
বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে, যা এখনো আমাদের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। একদিকে জাপান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজমালিকানা-অধিকারী দেশ; অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রশিক্ষিত মেরিন ক্যাডেট তৈরি করছে। এই দুই সক্ষমতার মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা গেলে বাংলাদেশের তরুণ মেরিন ক্যাডেটদের জন্য আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সম্ভাবনাকে একটি সুপরিকল্পিত জাতীয় উদ্যোগে রূপ দিতে পারব?
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএনসিটিএডি-এর (UNCTAD) রিভিউ অফ মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট ২০২৫ (Review of Maritime Transport 2025) অনুযায়ী, জাহাজমালিকানার ভিত্তিতে জাপান বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ। বৈশ্বিক বাণিজ্যিক জাহাজের ধারণক্ষমতার প্রায় ৯.৯ শতাংশ জাপানি মালিকানাধীন। জাপানের আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্পে রয়েছে বৃহৎ জাহাজবহর, উন্নত প্রযুক্তি এবং সুসংগঠিত মেরিটাইম ব্যবস্থাপনা। ফলে বাংলাদেশের প্রশিক্ষিত ক্যাডেটদের জন্য এই শিল্পে প্রবেশের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করা যুক্তিসংগত।
তবে জাপানের বিশাল জাহাজবহরকে সরাসরি চাকরির নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না। বিদেশি ক্যাডেট নিয়োগের নীতি, কোম্পানিগুলোর প্রকৃত জনবল চাহিদা, প্রশিক্ষণের মান এবং আন্তর্জাতিক সনদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করেই এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি একটি সুস্পষ্ট প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান পরিকল্পনা।
প্রশিক্ষণ থেকে কর্মসংস্থান: একটি সমন্বিত উদ্যোগ
বাংলাদেশের মেরিন একাডেমিগুলোতে ক্যাডেটদের প্রাথমিক পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমুদ্র পরিবহন খাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু একাডেমিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়। জাহাজে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, সমুদ্রকালীন অভিজ্ঞতা (sea time), পেশাগত যোগাযোগ, নিরাপত্তা দক্ষতা এবং নিয়োগদাতার নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনও অপরিহার্য।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় বাংলাদেশের দুটি বা তিনটি সরকারি মেরিন একাডেমিকে নিয়ে একটি বিশেষ বাংলাদেশ–জাপান মেরিটাইম অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা যেতে পারে। নির্বাচিত একাডেমিগুলোতে জাপানি শিপিং কোম্পানি ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় স্বল্পমেয়াদি বিশেষায়িত কোর্স, সিমুলেটরভিত্তিক অনুশীলন, সামুদ্রিক ইংরেজি, প্রাথমিক জাপানি ভাষা এবং আধুনিক জাহাজ পরিচালনার ওপর প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।
এই উদ্যোগের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যুক্ত করতে হবে—জাহাজে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং চাকরির সম্ভাব্য পথ। কারণ প্রশিক্ষণ শেষ করার পর ক্যাডেটরা যদি সমুদ্রগামী জাহাজে প্রয়োজনীয় সমুদ্রকালীন অভিজ্ঞতা (sea time) অর্জনের সুযোগ না পান, তাহলে তাদের পেশাগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জাপানি শিপিং কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব
Mitsui O.S.K. Lines (MOL), NYK Line এবং Kawasaki Kisen Kaisha (K Line)-এর মতো জাপানি শিপিং কোম্পানির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। এসব কোম্পানিকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশের ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ, জাহাজে ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করা উচিত।
এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হবে শুধু একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা নয়; বরং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা। জাপানি কোম্পানিগুলো কী ধরনের ক্যাডেট চায়, কোন যোগ্যতা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বছরে কতজন ক্যাডেটকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে পারে—এসব বিষয়ে লিখিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
জাপানের সঙ্গে নাবিক প্রশিক্ষণে সহযোগিতার ঐতিহাসিক নজিরও রয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০০৭ সালের ওডিএ (ODA) শ্বেতপত্রে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নাবিক প্রার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি কর্মসূচির উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ওই কর্মসূচিতে ১ হাজার ৯৪ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছিলেন এবং তাদের অর্ধেকের বেশি জাপানি শিপিং কোম্পানিতে কর্মসংস্থান পেয়েছিলেন। এটি বর্তমান কর্মসূচির প্রমাণ নয়, তবে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানকে একসঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা।
৫০০ ক্যাডেটের কর্মসংস্থান: বাস্তবসম্মত লক্ষ্য
বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত লক্ষ্য হতে পারে, জাপানি শিপিং কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ৫০০ জন মেরিন ক্যাডেটের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুরুতেই বড় কর্মসূচি গ্রহণ না করে প্রথম পর্যায়ে ১০০ জন ক্যাডেট নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করা যেতে পারে।
প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত ক্যাডেটদের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাগত প্রস্তুতি এবং জাহাজে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এরপর নিয়োগদাতার মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণের ফলাফল এবং প্রকৃত কর্মসংস্থানের হার পর্যালোচনা করে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি: ৫০০ জনের কর্মসংস্থান একটি প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা, কোনো জাপানি কোম্পানির নিশ্চিত নিয়োগ-প্রতিশ্রুতি নয়। কোম্পানিগুলোর লিখিত সম্মতি, জাহাজে প্রশিক্ষণের আসন এবং বাস্তব জনবল চাহিদার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর: একটি সুযোগ
বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি সহযোগিতার পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানও গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এই প্রস্তাবটি আলোচনায় আনতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাপানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ করতে পারে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর বাংলাদেশের একাডেমিগুলোর সক্ষমতা এবং ক্যাডেটদের যোগ্যতা মূল্যায়ন করতে পারে। একই সঙ্গে জাপানি শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, সমুদ্রকালীন অভিজ্ঞতা (sea time) এবং সম্ভাব্য নিয়োগের কাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে।
প্রয়োজনে একটি যৌথ কর্মদল গঠন করে ছয় মাসের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই, অংশীদার প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ, ব্যয় এবং পাইলট কর্মসূচির বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রস্তুত করা যেতে পারে। এতে প্রস্তাবটি কেবল আলোচনার বিষয় না থেকে বাস্তবায়নযোগ্য নীতিগত উদ্যোগে রূপ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
এখনই নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন
মেরিটাইম শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রশিক্ষিত তরুণেরা তাদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পান। আন্তর্জাতিক জাহাজে কর্মসংস্থান শুধু ব্যক্তিগত আয়ের বিষয় নয়; এটি দেশের দক্ষ জনশক্তির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, বৈদেশিক আয় এবং মেরিটাইম খাতের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে জাপানের জাহাজমালিকানা ও প্রশিক্ষণ সক্ষমতার সঙ্গে নিজেদের মেরিন একাডেমিগুলোকে যুক্ত করার। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত লক্ষ্য, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং প্রশিক্ষণ থেকে কর্মসংস্থান পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর উপলক্ষে তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একটি সুস্পষ্ট প্রশ্ন রাখা যেতে পারে: বাংলাদেশের ৫০০ মেরিন ক্যাডেটের জন্য জাপানি সমুদ্রগামী জাহাজে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব কি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় না?
এখনই উদ্যোগ নেওয়া গেলে বাংলাদেশের মেরিন ক্যাডেটদের জন্য আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের একটি নতুন পথ উন্মুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
লেখক: মোস্তফা আজিজ শাহীন
সাবেক মেরিনার; সহকারী অধ্যাপক পোর্ট অ্যান্ড শিপিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি।
আরটিভি/জেএমএ



