
পাথরের ওপর নড়াচড়া করছে একটি মাকড়সা। শিকারি পাখি সেটিকে ধরতে ছুটে আসতেই মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যায় উল্টো ঘটনা মাকড়সাটি গিলে ফেলে পাখিটিকেই। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি কোনো মাকড়সা নয়, বরং একটি বিরল প্রজাতির ভাইপার সাপের লেজের ডগা।
পশ্চিম ইরানের জাগ্রোস পর্বতমালার দুর্গম ও শুষ্ক এলাকায় দেখা মেলে ‘স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপার’-এর। মাথায় শিংয়ের মতো গঠন থাকা এই সাপের লেজের ডগায় রয়েছে মাকড়সার মতো দেখতে একটি বিশেষ অঙ্গ। সেটিকে নড়াচড়া করিয়ে পাখিকে শিকারের কাছে টেনে আনে সাপটি।
বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, মাকড়সার মতো দেখতে এই অঙ্গটির ভেতরে কোনো অতিরিক্ত হাড় নেই। এক্স-রে কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে সাপটির লেজের অভ্যন্তরীণ গঠন বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছেন গবেষকরা।
১৯৬৮ সালে ইরান থেকে প্রথমবার এই প্রজাতির একটি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তখন এর অস্বাভাবিক লেজকে অনেকটা শারীরিক ত্রুটি বা অপ্রত্যাশিত কোনো বৃদ্ধির মতোই মনে করা হয়েছিল। ২০০৩ সালে একই ধরনের আরেকটি সাপ সংগ্রহের পর বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এটি আসলে প্রজাতিটির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
২০০৬ সালে ওই নমুনার ভিত্তিতে সাপটিকে নতুন প্রজাতি হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণনা করা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয় Pseudocerastes urarachnoides। প্রথম সংগৃহীত নমুনাটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামে ‘হোলোটাইপ’ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই হোলোটাইপের লেজের ভেতরের গঠন দেখতে এক্স-রে সিটি স্ক্যান ব্যবহার করেন। এতে দেখা যায়, লেজের কশেরুকাগুলো স্বাভাবিক এবং অন্যান্য ভাইপার সাপের মতোই। তবে লেজের ডগায় মাকড়সার মতো যে মাংসল অংশটি দেখা যায়, সেটি মূলত দীর্ঘ ও পরিবর্তিত আঁশ দিয়ে গঠিত; এর ভেতরে কোনো হাড় নেই।
গবেষক গেওরগিওস গেওরগালিস বলেন, সাপটির লেজের অভ্যন্তরীণ গঠন নিয়ে তাদের প্রত্যাশা ছিল ভিন্ন। কিছু সাপের লেজের কশেরুকা অত্যন্ত অদ্ভুত গঠনের হলেও স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপারের ক্ষেত্রে কশেরুকাগুলো বেশ স্বাভাবিক বলেই দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, লেজের কশেরুকাগুলো অত্যন্ত সরু হওয়ায় এটি বেশ নমনীয়। ফলে সাপটি লেজের ডগা দ্রুত ও সূক্ষ্মভাবে এঁকেবেঁকে নাড়াতে পারে। এই নড়াচড়াই মাকড়সার চলাফেরার মতো বিভ্রম তৈরি করে এবং পাখিকে শিকারের ফাঁদে ফেলতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো এই মাকড়সার মতো অঙ্গটি যদি শুধু জীবাশ্ম হিসেবে পাওয়া যেত, তাহলে এর প্রকৃত বাহ্যিক রূপ কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব হতো। কারণ অঙ্গটির মূল বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে নরম টিস্যু ও পরিবর্তিত আঁশের মাধ্যমে, যা জীবাশ্মে সাধারণত সংরক্ষিত থাকে না।
গবেষক সারা রুয়ানের মতে, এই সাপ দেখিয়ে দেয় কীভাবে প্রাণীর আচরণ ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য দীর্ঘ বিবর্তন প্রক্রিয়ায় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অনেক সাপই শিকার আকর্ষণ বা বিভ্রান্ত করতে লেজ নাড়ায়। স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপার সেই আচরণকে আরও চরম ও বিশেষায়িত রূপে নিয়ে গেছে।
তবে এই অদ্ভুত লেজ ঠিক কীভাবে বিবর্তিত হলো, কিংবা এর পেছনে কোন জেনেটিক পরিবর্তন কাজ করেছে এখনো তা পুরোপুরি জানা যায়নি। ভবিষ্যতের গবেষণায় সেই রহস্যের উত্তর মিলতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষকদের মতে, স্পাইডার-টেইল্ড হর্নড ভাইপার প্রাকৃতিক নির্বাচনের এক অসাধারণ উদাহরণ। পূর্বপুরুষদের কোনো সাধারণ আচরণকে বিবর্তনের মাধ্যমে এমন এক শারীরিক বৈশিষ্ট্যে রূপ দেওয়া হয়েছে, যা দেখতে প্রায় জীবন্ত মাকড়সার মতো এবং শিকার ধরার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর।
আরটিভি/এসকে


