
যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল এক ‘গোপন বাহিনী’ গড়ে তুলেছে উত্তর কোরিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মার্কিন সহযোগীদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ঢুকে পড়ছেন কিম জং উনের গুপ্তচরেরা।
এরই মধ্যে এমন হাজার হাজার উত্তর কোরীয় গুপ্তচরের সন্ধান পেয়েছে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই)।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘ইনফিলট্রেটেড: নর্থ কোরিয়াস সিক্রেট ইউএস ওয়ার্কফোর্স’-এ এমনই একটি উত্তর কোরীয় দলের গতিবিধি তুলে ধরা হয়েছে। ফাঁস হওয়া বিশাল ব্রাউজার হিস্ট্রি, ইমেইল, ক্যালেন্ডার সূচি এবং নিজস্ব কম্পিউটারের স্ক্রিন রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করে দীর্ঘ এক বছর ধরে পরিচালিত এই অনুসন্ধানে জানা গেছে, কীভাবে ছদ্মবেশী এসব কর্মীরা মার্কিন প্রতিষ্ঠানে নিজেদের চাকরি নিশ্চিত করে।
গবেষণায় উঠে আসা দলটি মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ১ হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করে। এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ব্যবহার করা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আকর্ষণীয় কাভার লেটার ও জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) তৈরিতে তাদের এআই ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে এফবিআই।
এছাড়া, ইন্টারভিউ চলাকালে নিয়োগকারীদের প্রশ্নের উত্তর সরাসরি স্ক্রিনে থাকা এআই চ্যাটবট ‘চ্যাটজিপিটি’ দেখে পড়ার একাধিক স্ক্রিন রেকর্ডিংও উঠে এসেছে। এমনকি বর্তমানে নিয়োগকর্তারা বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে শনাক্ত করতে শুরু করায় নিজেদের গোপন রাখতে এআই-ভিত্তিক ‘ফেস-সোয়াপিং’ প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছেন উত্তর কোরিয়ার গুপ্তচরেরা।
উত্তর কোরিয়ার ‘গোপন বাহিনী’ গড়ায় আছে মার্কিন সহযোগীদেরও ভূমিকা
পিয়ংইয়ংয়ের ঠিকানায় সরাসরি মার্কিন কোম্পানির ল্যাপটপ পাঠানো প্রায় অসম্ভব। তাই উত্তর কোরিয়ার এসব তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর্মীরা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর থেকে কম্পিউটার বা ডিভাইসগুলো পরিচালনার জন্য মার্কিন সহযোগীদের অর্থ প্রদান করে থাকে। আর নিজেরা দূর থেকেই সেসব ডিভাইসে প্রবেশ করে কাজ চালিয়ে যায়।
এক্ষেত্রে আমেরিকান সহযোগীদের মধ্যে অনেকেই বিষয়টি জেনে-বুঝে করেন। আবার অনেকে অজান্তেই ফাঁদে পড়েন। তারা সাধারণত এসব কর্মীদের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, চেক ভাঙানো এবং কখনও কখনও ইন্টারভিউতে অংশ নেওয়ার কাজগুলো করে থাকেন।
ওহাইও অঙ্গরাজ্যের এক ব্যক্তি জানান, উত্তর কোরীয় কর্মীরা মূল কাজ পরিচালনা করার সময় তিনি কেবল মিটিংগুলোতে উপস্থিত থাকতেন। বার্ষিক ৭৫ হাজার ডলারের একটি চুক্তিতে প্রাপ্ত বেতন তারা উভয়ে সমান হারে ভাগ করে নিতেন।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার যাচাই-বাছাই পার হতে উত্তর কোরিয়ার কর্মীরা সাধারণ মার্কিনিদের চুরি হওয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করেন। অনেক সময় তারা একইসঙ্গে একাধিক ভুয়া নাম ব্যবহার করে একই পরিচিতির মাধ্যমে একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
কিন্তু, এর ফলে যাদের পরিচয় চুরি হচ্ছে, তাদের জীবনে নেমে আসছে চরম বিপর্যয়। জর্জিয়ার এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানতে পেরেছে, তার ব্যক্তিগত তথ্য ইন্টারনেটে বিক্রির উদ্দেশ্যে পোস্ট করা হয়েছিল। তা ব্যবহার করে উত্তর কোরিয়ার কর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজ হাতিয়ে নিয়েছে।
জর্জিয়ার ওই ব্যক্তি আরও জানান, বর্তমানে তিনি নতুন কোনও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন না, কোনও ধরনের ব্যাংক ঋণের সুবিধা পাচ্ছেন না, এমনকি নিজের জন্য একটি বাড়ি ভাড়াও নিতে পারছেন না।
উপার্জিত অর্থ যাচ্ছে উত্তর কোরিয়ার সামরিক খাতে
উত্তর কোরিয়ার কিছু কিছু আইটি কর্মীর বার্ষিক আয় প্রায় ৩ লাখ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাদের উপার্জিত বেতনের প্রায় ৯০ শতাংশই সরাসরি পিয়ংইয়ংয়ের শাসকগোষ্ঠীর ফান্ডে চলে যায়। সাম্প্রতিক হিসাবমতে, এই চক্রের মাধ্যমে তারা বছরে প্রায় ৮০ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থ সংগ্রহ করছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই অনুসন্ধানে উত্তর কোরীয় কর্মী ও সাইবার অপরাধীদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থের লেনদেন চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, এই উপার্জিত অর্থ পিয়ংইয়ংয়ের অস্ত্র তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে আগেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এক প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
আরটিভি/এসএইচএম



