
খেলতে গিয়ে শুকিয়ে যাওয়া গভীর কূপে পড়ে যায় পাঁচ বছরের জাইনুল্লাহ। প্রায় ৭০ মিটার নিচে আটকে থাকা শিশুটিকে উদ্ধারে শেষ পর্যন্ত দড়ি বেয়ে কূপে নামতে হয় ১১ বছরের কিশোর হযরত ওমরকে। ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানে কিশোরটি সফলভাবে শিশুটিকে বাঁচিয়ে ওপরে তুলে আনে।
এমনটাই জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
কান্দাহারের মাইওয়ান্দ এলাকায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলছিল জাইনুল্লাহ। হঠাৎ প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার প্রশস্ত একটি পরিত্যক্ত কূপে পড়ে যায় সে। কূপটি দুই বছর আগে শুকিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকেরা এর মুখ কাঠ ও মাটি দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। সময়ের সঙ্গে কাঠ পচে যায় এবং মাটি আলগা হয়ে যাওয়ায় শিশুটি সেখানে পড়ে যায়।
উদ্ধারকারীরা নিচে ক্যামেরা নামিয়ে দেখতে পান, কূপের প্রায় ৭০ মিটার নিচে ঠান্ডা ও ভেজা জায়গায় বসে আছে জাইনুল্লাহ। তার পায়ে পানি ছুঁয়ে ছিল এবং মাথার ওপর পানি পড়ছিল। কিন্তু কূপটি এতটাই সরু ছিল যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিচে নামতে পারছিলেন না।
শিশুটিকে উদ্ধারে কয়েকজন কিশোরকে নিচে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় তারা ফিরে আসে। এরপর ১১ বছরের হযরত ওমরকে উদ্ধারের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর আগেও সে এমন একটি উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছিল।
প্রথমবার দড়ি বেঁধে নিচে নামার সময় হাজরতের কাঁধ ও উরু আটকে যায়। ব্যথা পাওয়ায় সে চিৎকার করলে তাকে ওপরে তুলে আনা হয়। পরে আবার চেষ্টা করে সে কূপের নিচে পৌঁছায়।
সেখানে গিয়ে হযরত জাইনুল্লাহর হাতের সঙ্গে আরেকটি দড়ি বাঁধতে সক্ষম হয়। এরপর ওপর থেকে ধীরে ধীরে দড়ি টেনে দুজনকেই ওপরে তোলা হয়। প্রথমে হাজরতকে এবং কয়েক মিনিট পর জাইনুল্লাহকে নিরাপদে বের করে আনা হয়। মাটিতে ওঠার পর কাদায় ঢাকা হযরতকে স্থানীয়রা ‘সাহসী’ বলে অভিনন্দন জানান।
জাইনুল্লাহকে হাসপাতালে নেওয়া হলে পরদিন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার বাবা বলেন, হাজরত যেন তার ছেলেকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে।
আফগানিস্তানে এমন ঘটনা নতুন নয়। পানির সংকট, দীর্ঘস্থায়ী খরা ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর কৃষকদের নির্ভরতা বাড়ায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক গভীর কূপ খনন করা হয়েছে। এসব কূপের অনেকগুলো পরে শুকিয়ে গেলে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
২০২১ সাল থেকে আফগানিস্তানে পরিত্যক্ত কূপে পড়ে যাওয়ার শতাধিক ঘটনা বিবিসি নিশ্চিত করেছে। এসব ঘটনার বেশির ভাগই ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে। প্রায় অর্ধেক ঘটনায় শিশুরা মারা গেছে।
পানি বিশেষজ্ঞ নাজিবুল্লাহ সাদিদ জানান, ২০২০ সালের পর দেশটিতে কূপের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। উপগ্রহচিত্র অনুযায়ী বর্তমানে এমন কূপের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ হতে পারে। এসব কূপের বেশির ভাগই হেলমান্দ নদী অববাহিকায় অবস্থিত।
কূপে পড়ে যাওয়া মানুষকে উদ্ধারের জন্য আফগানিস্তানে প্রশিক্ষিত লোকের সংখ্যাও খুব কম। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে মাত্র কয়েকজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি এ ধরনের উদ্ধারকাজে যুক্ত রয়েছেন।
হেলমান্দের ২৮ বছর বয়সী মোবাইল ফোন বিক্রেতা মিরাজান আবদুল্লাহ নিজ উদ্যোগে এমন উদ্ধারকাজ শুরু করেন। ২০২১ সালে পাঁচ বছরের এক শিশু কূপে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা তাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করে। পরে তিনি এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেন, যার মাধ্যমে কূপের ভেতরের মানুষের অবস্থান ক্যামেরায় দেখা যায় এবং নির্দিষ্ট জায়গায় দড়ি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
নিজের পাঁচ বছরের ছেলেকে ২৫ মিটার গভীর কূপে নামিয়ে তিনি যন্ত্রটির পরীক্ষাও করেন। গত চার বছরে মিরাজান ১১৩টি উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়ে প্রায় ৭০ জনকে বাঁচিয়েছেন।
তবে কূপের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে। খরার কারণে কোথাও কোথাও ২০০ মিটার পর্যন্ত গভীর কূপ খনন করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ভবিষ্যতে কিছু এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে মানুষকে অন্যত্র চলে যেতে হতে পারে।
আফগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কূপে পড়ে যাওয়া মানুষ উদ্ধারে বিশেষ সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া পানীয় জল ছাড়া অন্য কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে দেশটির পানি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। কূপের মুখ যথাযথভাবে ঢেকে রাখার জন্য মালিকদের সতর্কও করা হয়েছে।
জাইনুল্লাহকে উদ্ধারের আট মাস পর আবার দেখা হয় দুই কিশোরের। জাইনুল্লাহর পরিবার তখন হযরতকে ধন্যবাদ জানায় এবং উপহার দেয়। স্থানীয়দের কাছে হযরত এখন একজন সাহসী কিশোর হিসেবে পরিচিত।
হযরত বলেন, গ্রামের শিশুরা তাকে দেখলেই তার সাহসিকতার কথা বলে। আর জাইনুল্লাহর পরিবার চায়, ভবিষ্যতে আর কোনো শিশুকে যেন এমন বিপজ্জনক পরিত্যক্ত কূপের মুখোমুখি হতে না হয়।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/জেএমএ


