যুদ্ধ শেষ করতে ৩ স্তরের নতুন প্রস্তাব ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬ , ০২:৪৫ পিএম


যুদ্ধ শেষ করতে ৩ স্তরের নতুন প্রস্তাব ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের টানা ৩৮ দিনের সংঘাত শেষে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে গত ২৩ এপ্রিল। এরপর এখন পর্যন্ত নতুন করে যুদ্ধ শুরু না হলেও বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা। হরমুজ প্রণালি বন্ধের জেরে বিশ্ব বাণিজ্যে এখনও অব্যাহত তীব্র অস্থিরতা। মাঝে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এক দফা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তি আলোচনায় বসলেও ভেস্তে গেছে তা।

তবে, নতুন করে আবার যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামনে এবার ৩ স্তরের একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন যদি তেহরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপে বসতে চায়— সেক্ষেত্রে নতুন প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনা হতে পারে।

পাকিস্তানের মাধ্যমে এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। খবর এএফপির।

ইরানের নতুন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং পরবর্তীতে ইরান এবং লেবাননে আর আগ্রাসী হামলা হবে না— এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি এই প্রথম স্তরের দাবি মেনে নেয়, তাহলে দ্বিতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি পরিচালনা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আলোচনা চলবে।

এরপর যদি প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের সঙ্গে এই যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ মীমাংসায় পৌঁছায়, তখন ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।

আরও পড়ুন

ইরানের নতুন এই তিন স্তরের প্রস্তাব নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া জানতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হোয়াইট হাউসে যোগাযোগ করেছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। 

হোয়াইট হউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়ালেস অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, এসব খুবই সংবেদনশীর কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় এবং সংবাদমাধ্যমে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে না যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের প্রেসিডেন্ট যেমনটা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনও কার্ড আছে এবং আমরা কেবল এমন একটি চুক্তিতেই রাজি হবো— যা মার্কিন জনগণকে অগ্রাধিকার দেবে এবং ইরানকে কখনও পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবে না।

প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।

পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। ৩৮ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারায় ইরান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও ধ্বংস হয় দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সেইসঙ্গে প্রাণ হারায় ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ।

এই ৩৮ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শক্ত জবাব দেয় ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় দেশটি। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে করুণভাবে ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। এ অবস্থায় আবার ইরানের পক্ষে যোগ দেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনী; যা ইরানের শক্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় যুদ্ধে। এছাড়া, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইরানের হামলায় ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে যায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ধস নামে মার্কিন তেল বাণিজ্যেও।

এ অবস্থায় ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর জন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দ্বারস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র। গত ৭ এপ্রিল কার্যকর হয় ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি। কিন্তু, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও বিশ্বাসঘাতকতার কলঙ্ক এবারও মুছতে ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র। তেহরান-ওয়াশিংটনের সমঝোতা হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই লেবাননে নারকীয় এক হত্যাযজ্ঞ চালায় ইসরায়েল। মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে ৫০টি বিমান নিয়ে একশোরও বেশি গোলাবর্ষণ করে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। অল্প সময়ের এই হামলায় প্রাণ হারান তিনশো জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে এই হামলার দায় এড়াতে চাইলেও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করে বসেন, লেবাননে চালানো ভয়াবহ ওই হামলা তারা করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বোঝাপড়া করেই। 

ট্রাম্পের এমন বিশ্বাসঘাতকতার পরও একটি স্থায়ী সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য গত ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বৈঠকে বসেন মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা। কিন্তু ২১ ঘণ্টা ধরে আলোচনার পরও ব্যর্থ হয় সেই বৈঠক এবং কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না করেই ফিরে যান প্রতিনিধিরা।

প্রথম দফা সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে দ্বিতীয় দফা সংলাপে আসার আমন্ত্রণ জানায় পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি গত কয়েক দিনে একাধিকবার পাকিস্তান সফরে গেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয়বার সরাসরি সংলাপে বসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

ইরানের এই প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, তিনিও তার প্রতিনিধি দলকে ফের ‘১৮ ঘণ্টার ফ্লাইটে’ পাঠাতে আগ্রহী নন এবং এখন থেকে ফোনকলে যাবতীয় আলাপ-আলোচনা হবে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরেই নতুন প্রস্তাবটি দিয়েছে ইরান। সবশেষ গতকাল রোববার এক সংক্ষিপ্ত সফরে পাকিস্তান গিয়েছিলেন আরাগচি, তার আগে তিনি গিয়েছিলেন হরমুজ প্রণালির অপর তীরের দেশ ওমানে। পাকিস্তানে সংক্ষিপ্ত সফর শেষ করে রাশিয়ায় গিয়েছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission