
পুষ্টির সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে ডিমের গুরুত্ব তুলে ধরে আজ (৮ অক্টোবর) বিশ্ব ডিম দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির ৩০তম বার্ষিকী।
বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২ হাজার ৪৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে ৬ কোটির বেশি ডিম।
এতে দেশে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৭টি। ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ২০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা এবং বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশজুড়ে শোভাযাত্রা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও পুষ্টিবিষয়ক কর্মসূচি থাকবে। পাশাপাশি এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বিনামূল্যে ডিম বিতরণ করা হবে।
৩০ বছরে বিশ্ব ডিম দিবস
১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন (আইইসি) বিশ্ব ডিম দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। সেই হিসেবে ২০২৬ সালে দিবসটির ৩০ বছর পূর্ণ হচ্ছে।
এবারের ৩০তম বার্ষিকীতে ‘এগউইন’ নামে একটি মাসকটও চালু করা হয়েছে। সব বয়সী মানুষের মধ্যে ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এর উদ্দেশ্য।
বিশ্ব ডিম দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যে ডিমের উচ্চমানের সম্পূর্ণ প্রোটিনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পেশি গঠন, মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং সুস্থ বার্ধক্যে এই প্রোটিনের ভূমিকা তুলে ধরা হচ্ছে।
কম দামে পুষ্টির বড় উৎস
ডিমে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি কোলিন, আয়রন ও ভিটামিন বি-১২ রয়েছে। বিশেষ করে ডিমের কুসুমে থাকা কোলিন শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডিমে থাকা লুটিন ও জিয়াজ্যানথিন চোখের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।
ডিম নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা দূর করার ওপরও এবার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে ডিম বা মুরগি উৎপাদনে গ্রোথ হরমোন ব্যবহারের ধারণাটি সঠিক নয় বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায়ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্রোথ হরমোন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তারা দাবি করেছেন।
ডিমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর পরিবেশগত সুবিধা। গরু বা খাসির মাংসের তুলনায় ডিম উৎপাদনে কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কম। ফলে ডিমকে তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
উৎপাদন বাড়লেও চাপে খামারিরা
দেশে ডিমের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়লেও খামারিরা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। পোল্ট্রি ফিড, বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যার কারণে খামার পর্যায়ের বিক্রয়মূল্য এবং খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকছে।
এতে অনেক সময় ভোক্তাকে বেশি দামে ডিম কিনতে হলেও খামারিরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। ফলে প্রান্তিক খামারিরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
স্কুল ফিডিংয়ে ডিম
শিশুদের অপুষ্টি ও খর্বকায়তা কমানো এবং মেধার বিকাশ নিশ্চিত করতে জাতীয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতেও ডিম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি ডিম দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বিশ্বে চীন শীর্ষে, ব্যবহারে মেক্সিকো
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ডিম উৎপাদন করে চীন। দেশটিতে বছরে প্রায় ৬১৭ বিলিয়ন বা ৬১ হাজার ৭০০ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
মাথাপিছু ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে মেক্সিকো। দেশটিতে বছরে গড়ে একজন মানুষ ৪০৯টি ডিম খান। জাপানে এই সংখ্যা ৩৩৭টি। উন্নত দেশগুলোতে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের ব্যবহার গড়ে ২৭০ থেকে ৩০০টির মধ্যে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে মাথাপিছু ডিমের ব্যবহার এখনো কম।
আয়োজকেরা বলছেন, ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থার সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে দেশে ডিমের ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে একদিকে মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে পোল্ট্রি খাতের খামারি ও উদ্যোক্তাদের আয়ও বাড়বে।
আরটিভি/এসএস




