ঢাকা শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

বিপ্লব ও সংহতি দিবস: জিয়া জাতির নির্ভরতার মহান কাণ্ডারি

গাজীউল হাসান খান

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫০ এএম
ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনা অধিনায়ক ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের জীবন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির ইতিহাসে ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। ৭ নভেম্বর সংগঠিত সিপাহি-জনতার বিপ্লবই আমাদের মহান স্বাধীনতার ঘোষক এবং মুক্তিযুদ্ধের অগ্রনায়ক জিয়াউর রহমানকে দেশের রাজনীতিতে টেনে এনেছিল, এক কঠিন সময়ে তাকে জাতির মহান কাণ্ডারির ভূমিকায় বসিয়েছিল।

একজন সৈনিক হিসেবে গণচীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েও জিয়াউর রহমান কোনো শ্রেণিসংগ্রামী সংগঠন বা বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হননি। মুক্তিযুদ্ধের পর, অর্থাৎ পরবর্তী জীবনে, জিয়া বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি গঠন করেন এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির প্রশাসনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব প্রদান করেন।

সৈনিক জিয়াউর রহমান প্রথাগত রাজনীতির বাইরে থেকে এসেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও কৃষ্টি-সংস্কৃতিগত অবস্থান, প্রকৃতি ও পরিস্থিতি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রে তার ক্ষমতা বা প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করে তিনি অতি দ্রুত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদভিত্তিক এক গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পান, যা তাকে এ দেশের গ্রামগঞ্জ থেকে শহর-নগরে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এ দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসেন।

বাংলাদেশের মানুষ শুরু থেকেই জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব ও কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হয়। তখন থেকেই তাকে ঘিরে এদেশের মানুষ একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

বিদেশি প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা সব রকমের আধিপত্যবাদকে অগ্রাহ্য করে প্রকৃত অর্থে নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করে তুলতে সচেষ্ট হয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম সংগ্রামী ও নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জাতির নেতা হিসেবে জিয়াউর রহমান এ অঞ্চলের মানুষকে, অর্থাৎ পাহাড় থেকে সমতলের গোটা জনগোষ্ঠীকে, একটি স্বতন্ত্র বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। সে কারণে তিনি তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও বহুবিধ জাতীয় কর্মসূচিতে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে এক ও অভিন্ন মনে করেননি এবং কখনও একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হননি।

প্রাচীনকাল থেকে উপমহাদেশের রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্যান-ধারণায় সর্বত্রই হিন্দু বাঙালিদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান প্রাধান্য পেয়েছে। সেখানে বাঙালি মুসলমানদের কোনো স্বকীয় বৈশিষ্ট্য কিংবা বিধি-বিধানের প্রতিফলন ঘটেনি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগানের অন্তর্নিহিত ভাবধারা কিংবা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দুত্ববাদের ধ্যান-ধারণায় বাঙালি মুসলমানদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিধি-বিধান কিংবা ধর্মীয় স্বকীয়তা এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কোনো স্থান বা প্রভাব কখনও পরিলক্ষিত হয়নি।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা সংস্কৃতি বলতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা, আচার-অনুষ্ঠান ও ভাবধারাকেই বোঝানো হতো। সে হিসেবে উনিশ শতকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে উন্মেষ বা উত্থান ঘটেছিল, সেটিও ছিল বাঙালি হিন্দুর কৃষ্টি-সংস্কৃতিগত কিংবা ধর্মীয় পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ।

রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বাধীন সে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বা সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়াসকে ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ বলে উল্লেখ করা হলেও মূলত সেগুলো ছিল বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড, যাতে বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায়ের তেমন কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। তা ছাড়া ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাঙালিদের জাতিগতভাবে তখন ‘মুসলমান’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো।

সে কারণে অনেক প্রভাবশালী মহলও তখন বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলতে হিন্দু প্রভাবাধীন কর্মকাণ্ডকেই বুঝতেন। বাংলাভাষী হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রদায়গত বৃহত্তর সংহতি, একতা কিংবা সমৃদ্ধির লক্ষ্যে তেমন কোনো জাতীয় কর্মসূচি তখন গৃহীত হয়েছে বলে শোনা যায় না। সে কারণেই হয়তো পরবর্তী পর্যায়ে বেঙ্গল ও পাঞ্জাব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও প্রদেশ দুটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল।

উল্লিখিত ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অর্জিত বিজয় এবং পাহাড় থেকে সমতলে বসবাসকারী এর নাগরিকদের সৌহার্দ্য, সংহতি ও সমৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নামে এক বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে ব্রত হয়েছিলেন।

বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের আহ্বানকারী অধিনায়ক জিয়াউর রহমান ঘোষিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের অন্তর্নিহিত অর্থ, গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অনেক গভীর। এ জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণায় কোনো মতবিরোধ, ভাষাগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কিংবা ধর্মগত সংঘাতের অবকাশ নেই। নেই কোনো আঞ্চলিক বিরোধ কিংবা বৈষম্য। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ঘোষণা করেন জিয়াউর রহমান। সে লক্ষ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি হাতে নেন।

দেশব্যাপী উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণীত জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন কর্মসূচি আজও তাই মডেল হিসেবে কাজ করছে সর্বত্র। রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুদূরপ্রসারী, যা বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ, এমনকি, দূর-দূরান্তেও ছিল নিবিষ্ট। তিনি মনে করতেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, বাণিজ্য ও বিনিময় না থাকলে কোনো উন্নয়নশীল দেশই সামনে এগোতে পারে না। সে কারণেই তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনের উদ্যোগ নেন।

চীনসহ বিশ্বের কয়েকটি পরাশক্তি রাষ্ট্র জিয়ার সে আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগের প্রশংসা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরাজিত কিছু সমস্যা ও উত্তেজনার কারণে সার্ক শেষ পর্যন্ত আর বেশি দূর এগোয়নি। তবে শহীদ জিয়ার সে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও উন্নয়নমূলক প্রচেষ্টাকে কার্যকর করার লক্ষ্যে জিয়ার প্রতিষ্ঠিত বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি আবার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

কৃষিজাত ফলনের ক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লব সাধন, পর্যাপ্ত পরিমাণ সেচের পানি সংরক্ষণ ও মৎস্য চাষে সাফল্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী খাল খননের যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন, তা কৃষককূল ও জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাফল্য অর্জন করে। দেশব্যাপী তার সে কর্মসূচির ফলে কৃষিজ ফলন ও মৎস্য উৎপাদনের পরিমাণ অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর শহীদ জিয়ার সন্তান ও যোগ্য উত্তরসূরি তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন স্থানে আবার খাল খনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। তাতে গ্রামে-গঞ্জে ব্যাপক সাড়াও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দেশব্যাপী জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত গ্রামসরকার প্রতিষ্ঠার ঘটনা গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার কার্যকর করার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বলে এখনও দেশব্যাপী আলোচিত বিষয়। জাতীয় জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে জিয়াউর রহমান তার স্বল্পকালীন শাসনামলে (২১ এপ্রিল ১৯৭৭ – ৩০ মে ১৯৮১) হাত দেননি এবং ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেননি।

সে সমস্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি কথা এখনো গ্রামে-গঞ্জে চালু রয়েছে যে, ‘যেখানে জিয়া হাত দিয়েছেন সেখানে সোনা ফলেছে।’ শুধু তাই নয়, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে জেনারেল জিয়াউর রহমানই সম্ভবত একমাত্র সামরিক ব্যক্তিত্ব, যিনি সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল -বিএনপি এখনও দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।

১৯৭৫ সালে অনুষ্ঠিত একটি সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন এবং পরে তার প্রতিষ্ঠিত একদলীয় শাসন (বাকশাল) নিষিদ্ধ হয়। এরপর এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমন্ত্রণেই ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে আবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।

শুধু তাই নয়, ১৯৮১ সালের মাঝামাঝি প্রেসিডেন্ট জিয়া শাহাদাত বরণের পর এক পর্যায়ে তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেই, অর্থাৎ ৬ আগস্ট ১৯৯১, রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির শাসন থেকে দেশে সংসদীয় পদ্ধতি চালু করা হয়। শহীদ জিয়া প্রতিষ্ঠিত মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক দল বিএনপির এটিও একটি রাজনৈতিক সাফল্য বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ লিখেছেন, ‘৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সত্যিকার অর্থেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবন ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি টার্নিং পয়েন্ট। সেদিন মধ্যরাতে জিয়াউর রহমানকে কিছু কমান্ডো স্টাইলে বিনা বাধায় মুক্ত করার পর সকালবেলা শত শত সৈনিক তাদের ইউনিটের ট্রাকে চেপে স্লোগান দিতে দিতে শহরের দিকে ছুটতে থাকে। দেখতে দেখতে সিপাহি বিপ্লব মোড় নেয় এক ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লবে। শহরের রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ঢল। তাদের মুখে স্লোগান, ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই।’

লে. কর্নেল হামিদ ঢাকার স্টেশন কমান্ডার থাকাকালে ৭ নভেম্বরের বর্ণিত ঘটনাটি সংঘটিত হয। তখন অধিকাংশ সময় তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের পাশে ছিলেন। মুক্ত হয়ে জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হাতে নেন। দেশের অশান্ত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অনুরোধেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু এরপর থেকে ভবিতব্য তাকে আরও অনেকটা রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিতে সামনে ঠেলে দেয়। সে পথে চলতে গিয়ে জিয়া কখনো দেশবাসীর স্বার্থ বিসর্জন দেননি। তিনি ছিলেন তাদের নির্ভরযোগ্য অকুতোভয় কাণ্ডারি। সে কারণে আজও তিনি অমর হয়ে আছেন তাদের সমগ্র চেতনায়।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা।

আরটিভি/আইএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা 
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিনটি ছিলো ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। সিপাহী-জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে এই তারিখটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসে উজ্জ্বল ও ভাস্মর হয়ে আছে।
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা 
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত একটি দিন। গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা এবং সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে সেদিন দেশপ্রেমিক সিপাহী-জনতা জাতির জীবনে যে পটপরিবর্তন ঘটিয়েছিল- তা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও শৃঙ্খলা সুরক্ষায় এক যুগান্তকারি ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেদিন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সিপাহী-জনতা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল। 
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য
৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন
নতুন এক দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই এই নবীন দেশে চেপে বসে একদলীয় বাকশালি শাসনের অভিশাপ। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে মৃত্যুর মুখে পতিত হয় হাজারো মানুষ। সঙ্গে ছিল রক্ষীবাহিনীর সন্ত্রাস ও নির্মম নির্যাতন।
৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন
সিপাহি-জনতার বিপ্লব: সংবাদপত্রের পাতায় সেই দিনটি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনটিতে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার মিলিত এক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। ওই মহান বিপ্লবে আধিপত্যবাদী শক্তির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল। সুসংহত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। ফলে ৭ নভেম্বরের দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে জাতির ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
সিপাহি-জনতার বিপ্লব: সংবাদপত্রের পাতায় সেই দিনটি
আগুন শুধু নেভানো নয়, প্রতিরোধেই প্রকৃত নিরাপত্তা
প্রতিটি শীতের আগমনী বার্তা কিংবা শুষ্ক মৌসুমের আবহাওয়া মনে এক অদৃশ্য উৎকণ্ঠা তৈরি করে। নগরের আকাশ যখন আকস্মিক ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে কালো হয়ে ওঠে কিংবা রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে সাইরেনের শব্দ বুক কাঁপিয়ে তোলে, তখন সামনে ভেসে ওঠে নির্মম বাস্তবতা– আগুন।  ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক হিসেবে যখন প্রতিদিনের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা দেখি, তখন কেবল ছাই কিংবা ধ্বংসস্তূপই চোখে পড়ে না; পেছনে থাকে প্রিয়জন হারানোর অন্তহীন কান্না, তিলে তিলে গড়া স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার বেদনা এবং দেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি। প্রশ্ন জাগে– আমরা কি শুধু আগুন নেভানোর জন্যই প্রতিনিয়ত প্রস্তুত থাকব? নাকি আমাদের মনোযোগ নিবদ্ধ করা উচিত আগুন যেন কোনোভাবে লাগতে না পারে, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর? আধুনিক নগর পরিকল্পনা আমাদের শেখায়, বিপর্যয় ঘটার পর সামাল দেওয়ার চেয়ে বিপর্যয় রোধ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সন্দেহ নেই, তারা জাতির নীরব বীর। কিন্তু যখন বহুতল ভবন বা ঘনবসতিপূর্ণ মার্কেটে আগুন লাগে, তখন ফায়ার ফাইটারদের শতচেষ্টার পরও বহু মূল্যবান প্রাণ ও সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।  আমাদের সমাজে ‘অগ্নিনিরাপত্তা’ মানেই যেন ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, পাইপ, পানি আর হুটার বাজিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা কেবল জরুরি সেবা বিভাগ বা কিছু সরঞ্জামের নাম নয়; একটি সমন্বিত সংস্কৃতি। উন্নত বিশ্ব যেমন জাপান, সিঙ্গাপুর বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা কৌশলের মূল ভিত্তি হলো প্রতিরোধমূলক সংস্কৃতি। সেখানে ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা যতটা না আগুন নেভানোর, তার চেয়ে ঢের বেশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করা; ভবনের নকশা পরীক্ষা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে দুর্ঘটনা এড়ানো। আমাদের দেশেও সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। ফায়ার সার্ভিসকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল সংস্থা হিসেবে না দেখে প্রতিরোধমূলক কর্তৃপক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের অনুধাবন করতে হবে– অগ্নিকাণ্ড রোধের প্রথম এবং প্রধান প্রহরী ফায়ার ফাইটার নন, বরং ভবনটির মালিক, নকশাকার, ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা নিজে। আমাদের নগরগুলোর কাঠামোগত বিন্যাসে কিছু ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পুরান ঢাকার কথা ধরা যাক; সেখানে শতবর্ষী ভবনগুলোর গায়ে গায়ে লাগানো দোকানপাট, বৈদ্যুতিক তারের জটলা এবং গুদামঘরের আধিক্য যে কোনো মুহূর্তে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প এবং অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোতে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে। আমাদের বহুতল ভবনগুলোতে ত্রুটিপূর্ণ ও পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইন, অতিরিক্ত লোড বহনকারী তার এবং সাব-স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব প্রায়ই আগুনের উৎস তৈরি করে। পাশাপাশি রয়েছে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজি সিলিন্ডারের যত্রতত্র ব্যবহার এবং এর সঠিক সিলিন্ডারিং ও রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে অজ্ঞতা। এই কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে জয় করতে হলে কোনো একক সংস্থার প্রচেষ্টা নয়, প্রয়োজন মানুষের সম্মিলিত ও সুশৃঙ্খল অংশগ্রহণ। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে মডেলগুলো অনুসরণ করে, তার মূল স্তম্ভগুলো আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রতিটি ভবন নির্মাণের আগে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অগ্নিপ্রতিরোধী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, ইমারতের ভেতরে ধোঁয়া নির্গমনের পথ, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্গমন সিঁড়ি এবং ফায়ার ডোর স্থাপন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অপরিহার্য অংশ। আমাদের দেশে নকশা পাসের সময় এ বিষয়গুলো কাগজ-কলমে থাকলেও বাস্তবায়নে অবহেলা দেখা যায়। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।  সক্রিয় ব্যবস্থা বলতে বোঝায় স্মোক ডিটেক্টর, স্প্রিংকলার সিস্টেম, ফায়ার অ্যালার্ম এবং হাইড্র্যান্ট পয়েন্ট। আর নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থা হলো ভবনের অবকাঠামোগত নকশা, যা আগুন ও ধোঁয়া ছড়াতে বাধা দেয়। আন্তর্জাতিক মানে প্রতিটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনে এ দুটি ব্যবস্থার উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। ফায়ার সার্ভিস এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দিতে সর্বদা প্রস্তুত। প্রয়োজন শুধু মালিকপক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা।  আগুন লাগলে তাৎক্ষণিক কী করতে হবে– সে বিষয়ে তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ বেশি কার্যকরী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শপিংমল এবং করপোরেট অফিসগুলোতে প্রতিবছর দুই থেকে তিনবার ফায়ার ড্রিল বা মহড়া পরিচালনা করা উচিত। কর্মীদের মধ্যে কার কী দায়িত্ব– কে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহার করবেন; কে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবেন এবং কে নিরাপদে লোকজনকে বের করে আনবেন; তা সুনির্দিষ্ট থাকা আবশ্যক। ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আইনের কড়াকড়ি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার চেয়ে সচেতনতা অনেক বেশি টেকসই ফল দেয়। যখন গৃহিণী রান্না শেষে গ্যাসের চুলা এবং রেগুলেটর সঠিকভাবে বন্ধ করার অভ্যাস গড়ে তোলেন; যখন দোকানদার তাঁর দোকানের বৈদ্যুতিক লাইন নিয়মিত পরীক্ষা করান; যখন বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ফায়ার এক্সটিংগুইশারের মেয়াদ পরীক্ষা করেন– তখন বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে না।  সমাজে অগ্নিদুর্ঘটনার পর আমরা কয়েক দিন তোলপাড় করি; তদন্ত কমিটি গঠিত হয়; কিছু সুপারিশমালা তৈরি হয়। কিছুদিন পর সবকিছু সেই আগের মতো। এই প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে একটি প্রস্তুতিমূলক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।  সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে প্রাথমিক অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সাবধানতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সামাজিক মাধ্যমে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন, প্রামাণ্যচিত্র ও প্যানেল আলোচনা প্রচার করা যেতে পারে। পাড়া-মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবক কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করবে। শিল্পকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন, যাতে তারা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিগুলো নিজেরাই চিহ্নিত করতে পারেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আরও গতিশীল করতে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ইন্টারনেট অব থিংসভিত্তিক স্মোক ডিটেক্টর, ড্রোন সার্ভিলেন্স এবং দ্রুততম সময়ে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য স্মার্ট কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। অনেক উন্নত দেশে ধোঁয়া শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফায়ার সার্ভিসে সংকেত চলে যায়। আমাদের দেশকেও এই প্রযুক্তির দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিতে হবে। প্রতিটি শপিংমল, বহুতল আবাসিক ভবন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একটি নিরাপত্তা ও ফায়ার সেফটি কমিটি থাকতে হবে। এই কমিটির কাজ হবে প্রতি মাসে অন্তত একবার ভবনের বৈদ্যুতিক তার, গ্যাস সংযোগ এবং অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা।  সুন্দর, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। দেশের নাগরিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও বাসস্থানে বসবাস করবে– এটিই সবার কাম্য। আমরা এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলি, যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ডাকার প্রয়োজনই যেন না পড়ে। আগুনকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যদি আমরা সচেতন ও সতর্ক আচরণ করি। দুর্ঘটনা বলে-কয়ে আসে না। কিন্তু সচেতনতা বহু অমূল্য প্রাণ ও স্বপ্নকে রক্ষা করতে পারে।  লেখক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর আরটিভি/এসআর  
আগুন শুধু নেভানো নয়, প্রতিরোধেই প্রকৃত নিরাপত্তা
আরও পড়ুন
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বায়তুল মোকাররমে দোয়া মাহফিল
‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের মানুষকে স্বাধীনতার প্রকৃত সুখ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন’
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী
সিপাহী-জনতার বিপ্লব-সংহতির মূলধারা