ঢাকা সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে

মো. আনোয়ারুল ইসলাম শামীম

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম
লেখক: মো. আনোয়ারুল ইসলাম শামীম। সৌজন্য ছবি

৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পেরিয়ে দেশে নির্বাচন হয়েছে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল—এবার কি রাষ্ট্রের চেয়ারগুলো আবার রাষ্ট্রেরই হবে?
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে আনছে।

আমি একে বলছি ‘বিনিময় প্রথা’।

এটি অর্থনীতির প্রাচীন ‘বার্টার সিস্টেম বা পণ্য বিনিময় প্রথা’ নয়। এখানে বিনিময়ের অভিযোগ আরও ভয়ংকর—অর্থ, তদবির, প্রভাব বা আনুগত্যের বিনিময়ে যদি পদায়ন, বদলি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার পাওয়া যায়, তাহলে প্রশাসনিক পদ আর দায়িত্ব থাকে না, সেটি বিনিয়োগে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

আর চেয়ার যখন বিনিয়োগ হয়, তখন জনগণই শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দেয়।

সাম্প্রতিক একটি অডিও ঘিরে সেই প্রশ্ন আরও গুরুতর হয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানের বলে চিহ্নিত একটি কথোপকথনে ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রসঙ্গও উঠে আসে। অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি এবং প্রত্যাহারের সরকারি আদেশে কারণ বলা হয়েছে ‘প্রশাসনিক’।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। ডিসেম্বরের কথা শুধু ওই অডিওতেই আসেনি। গত ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, তিনি ও তার দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান।

তাই প্রশ্নটি ‘একজন ওসি ডিসেম্বরের খবর পেলেন কোথা থেকে?’—এত সরল নয়।

প্রশ্নটি বরং আরও গভীর-

একটি থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কীভাবে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ভাষায় কথা বলার অবস্থানে পৌঁছান? আর একই কথোপকথনে যদি ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠে আসে, তাহলে বিষয়টি আর একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন রাষ্ট্রকে দেখতে হয়—পদায়নের ব্যবস্থাটি কতটা স্বচ্ছ?

কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর চেয়ারগুলোর একটি থানার ওসির চেয়ার। একজন ওসির হাতে মামলা, গ্রেপ্তার, তদন্ত, জননিরাপত্তা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার বিপুল ক্ষমতা থাকে। সেই চেয়ার যদি যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ, তদবির বা অন্য কোনো অস্বচ্ছ বিনিময়ে পাওয়া যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—তিনি দায়িত্ব পালন করবেন সংবিধান ও আইনের প্রতি, নাকি যে ব্যবস্থার মাধ্যমে চেয়ারটি পেয়েছেন তার প্রতি?

এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয় বরং যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তার জন্য একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। আর এখানেই নির্বাচিত সরকারের দায় আরও বেশি।

কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাবদ্ধতার যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু জনগণের ভোটে দায়িত্ব নেওয়া সরকারের কাছে প্রত্যাশা হলো প্রতিষ্ঠানকে নিয়মে ফিরিয়ে আনা। সরকারের নিজের নির্দেশনাতেও নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠ প্রশাসনকে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।

তারপরও যদি পুলিশ প্রশাসনের ভেতর থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের বক্তব্য শোনা যায়, তাহলে শুধু একজন ওসিকে প্রত্যাহার করলেই প্রশ্ন শেষ হয় না। অডিও সত্য হলে অভিযোগগুলোও তদন্ত করতে হবে। আর অডিও মিথ্যা বা বিকৃত হলে সেটিও জনগণকে জানাতে হবে।

কে টাকা দিয়েছে?
কে টাকা নিয়েছে?
কে মধ্যস্থতা করেছে?
কোন পদায়নে করেছে?
কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছে?

প্রমাণ না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামও পরিষ্কার করতে হবে। আর প্রমাণ পাওয়া গেলে দায় শুধু নিচের একজন কর্মকর্তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে চলবে না।

কারণ ঘুষ দিয়ে চেয়ার কেনা এবং ঘুষ নিয়ে চেয়ার দেওয়া একই বাজারের দুই প্রান্ত।

রাষ্ট্র যদি শুধু ক্রেতাকে ধরে, বিক্রেতাকে না ধরে—বাজার বন্ধ হবে না।

৫ আগস্টের পর আমরা বহুবার ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ শব্দটি শুনেছি। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা সংবিধানের বড় বড় অনুচ্ছেদে নয়, পরীক্ষা থানার একটি চেয়ারেও।

একজন ওসি কীভাবে ওসি হন?
একজন এসপি কীভাবে এসপি হন?
একজন ডিসি কীভাবে ডিসি হন?

এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর যদি জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে দেওয়া যায়, তাহলে সংস্কারের অনেক বক্তৃতার প্রয়োজন হবে না। আর উত্তর যদি অস্বচ্ছ থাকে, তাহলে ‘বিনিময় প্রথা’ নিয়ে প্রশ্নও থামবে না। ৫ আগস্টের পর মানুষ শুধু ক্ষমতার মুখ পরিবর্তন দেখতে চায়নি, মানুষ চেয়েছিল ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতির পরিবর্তন।

সরকার বদলেছে—এটি ইতিহাস। কিন্তু চেয়ার পাওয়ার নিয়ম বদলেছে কি না—সেটিই হবে সংস্কারের পরীক্ষা। কারণ রাষ্ট্রের চেয়ার যদি অর্থ বা প্রভাবের বিনিময়ে পাওয়া যায়, তাহলে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি থেকেই যায়— তাহলে কর্মকর্তা চেয়ারটির কাছে ঋণী, তিনি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হবেন কীভাবে?

লেখক: মো. আনোয়ারুল ইসলাম শামীম
সভাপতি, বাংলাদেশ রিফ্রিজারেন্ট গ্যাস অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ব্রামা)

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ
একটি লং মার্চ। বিশাল মানুষের অংশগ্রহণ। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, স্লোগান সবই আছে। কিন্তু এর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ছে, তা হলো বড় কোনো প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নেই, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অযাচিত বাধার অভিযোগ নেই।
বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ
আরও পড়ুন
প্রধানমন্ত্রীর থেকে বাড়ি উপহার পেলেন সেই গোলাপি বেগম 
প্রতিবাদই কি কাল হলো
বর্তমান সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনায় বাংলাদেশ গড়বে: আযম খান
‘কারাগার থেকে পালানো ৬৯০ বন্দি এখনও পলাতক, তথ্য নেই ১৬৬ জনের’