
ইরান যুদ্ধ এখন ছয় মাসে প্রবেশ করেছে। অর্থনীতির ওপর চাপ পড়লেও আরও কত দিন চলবে এবং কবে শেষ হবে, তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এ বিষয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকেও কিছু জানা যায়নি।
যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টা এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। তাই তেহরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মূল্যও বাড়িয়ে দিতে চাইছে যেন শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন কিছু দাবি দাওয়া মেনে নিতে বাধ্য হয়।
তবে সবকিছু ছাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ইরান আর কতদিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে?
সামরিক শক্তি দিয়ে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম?
ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্প ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বেশ কয়েকটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময় নিশানা করা হয়েছে। তবে তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে কোনো নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া যায়নি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চ্যাথাম হাউজ’ তাদের সর্বশেষ পর্যালোচনায় জানিয়েছে, ইরানের কাছে বর্তমানে কী পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ করা আছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্রা বা ঢেউ ছোট হয়ে এসেছে। তবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা যে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যার উপর নির্ভর করে তা নয়। ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ এবং কাজটা দ্রুততর করা সম্ভব।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধে নিহত কমান্ডারদের পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে এবং সামরিক কমান্ড কাঠামো এখন পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ গায়েদি বলেন, ইরান সম্ভবত দীর্ঘ সময় ধরে উৎক্ষেপণ কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা বজায় রাখতে পারবে, যদিও তার মাত্রা কমতে পারে। তারা কিন্তু এখনো হরমুজ প্রণালিতেও বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম।
অধ্যাপক গায়েদি আরও বলেন, তেলের দামের উপর যুদ্ধের প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তেহরানে এমন আশার সঞ্চার হয়েছে যে, তারা ওয়াশিংটনকে নিজেদের কিছু শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে।
তেহরানের লক্ষ্য হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটা যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া। যা একটা চাপ তৈরির পন্থা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এই মুহূর্তে এমন ইঙ্গিত নেই যে শুধু সামরিক সীমাবদ্ধতার কারণেই ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
কতদিন টিকবে ইরানের অর্থনীতি?
যুদ্ধ শুরুর আগেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, তাদের নিজস্ব মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর মূল্য কমে যাওয়া এবং ব্যাপক কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার মতো একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল ইরানের অর্থনীতি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ২.৭ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে এবং এই অর্থবছরের শেষ কয়েক সপ্তাহেই শুধু যুদ্ধের প্রভাব পড়েছিল।
এই যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুনভাবে আরও নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য বলছে সে দেশে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইরানের শ্রম উপমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্মসংস্থানের দিক থেকে ১০ লাখেরও বেশি পদের উপর যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। শুধু তাই নয়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পূর্বাভাস দিয়েছে যে, ২০২৬ সালে ইরানের অর্থনীতি প্রায় ৫.৪ শতাংশ সংকুচিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি ৬৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
তেহরানে যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে মতভেদ
এই পরিস্থিতিতে সামনে এগোনোর জন্য কোন পন্থা সবচেয়ে উপযোগী সে বিষয়ে তেহরানের অভ্যন্তরে মতভেদ রয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় দরকষাকষির দায়িত্বে থাকা দলের প্রধান মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এর আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, ইরান যেন কোনোভাবেই ‘দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয় সৃষ্টিকারী সংঘাতের’ ফাঁদে না পড়ে। যারা এই আলাপ-আলোচনার বিরুদ্ধে তাদেরও সমালোচনা করেছেন তিনি।
তবে এই মতপার্থক্যকে শুধু ‘যুদ্ধের সমর্থক’ ও ‘শান্তির সমর্থক’- এই দুই শিবিরে ভাগ করা যায় না। এদিকে মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এও জানিয়েছেন যে, ইরানের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয় এমন কোনো চুক্তি তিনি মেনে নেবেন না।
ইরানের জনসাধারণ কী ভাবছে?
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইরানের নাগরিক মতামত নিয়ে কোনো নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ নেই। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সামগ্রিক দিক থেকে সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না।
তবে একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ‘জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স’-এর ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি জানিয়েছেন, এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রর জন্য তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিই শেষ পর্যন্ত ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক ফ্রন্ট’ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধ থেকে বেরোনোর কৌশল
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে ইরানের আঞ্চলিক পর্যায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেহরান উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে- বিশেষত সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা চালিয়েছে। এই সব দেশে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো ও নৌ-চলাচলের পথে অব্যাহত হামলার ঘটনা সেই প্রচেষ্টাকে নষ্ট করে দিতে পারে।
ইরানের কাছে যুদ্ধের একটা গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি ঘটাতে পারে এমন এক চুক্তি কেমন হবে এবং সেই চুক্তিতে কীভাবেই বা পৌঁছানো সম্ভব তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে তেহরান প্রমাণ করেছে তারা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বড় ধরনের মাশুল গুনতে বাধ্য করতে সক্ষম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তারা কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় টিকে থাকবে, সেটা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আরটিভি/এমএম



