
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পেরিয়ে দেশে নির্বাচন হয়েছে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল—এবার কি রাষ্ট্রের চেয়ারগুলো আবার রাষ্ট্রেরই হবে?
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে আনছে।
আমি একে বলছি ‘বিনিময় প্রথা’।
এটি অর্থনীতির প্রাচীন ‘বার্টার সিস্টেম বা পণ্য বিনিময় প্রথা’ নয়। এখানে বিনিময়ের অভিযোগ আরও ভয়ংকর—অর্থ, তদবির, প্রভাব বা আনুগত্যের বিনিময়ে যদি পদায়ন, বদলি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার পাওয়া যায়, তাহলে প্রশাসনিক পদ আর দায়িত্ব থাকে না, সেটি বিনিয়োগে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
আর চেয়ার যখন বিনিয়োগ হয়, তখন জনগণই শেষ পর্যন্ত তার মূল্য দেয়।
সাম্প্রতিক একটি অডিও ঘিরে সেই প্রশ্ন আরও গুরুতর হয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানের বলে চিহ্নিত একটি কথোপকথনে ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার প্রসঙ্গও উঠে আসে। অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি এবং প্রত্যাহারের সরকারি আদেশে কারণ বলা হয়েছে ‘প্রশাসনিক’।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। ডিসেম্বরের কথা শুধু ওই অডিওতেই আসেনি। গত ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, তিনি ও তার দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান।
তাই প্রশ্নটি ‘একজন ওসি ডিসেম্বরের খবর পেলেন কোথা থেকে?’—এত সরল নয়।
প্রশ্নটি বরং আরও গভীর-
একটি থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কীভাবে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ভাষায় কথা বলার অবস্থানে পৌঁছান? আর একই কথোপকথনে যদি ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠে আসে, তাহলে বিষয়টি আর একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন রাষ্ট্রকে দেখতে হয়—পদায়নের ব্যবস্থাটি কতটা স্বচ্ছ?
কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর চেয়ারগুলোর একটি থানার ওসির চেয়ার। একজন ওসির হাতে মামলা, গ্রেপ্তার, তদন্ত, জননিরাপত্তা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলার বিপুল ক্ষমতা থাকে। সেই চেয়ার যদি যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ, তদবির বা অন্য কোনো অস্বচ্ছ বিনিময়ে পাওয়া যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—তিনি দায়িত্ব পালন করবেন সংবিধান ও আইনের প্রতি, নাকি যে ব্যবস্থার মাধ্যমে চেয়ারটি পেয়েছেন তার প্রতি?
এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয় বরং যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তার জন্য একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। আর এখানেই নির্বাচিত সরকারের দায় আরও বেশি।
কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাবদ্ধতার যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু জনগণের ভোটে দায়িত্ব নেওয়া সরকারের কাছে প্রত্যাশা হলো প্রতিষ্ঠানকে নিয়মে ফিরিয়ে আনা। সরকারের নিজের নির্দেশনাতেও নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাঠ প্রশাসনকে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে।
তারপরও যদি পুলিশ প্রশাসনের ভেতর থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের বক্তব্য শোনা যায়, তাহলে শুধু একজন ওসিকে প্রত্যাহার করলেই প্রশ্ন শেষ হয় না। অডিও সত্য হলে অভিযোগগুলোও তদন্ত করতে হবে। আর অডিও মিথ্যা বা বিকৃত হলে সেটিও জনগণকে জানাতে হবে।
কে টাকা দিয়েছে?
কে টাকা নিয়েছে?
কে মধ্যস্থতা করেছে?
কোন পদায়নে করেছে?
কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছে?
প্রমাণ না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামও পরিষ্কার করতে হবে। আর প্রমাণ পাওয়া গেলে দায় শুধু নিচের একজন কর্মকর্তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে চলবে না।
কারণ ঘুষ দিয়ে চেয়ার কেনা এবং ঘুষ নিয়ে চেয়ার দেওয়া একই বাজারের দুই প্রান্ত।
রাষ্ট্র যদি শুধু ক্রেতাকে ধরে, বিক্রেতাকে না ধরে—বাজার বন্ধ হবে না।
৫ আগস্টের পর আমরা বহুবার ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ শব্দটি শুনেছি। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা সংবিধানের বড় বড় অনুচ্ছেদে নয়, পরীক্ষা থানার একটি চেয়ারেও।
একজন ওসি কীভাবে ওসি হন?
একজন এসপি কীভাবে এসপি হন?
একজন ডিসি কীভাবে ডিসি হন?
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর যদি জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে দেওয়া যায়, তাহলে সংস্কারের অনেক বক্তৃতার প্রয়োজন হবে না। আর উত্তর যদি অস্বচ্ছ থাকে, তাহলে ‘বিনিময় প্রথা’ নিয়ে প্রশ্নও থামবে না। ৫ আগস্টের পর মানুষ শুধু ক্ষমতার মুখ পরিবর্তন দেখতে চায়নি, মানুষ চেয়েছিল ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতির পরিবর্তন।
সরকার বদলেছে—এটি ইতিহাস। কিন্তু চেয়ার পাওয়ার নিয়ম বদলেছে কি না—সেটিই হবে সংস্কারের পরীক্ষা। কারণ রাষ্ট্রের চেয়ার যদি অর্থ বা প্রভাবের বিনিময়ে পাওয়া যায়, তাহলে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্নটি থেকেই যায়— তাহলে কর্মকর্তা চেয়ারটির কাছে ঋণী, তিনি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হবেন কীভাবে?
লেখক: মো. আনোয়ারুল ইসলাম শামীম
সভাপতি, বাংলাদেশ রিফ্রিজারেন্ট গ্যাস অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ব্রামা)
আরটিভি/ এসকেডি



