ঢাকা শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের শঙ্কায় ট্রাম্প

ডা. মোহাম্মদ ওয়াজেদ এ খান

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
ডা. মোহাম্মদ ওয়াজেদ এ খান । ছবি: সংগৃহীত

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শঙ্কায় আছেন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদী কার্যকালের দুই বছর পর ঠিক মাঝপথে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে বলা হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন। একটি সাধারণ নির্বাচন এটি। আগামী ৩ নভেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে। সাধারণত নভেম্বরের প্রথম সোমবারের পরের প্রথম মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয় এই নির্বাচন। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস সদস্যদের মেয়াদ ২ বছর। ফলে নিম্নকক্ষের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন।

উচ্চকক্ষের সিনেটরদের মেয়াদ ৬ বছর। সিনেটে ১০০টি আসনের মধ্যে এবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩৫টি আসনে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত হবে গভর্নর নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের গতিপথ নির্ধারণসহ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এ নির্বাচন। মধ্যবর্তী নির্বাচনকে দেখা হয় বর্তমান প্রেসিডেন্টের কাজের প্রতি সমর্থন বা জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরিমাপক হিসেবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে পরিবর্তন হতে পারে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ। যা ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রেসিডেন্টের নীতি বাস্তবায়নে বড় প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্ববাসীর নজর এখন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে।

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকালের অর্ধেক সময় অতিবাহিত না হতেই হাঁপিয়ে উঠেছে দেশটির সাধারণ মানুষ। জ্বালানিসহ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি জনজীবনকে অস্থির করে তুলেছে। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধ বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে কোটি মানুষকে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটারদের কাছে ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ। ভোটারদের এই উদ্বেগের অন্যতম প্রধান কারণ মূল্যস্ফীতি।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য অনুযায়ী, কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে ০.৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩.৪ শতাংশে। খাবারের দাম ২.৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে এবং এনার্জির দাম বেড়েছে ১৬.৩ শতাংশ। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ অনুভব করছেন আমেরিকানরা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য। ট্রাম্পের একরোখা ও গণবিরোধী নীতি রিপাবলিকান পার্টিকে বাধ্য করছে জনপ্রিয়তা হারাতে। যা মানবিক মূল্যবোধ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ন্যায় নীতির পরিপন্থী বলে দাবি করছেন সাধারণ মানুষ। সবকিছু মিলিয়ে আমেরিকানরা পরিত্রাণ চায় শ্বাসরুদ্ধকর এমন অবস্থা থেকে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হতে পারে কংগ্রেসের। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ডনাল্ড ট্রাম্প একজন অস্থির প্রেসিডেন্ট। জনমত জরিপে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন তার পূর্বসূরিদের তুলনায় সবচেয়ে নিচে। ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিলে বাধা তৈরি হবে। যা বড় প্রভাব ফেলবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি বাস্তবায়ন ও ক্ষমতার ভারসাম্যে। কংগ্রেসের নজরদারি বাড়বে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর। কংগ্রেসে আইন প্রণয়ন, সরকারের বাজেট নির্ধারণ এবং হোয়াইট হাউসের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি চালাতে ডেমোক্র্যাটরা। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা মরিয়া কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ, ডিসিশন ডেস্ক এইচকিউ-এর হিসাবে রয়েছে এমন পূর্বাভাস। তাদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য আসন সংখ্যা ২৩৪টি, বিপরীতে রিপাবলিকানদের ২০১টি। লড়াইটি সিনেটের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে ৫১-৪৯ ব্যবধানে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। শুধু প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং সমন জারি করে ক্ষমতা পাবে সাক্ষ্য তলবের। দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহির আওতায় আনা, স্বাস্থ্যবিমা ভর্তুকি পুনর্বহাল, ট্রাম্পের শুল্কনীতি বাতিল এবং উদ্যোগ নেবে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বন্ধের। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে দলটির নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে রিপাবলিকানরা জয়ী হলে।

কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ম্যাজিক’ সংখ্যাটি হচ্ছে ২১৮। রিপাবলিকানরা ২০২৪ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল ২২০-২১৫ ব্যবধানে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেতে হলে ডেমোক্র্যাটদের এবার বাড়াতে হবে ৩টি আসন। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে মৃত্যু, পদত্যাগ এবং একজন সদস্যের দলবদলের কারণে ২১৮ জন রিপাবলিকান, ২১৪ জন ডেমোক্র্যাট ও একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন। শূন্য রয়েছে দুটি আসন। ফলে দুটি আসন হারালেও রিপাবলিকানদেরপক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা সম্ভব। কিন্তু তা সম্ভব হবে না তিনটি আসন হারালে। সিনেটে নির্বাচন হচ্ছে ৩৫টি আসনে। এর মধ্যে ৩৩টি আসনের নিয়মিত ছয় বছর মেয়াদি নির্বাচনের অংশ। বিশেষ নির্বাচন হচ্ছে ফ্লোরিডা ও ওহাইওতে দুটি আসনে। সিনেটে ১০০ আসনের মধ্যে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে ৫৩-৪৭ ব্যবধানে। এ হিসাবে ভোট দেওয়া দুই স্বতন্ত্র সিনেটরকেও ধরা হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে। ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের ৫১ আসনে পৌঁছাতে বাড়াতে হবে ৪টি আসন। সিনেটে ৫০-৫০ সমতা হলে সিদ্ধান্ত হবে রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ভোটে।

যেসব প্রেসিডেন্ট মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারান

ঐতিহাসিক্রভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয় একটি সাধারণ প্রবণতা। ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত কংগ্রেসের আসন হারায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে। প্রায় সব প্রেসিডেন্টই কংগ্রেসে তাদের নিয়ন্ত্রণ হারান প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে। ধাক্কা খান বড় ধরনের। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই অভিশাপকে রাজনৈতিকভাবে বলা হয় “মিডটার্ম কার্স”। ইতিহাসের এসব প্রেসিডেন্টদের মধ্যে হ্যারি এস ট্রুম্যান ১৯৪৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল ডেমোক্রেটিক পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারায়। দলটি রেকর্ড ৫৫টি আসন হারায় প্রতিনিধি পরিষদে। ডোয়াইট ডি আইজেনহাওয়ার ১৯৫৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খান। তার দল রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৪৮টি এবং সিনেটে ১৩টি আসন হারায় অর্থনৈতিক মন্দার মুখে। প্রথম মেয়াদে ১৯৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিল ক্লিনটন নিয়ন্ত্রণ হারান কংগ্রেসের উভয় কক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে। জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকান পার্টি ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল কংগ্রেসের উভয় কক্ষের। স্বাস্থ্যসেবা আইন-ওবামাকেয়ার নিয়ে বিতর্কের জেরে ২০১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব হারান বারাক ওবামা। প্রতিনিধি পরিষদে বড় পরাজয় বরণ করে ডেমোক্রেটরা। বিশাল পরাজয় হিসেবে যাকে অভিহিত ওবাশা “শেল্যাকেন্টিং” বলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ১৮ বার প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে প্রেসিডেন্টের দল। প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬টি আসন এবং সিনেটে গড়ে ৪টি আসন হারায়। ব্যতিক্রম ছিল ১৯৩৪ ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এবং ২০০২ জর্জ ডব্লিউ বুশ, এই মাত্র দুবার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সক্ষম হয়েছিল কংগ্রেসের উভয় হাউসেই আসন বাড়াতে। সিক্স-ইয়ার ইচ প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রবণতা দেখা যায় প্রথম মেয়াদের চেয়ে সাধারণত বেশি আসন হারানোর।

এছাড়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে গভর্নর নির্বাচন হবে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের মোট অঙ্গরাজ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। অঙ্গরাজ্য আইনসভার নিয়মিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে—এমন আসনসংখ্যা ৬১৩৯। নির্বাচনে তারা কোন দলের প্রার্থীকে সমর্থন করবেন জনমত জরিপে এমন প্রশ্নে রিপাবলিকানদের চেয়ে ১২ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে আছেন ডেমোক্র্যাটরা। রয়টার্সের জরিপে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার সর্বনিম্ন ছিল ৩২ শতাংশ। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে একমাত্র কংগ্রেসের উভয় হাউজে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় রুখে দিতে পারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অপ্রতিরোধ্যগতি। যুক্তরাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থায় আনতে পারে সাংবিধানিক ভারসাম্য। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী কামালা হ্যারিসকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সে সময় নির্বাচন বিতর্কে প্রাধান্য পায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজা ইস্যু। এছাড়া আভ্যন্তরীন ইমিগ্রেশন ইস্যু, বিশেষ করে আইসের মাধ্যমে ধরপাকড় ও ডিপোর্টেশন। জয়ী ট্রাম্প এজন্য অতিরিক্ত তহবিলি জোগার করে ওয়ান বিগ বিউটিফুল এ্যাক্টের মাধ্যমে। এছাড়া চলতি বছর মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াকে সহজভাবে নিচ্ছেন না আমেরিকানরা। মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে এসব ইস্যু।

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রধান ইস্যুর মধ্যে থাকছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত প্রসার এবং ডাটা সেন্টার, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, হেলথ কেয়ার, ট্যারিফ। বিদেশ নীতির অন্যতম ইস্যু হচ্ছে আমেরিকান মিত্রদের সাথে সম্পর্ক, ইরান যুদ্ধ ও প্যালেস্টাইন-ইসরাইল বিরোধ।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যয়

মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার ব্যয় হতে পারে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে এই পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে অ্যাড ট্র্যাকিং কোম্পানি অ্যাডইমপ্যাক্টের। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় বিজ্ঞাপনে যে অর্থ ব্যয় হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি হবে এবার। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের প্রাইমারি নির্বাচনে এ বছর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে ২৪৯৭ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদের আসনের জন্য লড়েছেন ২ হাজার ২৩২ জন। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৪টি আসনে ৩ নভেম্বরের ভোটে প্রধান দুই দলের ওই প্রার্থীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যারা ২০২৪ সালের নির্বাচনেও ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচনে ভোটার টানার প্রচারে ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকান পার্টির তহবিলে আছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।

এই অর্থ দিয়ে পরাজয় ঠেকানো যাবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে দলের ভেতরে। তহবিল বণ্টন হয়েছে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে। ট্রাম্প সমর্থকদের তৈরি ‘মাগা ইঙ্ক’ বা মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন ইনকরপোরেশন পেয়েছে সবচেয়ে বড় অংশ। মাগা ইঙ্ক মূলত রাজনীতিতে নির্বাচনী প্রচার অর্থের ক্ষমতারও পরীক্ষা নিচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রায়ই তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করছে। রাজনৈতিক দলগুলো কত টাকা খরচ করতে পারবে, তার ওপর থাকা বাধ্যবাধকতা গত জুন মাসে তুলে নেয় সুপ্রিম কোর্ট। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থের ছড়াছড়ি শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ব্যবস্থায়।সংসদ নির্বাচন কভারেজ

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউইয়র্ক।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
আজ মহান শিক্ষক দিবস। জীবনের এই বিশেষ দিনে সবার আগে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই আমার জীবনের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক—আমার আম্মুকে। আমার জীবনের প্রতিটি ভালো অর্জনের পেছনে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। তার ভালোবাসা, শাসন, ত্যাগ ও নিরন্তর অনুপ্রেরণাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। এরপর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমার স্কুলজীবনের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের—প্রধান শিক্ষক দীন ইসলাম স্যার, ফরিদা ইয়াসমিন (আমার চাচি), নিপা মেম, হেলানা মেম ও ফাতেমা মেমকে। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্নেহেই চতুর্থ শ্রেণিতে আমার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করেছিল। তাদের শেখানো অনেক কথাই আজও আমার পথচলার অনুপ্রেরণা। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যখন মাধ্যমিক জীবনে পা রাখলাম, তখন নতুন করে কিছু মানুষ আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাদের স্নেহ, শাসন ও অনুপ্রেরণায় পেয়েছি নতুন পথের সন্ধান। তাদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক রেহানা মেম, শিলা মেম, তানিয়া মেম, দোলা মেম, হুজুর স্যার ও রাসেল স্যার অন্যতম। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই পেয়েছি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। এরপর এলো কলেজজীবন। জীবনের এই অধ্যায়েও কিছু মানুষ আমার স্বপ্নকে আরও বড় করে তুলেছেন। রাবেয়া মেম, দীপ্তি মেম, শামীম স্যার, দেলোয়ার স্যার ও আবুবকর স্যার—তাদের নাম আমি কখনোই ভুলতে পারব না। তারা আমাকে শুধু পড়াননি; বরং স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছেন এবং বিশ্বাস করিয়েছেন—‘আমি পারব।’ তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার ফলেই আজ আমি দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে তাদের অনুপ্রেরণায়ই ঢাবিতে (কলা অনুষদের নরমাল সাবজেক্টে), রাবি ও চবিতে ভর্তির সুযোগ হয়েছিল। আমার জীবনের সেই সময়ে তাদের উৎসাহ ও বিশ্বাস আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। বর্তমানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পথচলায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদানও আমি কখনো ভুলব না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের যে স্নেহ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা—তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শুধু একাডেমিক শিক্ষা নয়, বরং জীবনকে কীভাবে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে হয়, সেটিও শেখার সুযোগ পাচ্ছি। শিক্ষাজীবনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকদের বাইরেও আমার জীবনে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে আমার চাচাতো বড় বোন মিম আপুর। ছোটবেলা থেকেই তিনি আমাকে অনেক অঙ্ক অনুশীলন করিয়েছেন। তার সেই পরিশ্রম ও সময় দেওয়ার সুফল আমি আজও পাচ্ছি। অনেক সময় একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে থাকেন না, কিন্তু তার শেখানোটা সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়—মিম আপু আমার জন্য তেমনই একজন। এর পাশাপাশি ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা আমার শেখার জগৎকে আরও বিস্তৃত করেছে। সাংবাদিকতা করার সুবাদে আরটিভির অনলাইন ইনচার্জ আজাদ ভাই এবং শিফট ইনচার্জ ইমতিয়াজ ভাইয়ের কাছ থেকেও প্রতিনিয়ত অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি। সংবাদকে কীভাবে দেখতে হয়, তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং কাজের প্রতি আন্তরিকতা— এসব বিষয়ে তাদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আমার ভবিষ্যৎ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাদের প্রতিও রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনো শিক্ষক আমার হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন। কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়, কেউ শিখিয়েছেন কীভাবে কঠিন সময়ে হাল না ছেড়ে এগিয়ে যেতে হয়, আবার কেউ আমার ওপর বিশ্বাস রেখে আমাকে নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। আজ আমি যে পরিচয়ে পরিচিত, তার পেছনে আমার বাবা-মায়ের পাশাপাশি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের দেওয়া শিক্ষা, শাসন, স্নেহ, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। আমার জীবনের পথচলায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রত্যেকের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা। শিক্ষক শুধু একটি পেশার নাম নয়; একজন শিক্ষক একটি জীবন বদলে দিতে পারেন। আর জীবনের এই দীর্ঘ পথে কিছু মানুষ শিক্ষক না হয়েও আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে যান। তাই এই মহান দিবসে আমার শিক্ষকদেরসহ বিশ্বের সকল শিক্ষকের প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা। শুভ শিক্ষক দিবস। আবুবকর সম্পদ জবি সংবাদদাতা, আরটিভি আহ্বায়ক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি আরটিভি/এমএইচজে
শিক্ষক থেকে পথপ্রদর্শক: যাদের কাছে ঋণী আমি
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় মতামত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের জন্য বড় সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থ, সময়, মানসিক চাপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—চিকিৎসা নিয়ে প্রত্যাশা। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার কাছে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়—দ্বিতীয় মতামত নেওয়া। দ্বিতীয় মতামত মানে প্রথম চিকিৎসককে অবিশ্বাস করা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিকিৎসা সিদ্ধান্তের আগে আরেকজন যোগ্য বিশেষজ্ঞের মতামত জানা। এতে রোগী ও পরিবার রোগের অবস্থা, চিকিৎসার বিকল্প, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দেশে বা বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন। আমাদের দেশে কোনো জটিল রোগ ধরা পড়লেই অনেক পরিবার প্রথমে বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবেন। আবার কেউ পরিচিত কারও অভিজ্ঞতাকে নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্তের ভিত্তি করেন। কিন্তু একই রোগ হলেও প্রতিটি রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং ঝুঁকি এক নয়। তাই একজনের ভালো অভিজ্ঞতা অন্যজনের জন্য একই ফল নিশ্চিত করে না। আমার দৃষ্টিতে, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?” এর উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় জানা দরকার। রোগটি ঠিক কী? চিকিৎসার উদ্দেশ্য কী? দেশে এই চিকিৎসার উপযুক্ত সক্ষমতা আছে কি না? বিদেশে গেলে অতিরিক্ত কী সুবিধা পাওয়া যাবে? সম্ভাব্য খরচ কত? আর চিকিৎসার পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ কীভাবে হবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং চিকিৎসক ও রোগীর যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে। চিকিৎসার মান শুধু একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে না; নিরাপত্তা, রোগীকেন্দ্রিকতা, সময়োপযোগিতা এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে একটি চিকিৎসা করিয়ে দেশে ফিরে আসার পর পরবর্তী চিকিৎসা কোথায় হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কোথায় হবে এবং চিকিৎসার তথ্য স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে—এসবও সিদ্ধান্তের অংশ হওয়া উচিত। কারণ চিকিৎসা একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তবে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া মানেই চিকিৎসা পরিবর্তন করতে হবে—এমন নয়। অনেক সময় দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের মতামত প্রথম চিকিৎসা পরিকল্পনাকেই আরও পরিষ্কার করে। আবার কখনো নতুন কোনো বিকল্প সামনে আসতে পারে। মূল বিষয় হলো—রোগী যেন নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া ভুল—এমন কথা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিদেশে গেলেই ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। আবার অনেক চিকিৎসার জন্য দেশের মধ্যেই উপযুক্ত সক্ষমতা থাকতে পারে। তাই আমার কাছে বিদেশে চিকিৎসার প্রশ্নটি “দেশ না বিদেশ”—এভাবে দেখার চেয়ে “প্রয়োজনের জন্য সঠিক জায়গা কোথায়?”—এই প্রশ্নে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীকে কোনো একটি সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয় না। বরং তাকে সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় বিকল্প এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত রোগী বিদেশে যাবেন, নাকি দেশে চিকিৎসা নেবেন—সিদ্ধান্তটি তার। আমাদের দায়িত্ব হলো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট তথ্য ও আস্থার সুযোগ দেওয়া। কারণ চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কখনো কখনো আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতামত শুধু একটি অতিরিক্ত পরামর্শ নয়— এটি হতে পারে আরও সচেতন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম। আরটিভি/ এসকেডি
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে দ্বিতীয় মতামত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের কেন্দ্রে (হাব) পরিণত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের।
আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্পের হাব হতে পারে বাংলাদেশ: জেট্রো
৪৬ লাখ মামলা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কত দীর্ঘ?
আদালতের একটি তারিখ মানে অনেকের জীবনে আরেকটি অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা কখনো জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার, কখনো পাওনা টাকা আদায়ের, কখনো অপরাধের বিচার পাওয়ার, আবার কখনো নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার। আদালতের নথিতে এসব কেবল মামলা নম্বর ও পক্ষের নাম কিন্তু প্রতিটি মামলার পেছনে থাকে মানুষের জীবনের একটি করে গল্প। বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা যখন ৪৬ লাখ ছাড়িয়ে যায়, তখন এটিকে শুধু বিচার বিভাগের ওপর জমে থাকা কাজের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের সব স্তরের আদালতে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা অধস্তন আদালতেই। এত বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। তবে মামলার সংখ্যা দিয়েই পুরো বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা মাপা যায় না। মামলা বাড়ার পেছনে যেমন নতুন বিরোধের সৃষ্টি আছে, তেমনি আছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সাক্ষ্য ও নথি ব্যবস্থাপনার সমস্যা, মুলতবি এবং আপিলের মতো স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়া। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘মামলা এত বেশি কেন’ নয়। বরং আরও জরুরি প্রশ্ন হলো, একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে এত সময় লাগে কেন এবং সেই অপেক্ষার মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেন? ৩১ মার্চ ২০২৬-এর হিসাবটি দেখলে সমস্যার ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়। আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৭১৩টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৫ লাখ ২২ হাজার ৩৩১টি এবং অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা বিচারাধীন। অর্থাৎ মোট বিচারাধীন মামলার প্রায় ৮৮ শতাংশই অধস্তন আদালতে। অধস্তন আদালতের এই চাপের মধ্যে দেওয়ানি মামলা ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি এবং ফৌজদারি মামলা ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি। এখানে বিচারকের সংখ্যা ও আদালতের সক্ষমতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্যে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ৫৩৬টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫০ জন নতুন সিভিল জজ নিয়োগসহ আদালতের সহায়ক জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে। নতুন আদালত ও বিচারকের পদ সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু বিচারকের সংখ্যা বাড়ালেই মামলার জট কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একটি মামলার নিষ্পত্তির সঙ্গে বিচারকের পাশাপাশি যুক্ত থাকে আদালতের প্রশাসন, সমন জারি, সাক্ষীর উপস্থিতি, তদন্ত, নথি প্রস্তুত, আইনজীবী ও পক্ষগুলোর প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ধরনের আনুষ্ঠানিকতা। এসব জায়গার কোনো একটিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো মামলার ওপর। তাই মামলার জটকে শুধু বিচারকের স্বল্পতার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির একটি অংশই দেখা হবে। বিচারের ক্ষেত্রে সময়ের গুরুত্ব সংবিধানও স্বীকার করেছে। সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অযৌক্তিক বিলম্বকে শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এটি ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও নির্দিষ্ট মামলার বিচার শেষ করার সময়সীমা রয়েছে। ৩৩৯সি ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার গ্রহণের পর ১৮০ দিনের মধ্যে এবং সেশনস জজ, অতিরিক্ত সেশনস জজ বা সহকারী সেশনস জজের আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে, নির্দিষ্ট শর্তে জামিনের সুযোগের কথাও একই ধারায় বলা হয়েছে। তবে আইনে সময়সীমা নির্ধারিত থাকা আর বাস্তবে প্রতিটি মামলা সেই সময়ের মধ্যে শেষ হওয়া এক বিষয় নয়। মামলার প্রকৃতি, সাক্ষী, আসামির অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। মামলার জট কমানোর ক্ষেত্রে তাই আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থার গুরুত্বও বাড়ছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯এ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, উপযুক্ত বিরোধ যেন সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে না হয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন এসেছে আইনগত সহায়তা ব্যবস্থায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ২০২৫ সনের ৩৫ নং অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এ ২১খ, ২১গ, ২১ঘ ও ২১ঙ ধারা সংযোজন করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের বিরোধে আদালতে মামলা করার আগে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়ার বিধান করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফায় ১২টি জেলায় চালুর পর ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ তা আরও জেলায় সম্প্রসারিত হয়। সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে। মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যকর হলে কিছু বিরোধ আদালতে যাওয়ার আগেই নিষ্পত্তির সুযোগ পাবে। এতে আদালতের ওপর চাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ, সহজলভ্য ও কার্যকর হয় তার ওপর। বিশেষ করে আর্থিক বা সামাজিকভাবে দুর্বল কোনো পক্ষ যেন মধ্যস্থতার নামে আপস করতে বাধ্য না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্দেশ্য বিচারপ্রাপ্তির পথ সংকুচিত করা নয়; বরং উপযুক্ত ক্ষেত্রে দ্রুত ও কম খরচে বিরোধের সমাধানের সুযোগ তৈরি করা। প্রযুক্তিও এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমন জারি, মামলার নথি ব্যবস্থাপনা, মামলার তারিখ ও কার্যক্রম সম্পর্কে পক্ষগুলোকে দ্রুত জানানো এবং আদালতের প্রশাসনিক কাজ ডিজিটাল করা গেলে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রযুক্তি কোনো জাদুকাঠি নয়। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই মামলার জট কমে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট মামলা ব্যবস্থাপনা। কোন মামলা কত পুরোনো, কোন মামলায় কতবার সময় নেওয়া হয়েছে, কোন মামলায় সাক্ষ্য শেষ হয়েছে, কোন মামলায় রায় অপেক্ষমাণ, এসব তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে। পুরোনো মামলাগুলোর জন্য আলাদা নজরদারি এবং নিয়মিত পর্যালোচনাও প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগের একটি উদাহরণ দেখা গেছে হাইকোর্ট বিভাগে। ১০ জুলাই ২০২৫ প্রধান বিচারপতি ২০০০ সালের আগে দায়ের করা ১০ হাজার ৩৮৫টি পুরোনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলোতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে মামলার জট কমানোর আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়ো করে বিচার নয়। একজন আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাই, ন্যায্য শুনানি এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ন রেখেই বিচারকে সময়োপযোগী করতে হবে। অন্যদিকে বছরের পর বছর একটি মামলাকে ঝুলিয়ে রাখাও ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিচারব্যবস্থার জন্য আসল চ্যালেঞ্জ তাই দ্রুততা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা। মামলা কমানোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মামলার সংখ্যা কমানো নিজে কোনো চূড়ান্ত সাফল্য নয়। কোনো নাগরিকের বৈধ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকতে হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত অপ্রয়োজনীয় মামলা, অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও প্রক্রিয়াগত বিলম্ব কমানো; আদালতে যাওয়ার অধিকার সীমিত করা নয়। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য কার্যকর আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা বিচারপ্রাপ্তির সমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ৪৬ লাখের বেশি বিচারাধীন মামলা তাই শুধু আদালতের ভেতরের একটি সংকট নয়। এটি রাষ্ট্রের বিচারপ্রাপ্তির সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। নতুন বিচারক ও আদালত যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষ আদালত প্রশাসন, কার্যকর মামলা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার প্রসার। একই সঙ্গে প্রতিটি সংস্কারের ফলও পরিমাপ করতে হবে। কত মামলা কমল, কত সময় সাশ্রয় হলো, বিচারপ্রার্থীর খরচ কতটা কমল এবং কত দ্রুত কার্যকর প্রতিকার পাওয়া গেল, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া কোনো সংস্কারের সাফল্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। শেষ পর্যন্ত আদালতের নথিতে একটি মামলা একটি সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু বিচারপ্রার্থীর কাছে সেটি তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের শেষ কখন হবে, তা অনিশ্চিত হয়ে গেলে বিচার পাওয়ার অধিকার কাগজে থাকলেও তার বাস্তব মূল্য কমে যায়। তাই বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য শুধু মামলার সংখ্যা কমানো হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ অধিকার লঙ্ঘিত হলে আদালতে যেতে পারবেন এবং অযথা দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়াই আইনসম্মত ও কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ৪৬ লাখ মামলার পরিসংখ্যান আমাদের সেই প্রশ্নটিই সামনে এনে দেয়, আদালতের দরজা খোলা আছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করা একজন মানুষ ন্যায়বিচারের কাছে পৌঁছাতে আর কতটা পথ পাড়ি দেবেন? লেখা: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি শিক্ষানবিশ আইনজীবী।  আরটিভি/এসকে
৪৬ লাখ মামলা, ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কত দীর্ঘ?
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার এক তাৎপর্যপূর্ণ, সময়োপযোগী ও ভারসাম্যের প্রতিফলন। 
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষার দূরদর্শী প্রতিফলন
আরও পড়ুন
লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কুলগুলোতে মারামারি নিয়ে নিরাপত্তাশঙ্কায় অভিভাবকেরা
মেক্সিকোতে উপকূলে ধেয়ে আসছে হারিকেন, ৭ ফুট জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা
১০ মাসের বেশি সমুদ্রে, ঘরে ফিরল মার্কিন রণতরির নাবিকেরা
প্রচারণার পোস্টার ঠিক করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার প্রার্থী, তদন্তে পুলিশ