের আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে, নির্দিষ্ট শর্তে জামিনের সুযোগের কথাও একই ধারায় বলা হয়েছে। তবে আইনে সময়সীমা নির্ধারিত থাকা আর বাস্তবে প্রতিটি মামলা সেই সময়ের মধ্যে শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। মামলার প্রকৃতি, সাক্ষী, আসামির অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। মামলার জট কমানোর ক্ষেত্রে তাই আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার গুরুত্বও বাড়ছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯এ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, উপযুক্ত বিরোধ যেন সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে না হয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন এসেছে আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০২৫ সনের ৩৫ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এ ২১খ, ২১গ, ২১ঘ ও ২১ঙ ধারা সংযোজন করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের বিরোধে আদালতে মামলা করার আগে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়ার বিধান করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় ১২টি জেলায় চালুর পর ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ তা আরও জেলায় সম্প্রসারিত হয়। সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে। মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যকর হলে কিছু বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তির সুযোগ পাবে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ, সহজলভ্য ও কার্যকর হয় তার ওপর। বিশেষ করে আর্থিক বা সামাজিকভাবে দুর্বল কোনো পক্ষ যেন মধ্যস্থতার নামে আপস করতে বাধ্য না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্য বিচারপ্রাপ্তির পথ সংকুচিত করা নয়; বরং উপযুক্ত ক্ষেত্রে দ্রুত ও কম খরচে বিরোধের সমাধানের সুযোগ তৈরি করা। প্রযুক্তিও এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমন জারি, মামলার নথি ব্যবস্থাপনা, মামলার তারিখ ও কার্যক্রম সম্পর্কে পক্ষগুলোকে দ্রুত জানানো এবং আদালতের প্রশাসনিক কাজ ডিজিটাল করা গেলে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রযুক্তি কোনো জাদুকাঠি নয়। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই মামলার জট কমে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মামলা ব্যবস্থাপনা। কোন মামলা কত পুরোনো, কোন মামলায় কতবার সময় নেওয়া হয়েছে, কোন মামলায় সাক্ষ্য শেষ হয়েছে, কোন মামলায় রায় অপেক্ষমাণ, এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে। পুরোনো মামলাগুলোর জন্য আলাদা নজরদারি এবং নিয়মিত পর্যালোচনাও প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগের একটি উদাহরণ দেখা গেছে হাইকোর্ট বিভাগে। ১০ জুলাই ২০২৫ প্রধান বিচারপতি ২০০০ সালের আগে দায়ের করা ১০ হাজার ৩৮৫টি পুরোনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে মামলার জট কমানোর আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়ো করে বিচার নয়। একজন আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই, ন্যায্য শুনানি এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ন রেখেই বিচারকে সময়োপযোগী করতে হবে। অন্যদিকে বছরের পর বছর একটি মামলাকে ঝুলিয়ে রাখাও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিচারব্যবস্থার জন্য আসল চ্যালেঞ্জ তাই দ্রুততা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। মামলা কমানোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মামলার সংখ্যা কমানো নিজে কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়। কোনো নাগরিকের বৈধ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় মামলা, অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও প্রক্রিয়াগত বিলম্ব কমানো; আদালতে যাওয়ার অধিকার সীমিত করা নয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য কার্যকর আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা বিচারপ্রাপ্তির সমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ৪৬ লাখের বেশি বিচারাধীন মামলা তাই শুধু আদালতের ভেতরের একটি সংকট নয়। এটি রাষ্ট্রের বিচারপ্রাপ্তির সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। নতুন বিচারক ও আদালত যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষ আদালত প্রশাসন, কার্যকর মামলা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার প্রসার। একই সঙ্গে প্রতিটি সংস্কারের ফলও পরিমাপ করতে হবে। কত মামলা কমল, কত সময় সাশ্রয় হলো, বিচারপ্রার্থীর খরচ কতটা কমল এবং কত দ্রুত কার্যকর প্রতিকার পাওয়া গেল, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো সংস্কারের সাফল্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। শেষ পর্যন্ত আদালতের নথিতে একটি মামলা একটি সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু বিচারপ্রার্থীর কাছে সেটি তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের শেষ কখন হবে, তা অনিশ্চিত হয়ে গেলে বিচার পাওয়ার অধিকার কাগজে থাকলেও তার বাস্তব মূল্য কমে যায়। তাই বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু মামলার সংখ্যা কমানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যেতে পারবেন এবং অযথা দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই আইনসম্মত ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ৪৬ লাখ মামলার পরিসংখ্যান আমাদের সেই প্রশ্নটিই সামনে এনে দেয়, আদালতের দরজা খোলা আছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা একজন মানুষ ন্যায়বিচারের কাছে পৌঁছাতে আর কতটা পথ পাড়ি দেবেন? লেখা: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি শিক্ষানবিশ আইনজীবী।  আরটিভি/এসকে
৪৬ লাখ মামলা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কত দীর্ঘ?
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার এক তাৎপর্যপূর্ণ, সময়োপযোগী ও ভারসাম্যের প্রতিফলন। 
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরল ইতিহাস
১৯৮০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের একই মঞ্চে ভাষণ দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরল ইতিহাস
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
আরও পড়ুন
তদন্ত থেকে সরে দাঁড়ালেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ আইনজীবী, থাকছেন চাকরিতে
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না: চিফ হুইপ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যে কোনো অভিযানের জন্য প্রস্তুত পুলিশ
গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার ও সম্পত্তি হস্তান্তর আইন: ন্যায়বিচারে নতুন দিগন্ত