
শুধু ডিগ্রিই থাকলেই চলবে না যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে চাকরির জন্য প্রয়োজন একাধিক দক্ষতার। তাই নির্দিষ্ট কিছু কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করে নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। তবে কোনো একটি দক্ষতা শিখলেই ছয় মাসের মধ্যে নির্দিষ্ট বেতন বা চাকরি নিশ্চিত হবে, এমনটা নিশ্চিত নয়। বেতন, প্রশিক্ষণের সময়, লাইসেন্স এবং চাকরির চাহিদা অঙ্গরাজ্য, শহর, নিয়োগদাতা ও ব্যক্তির অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
নতুনদের জন্য তাই এমন দক্ষতা বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলোর বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার রয়েছে এবং প্রশিক্ষণ বা সনদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে উন্নত করা যায়।
১. ফর্কলিফট পরিচালনা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা
ওয়্যারহাউস ও পণ্য বিতরণকেন্দ্রে ফর্কলিফট পরিচালনার দক্ষতার চাহিদা রয়েছে। পণ্য ওঠানো, নামানো ও সরানোর পাশাপাশি নিরাপদভাবে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু অনলাইনে ভিডিও দেখে ফর্কলিফট চালানো শেখা যথেষ্ট নয়। নিয়োগদাতার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা যাচাই লাগতে পারে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা বিধি অনুযায়ী ফর্কলিফট অপারেটরদের নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
২. বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রস্তুতি
বাণিজ্যিক ড্রাইভিং লাইসেন্স বা সিডিএল অর্জন করতে পারলে ট্রাক ড্রাইভিংসহ পরিবহন খাতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু সিডিএল পারমিট পেলেই সব ধরনের ট্রাক চালানো যায় না। পূর্ণ সিডিএল পেতে লিখিত পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং প্রযোজ্য দক্ষতা পরীক্ষার ধাপ রয়েছে।
যারা দীর্ঘমেয়াদে ড্রাইভিং পেশায় যেতে চান, তাদের জন্য সিডিএল প্রস্তুতি একটি বাস্তব ক্যারিয়ার দক্ষতা হতে পারে। কোন ধরনের সিডিএল বা অতিরিক্ত অনুমোদন প্রয়োজন হবে, তা কাঙ্ক্ষিত কাজের ওপর নির্ভর করে।
৩. তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা
কম্পিউটার ও প্রযুক্তিতে আগ্রহ থাকলে তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা বা আইটি সাপোর্ট একটি সম্ভাব্য ক্যারিয়ার পথ। কম্পিউটারের সমস্যা সমাধান, সফটওয়্যার ইনস্টলেশন, ব্যবহারকারীকে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নেটওয়ার্কের মৌলিক বিষয় শেখা এই দক্ষতার অংশ।
তবে আইটি সাপোর্ট শিখলেই সরাসরি উচ্চ বেতনের চাকরি নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কম্পিউটার ব্যবহারকারী সহায়তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যম বার্ষিক বেতন ছিল ৬০ হাজার ৩৪০ ডলার। কিছু ক্ষেত্রে কলেজ পর্যায়ের পড়াশোনার পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক তথ্যপ্রযুক্তি সনদ থাকলেও চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
৪. স্বাস্থ্যসেবা সহকারী হিসেবে প্রশিক্ষণ
স্বাস্থ্যসেবা খাতে কাজ করতে চাইলে নার্সিং সহকারী বা অন্যান্য সহায়ক পেশার প্রশিক্ষণ বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এই ধরনের চাকরিতে অঙ্গরাজ্যভেদে অনুমোদিত প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা বা অন্যান্য যোগ্যতা প্রয়োজন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা খাতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা সহায়ক পেশাগুলোর ক্ষেত্রেও চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৫. ওয়েল্ডিং
কারিগরি পেশায় যেতে চাইলে ওয়েল্ডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। বিশেষ করে মিগ ওয়েল্ডিংসহ বিভিন্ন ধরনের ওয়েল্ডিং শেখার মাধ্যমে উৎপাদন, নির্মাণ ও অন্যান্য শিল্প খাতে কাজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
তবে ওয়েল্ডিং শিখলেই নির্দিষ্ট ঘণ্টাপ্রতি বেতন নিশ্চিত নয়। বেতন নির্ভর করে অভিজ্ঞতা, সনদ, শ্রমিক ইউনিয়ন, নিয়োগদাতা এবং এলাকার ওপর। ট্রেড স্কুল, কমিউনিটি কলেজ বা অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেওয়া বেশি কার্যকর।
৬. রিয়েল এস্টেট
রিয়েল এস্টেট পেশায় যেতে চাইলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের লাইসেন্সের নিয়ম জানতে হবে। প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কোর্স, পরীক্ষা এবং লাইসেন্সের নিয়ম এক নয়।
এই পেশায় সাধারণ চাকরির মতো নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নাও থাকতে পারে। আয় অনেক ক্ষেত্রে কমিশনভিত্তিক হয়। একটি বাড়ি বিক্রি করলেই নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। তাই লাইসেন্স নেওয়ার পাশাপাশি বিপণন, গ্রাহকসেবা এবং স্থানীয় আবাসন বাজার সম্পর্কে জ্ঞান প্রয়োজন।
৭. হিসাবরক্ষণ ও কুইকবুকস
ছোট ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব পরিচালনার জন্য হিসাবরক্ষণ বা বুককিপিং দক্ষতা কাজে লাগতে পারে। আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, চালান, পেমেন্ট এবং আর্থিক রেকর্ড ব্যবস্থাপনার মতো কাজ এই দক্ষতার মধ্যে পড়ে।
কুইকবুকসের মতো হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার শেখা বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। তবে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সফটওয়্যার ব্যবহারের পাশাপাশি হিসাববিজ্ঞানের মৌলিক জ্ঞান এবং নির্ভুলভাবে হিসাব পরিচালনার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
৮. এইচভিএসি
হিটিং, ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং বা এইচভিএসি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ক্ষেত্র। ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক ভবনের হিটিং ও কুলিং ব্যবস্থা স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতের কাজে এই দক্ষতা ব্যবহার হয়।
এইচভিএসি পেশায় যেতে হলে শুধু কয়েকটি অনলাইন ভিডিও দেখার চেয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষানবিশ কর্মসূচি বেশি কার্যকর। কিছু কাজে অতিরিক্ত লাইসেন্স বা সনদেরও প্রয়োজন হতে পারে।
৯. বাণিজ্যিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ
সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ভবনের মেঝে পরিচর্যা, কার্পেট পরিষ্কার এবং বিভিন্ন যন্ত্র পরিচালনার মতো বিশেষ দক্ষতা অর্জন করলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই কাজে ব্যবহৃত মেশিন ও রাসায়নিক নিরাপদভাবে পরিচালনা শেখা গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও বাস্তব প্রশিক্ষণ ছাড়া পেশাদারভাবে কাজ শুরু করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নিজের ব্যবসা শুরু করতে চাইলে স্থানীয় ব্যবসায়িক লাইসেন্স, বীমা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নিয়মও যাচাই করতে হবে।
১০. ডিজিটাল বিপণন ও ভিডিও সম্পাদনা
ছোট ব্যবসার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট, ভিডিও, গ্রাফিক ডিজাইন ও ডিজিটাল বিপণনের কাজের সুযোগ রয়েছে। ক্যানভা, ক্যাপকাট বা অন্যান্য সফটওয়্যার দিয়ে প্রাথমিক কাজ শেখা তুলনামূলক সহজ হলেও পেশাদার পর্যায়ে যেতে হলে কনটেন্ট কৌশল, বিজ্ঞাপন, তথ্য বিশ্লেষণ এবং গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগের মতো দক্ষতাও প্রয়োজন।
অনলাইনে বিনামূল্যে বা কম খরচের কোর্স দিয়ে শুরু করা যায়। পরে নিজের কাজের নমুনা বা পোর্টফোলিও তৈরি করে স্থানীয় ব্যবসা কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রাহক খোঁজা যেতে পারে।
কীভাবে শুরু করবেন?
একসঙ্গে ১০টি দক্ষতা শেখার চেষ্টা না করে নিজের বর্তমান অভিজ্ঞতা, সময়, অর্থ এবং আগ্রহ অনুযায়ী একটি ক্ষেত্র বেছে নেওয়া ভালো। প্রতিদিন নিয়মিত সময় দেওয়ার পাশাপাশি বাস্তব অনুশীলন ও ছোট প্রকল্প তৈরি করলে দক্ষতা দ্রুত বাড়তে পারে।
যারা শারীরিক ও কারিগরি কাজে আগ্রহী, তারা এইচভিএসি, ওয়েল্ডিং বা ফর্কলিফট পরিচালনা বিবেচনা করতে পারেন। ড্রাইভিংয়ে আগ্রহ থাকলে সিডিএল একটি দীর্ঘমেয়াদি পথ হতে পারে। কম্পিউটারে কাজ করতে চাইলে আইটি সাপোর্ট, বুককিপিং বা ডিজিটাল বিপণন শেখা যেতে পারে। আর স্বাস্থ্যসেবায় ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অঙ্গরাজ্যের নিয়ম যাচাই করে নার্সিং সহকারীর মতো পেশা বিবেচনা করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের চাকরির বাজারে দক্ষতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো একটি অনলাইন কোর্স শেষ করলেই নির্দিষ্ট বেতন বা চাকরি নিশ্চিত হয় না। শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত বাড়তে থাকা পেশাগুলোর মধ্যে বায়ু টারবাইন সার্ভিস টেকনিশিয়ান, সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনকারী, নার্স প্র্যাকটিশনার, তথ্যবিজ্ঞানী এবং তথ্যনিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতো পেশা রয়েছে। এসব পেশার অনেকগুলোর জন্য অতিরিক্ত শিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
তাই নতুন দক্ষতা শেখার সময় শুধু দ্রুত বেশি বেতনের আশ্বাসের দিকে না তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট পেশার যোগ্যতা, লাইসেন্স, প্রশিক্ষণের খরচ, স্থানীয় চাকরির চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও বিবেচনা করা জরুরি। সঠিক দক্ষতা ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে পারলে বর্তমান চাকরি থেকে আরও ভালো ক্যারিয়ারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আরটিভি/ এসকেডি



