
আদালতের একটি তারিখ মানে অনেকের জীবনে আরেকটি অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা কখনো জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার, কখনো পাওনা টাকা আদায়ের, কখনো অপরাধের বিচার পাওয়ার, আবার কখনো নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার। আদালতের নথিতে এসব কেবল মামলা নম্বর ও পক্ষের নাম কিন্তু প্রতিটি মামলার পেছনে থাকে মানুষের জীবনের একটি করে গল্প।
বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা যখন ৪৬ লাখ ছাড়িয়ে যায়, তখন এটিকে শুধু বিচার বিভাগের ওপর জমে থাকা কাজের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের সব স্তরের আদালতে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা অধস্তন আদালতেই।
এত বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। তবে মামলার সংখ্যা দিয়েই পুরো বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা মাপা যায় না। মামলা বাড়ার পেছনে যেমন নতুন বিরোধের সৃষ্টি আছে, তেমনি আছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সাক্ষ্য ও নথি ব্যবস্থাপনার সমস্যা, মুলতবি এবং আপিলের মতো স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘মামলা এত বেশি কেন’ নয়। বরং আরও জরুরি প্রশ্ন হলো, একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে এত সময় লাগে কেন এবং সেই অপেক্ষার মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেন?
৩১ মার্চ ২০২৬-এর হিসাবটি দেখলে সমস্যার ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়। আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি এবং অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা বিচারাধীন। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ৮৮ শতাংশই অধস্তন আদালতে। অধস্তন আদালতের এই চাপের মধ্যে দেওয়ানি মামলা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি এবং ফৌজদারি মামলা ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি।
এখানে বিচারকের সংখ্যা ও আদালতের সক্ষমতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্যে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ জন নতুন সিভিল জজ নিয়োগসহ আদালতের সহায়ক জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে। নতুন আদালত ও বিচারকের পদ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই মামলার জট কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি মামলার নিষ্পত্তির সঙ্গে বিচারকের পাশাপাশি যুক্ত থাকে আদালতের প্রশাসন, সমন জারি, সাক্ষীর উপস্থিতি, তদন্ত, নথি প্রস্তুত, আইনজীবী ও পক্ষগুলোর প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা। এসব জায়গার কোনো একটিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো মামলার ওপর। তাই মামলার জটকে শুধু বিচারকের স্বল্পতার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির একটি অংশই দেখা হবে।
বিচারের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব সংবিধানও স্বীকার করেছে। সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্বকে শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।
ফৌজদারি কার্যবিধিতেও নির্দিষ্ট মামলার বিচার শেষ করার সময়সীমা রয়েছে। ৩৩৯সি ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার গ্রহণের পর ১৮০ দিনের মধ্যে এবং সেশনস জজ, অতিরিক্ত সেশনস জজ বা সহকারী সেশনস জজের আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে, নির্দিষ্ট শর্তে জামিনের সুযোগের কথাও একই ধারায় বলা হয়েছে। তবে আইনে সময়সীমা নির্ধারিত থাকা আর বাস্তবে প্রতিটি মামলা সেই সময়ের মধ্যে শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। মামলার প্রকৃতি, সাক্ষী, আসামির অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
মামলার জট কমানোর ক্ষেত্রে তাই আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার গুরুত্বও বাড়ছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯এ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, উপযুক্ত বিরোধ যেন সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে না হয়।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন এসেছে আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০২৫ সনের ৩৫ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এ ২১খ, ২১গ, ২১ঘ ও ২১ঙ ধারা সংযোজন করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের বিরোধে আদালতে মামলা করার আগে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়ার বিধান করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় ১২টি জেলায় চালুর পর ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ তা আরও জেলায় সম্প্রসারিত হয়। সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে।
মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যকর হলে কিছু বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তির সুযোগ পাবে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ, সহজলভ্য ও কার্যকর হয় তার ওপর। বিশেষ করে আর্থিক বা সামাজিকভাবে দুর্বল কোনো পক্ষ যেন মধ্যস্থতার নামে আপস করতে বাধ্য না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্য বিচারপ্রাপ্তির পথ সংকুচিত করা নয়; বরং উপযুক্ত ক্ষেত্রে দ্রুত ও কম খরচে বিরোধের সমাধানের সুযোগ তৈরি করা।
প্রযুক্তিও এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমন জারি, মামলার নথি ব্যবস্থাপনা, মামলার তারিখ ও কার্যক্রম সম্পর্কে পক্ষগুলোকে দ্রুত জানানো এবং আদালতের প্রশাসনিক কাজ ডিজিটাল করা গেলে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রযুক্তি কোনো জাদুকাঠি নয়। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই মামলার জট কমে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মামলা ব্যবস্থাপনা।
কোন মামলা কত পুরোনো, কোন মামলায় কতবার সময় নেওয়া হয়েছে, কোন মামলায় সাক্ষ্য শেষ হয়েছে, কোন মামলায় রায় অপেক্ষমাণ, এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে। পুরোনো মামলাগুলোর জন্য আলাদা নজরদারি এবং নিয়মিত পর্যালোচনাও প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগের একটি উদাহরণ দেখা গেছে হাইকোর্ট বিভাগে। ১০ জুলাই ২০২৫ প্রধান বিচারপতি ২০০০ সালের আগে দায়ের করা ১০ হাজার ৩৮৫টি পুরোনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
তবে মামলার জট কমানোর আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়ো করে বিচার নয়। একজন আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই, ন্যায্য শুনানি এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ন রেখেই বিচারকে সময়োপযোগী করতে হবে। অন্যদিকে বছরের পর বছর একটি মামলাকে ঝুলিয়ে রাখাও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিচারব্যবস্থার জন্য আসল চ্যালেঞ্জ তাই দ্রুততা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।
মামলা কমানোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মামলার সংখ্যা কমানো নিজে কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়। কোনো নাগরিকের বৈধ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় মামলা, অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও প্রক্রিয়াগত বিলম্ব কমানো; আদালতে যাওয়ার অধিকার সীমিত করা নয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য কার্যকর আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা বিচারপ্রাপ্তির সমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৪৬ লাখের বেশি বিচারাধীন মামলা তাই শুধু আদালতের ভেতরের একটি সংকট নয়। এটি রাষ্ট্রের বিচারপ্রাপ্তির সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। নতুন বিচারক ও আদালত যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষ আদালত প্রশাসন, কার্যকর মামলা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার প্রসার। একই সঙ্গে প্রতিটি সংস্কারের ফলও পরিমাপ করতে হবে। কত মামলা কমল, কত সময় সাশ্রয় হলো, বিচারপ্রার্থীর খরচ কতটা কমল এবং কত দ্রুত কার্যকর প্রতিকার পাওয়া গেল, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো সংস্কারের সাফল্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
শেষ পর্যন্ত আদালতের নথিতে একটি মামলা একটি সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু বিচারপ্রার্থীর কাছে সেটি তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের শেষ কখন হবে, তা অনিশ্চিত হয়ে গেলে বিচার পাওয়ার অধিকার কাগজে থাকলেও তার বাস্তব মূল্য কমে যায়। তাই বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু মামলার সংখ্যা কমানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যেতে পারবেন এবং অযথা দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই আইনসম্মত ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ৪৬ লাখ মামলার পরিসংখ্যান আমাদের সেই প্রশ্নটিই সামনে এনে দেয়, আদালতের দরজা খোলা আছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা একজন মানুষ ন্যায়বিচারের কাছে পৌঁছাতে আর কতটা পথ পাড়ি দেবেন?
লেখা: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি
শিক্ষানবিশ আইনজীবী।
আরটিভি/এসকে


