
প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে প্রায় ৫৫০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হাওয়াইয়ের বিখ্যাত প্রাকৃতিক খিলান ‘হোলে সি আর্চ’ অবশেষে ধসে পড়েছে। আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে তৈরি প্রায় ৯০ ফুট উঁচু এই প্রাকৃতিক স্থাপনা সমুদ্রের ঢেউ ও দীর্ঘদিনের ক্ষয়ের কারণে ভেঙে সাগরে বিলীন হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস জানিয়েছে, ২৩ সেপ্টেম্বরও খিলানটি অক্ষত ছিল। তবে ২৭ সেপ্টেম্বর রাতের মধ্যে সেটি ধসে পড়ে।
হাওয়াই দ্বীপের হাওয়াই ভলকানোস ন্যাশনাল পার্কের চেইন অব ক্রেটার্স রোডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত ছিল এই প্রাকৃতিক বিস্ময়। পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় স্থানটিতে বহু বছর ধরে ভিড় করতেন দর্শনার্থীরা। খিলানটির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা ছিল পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।

ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর ট্রপিক্যাল স্টর্ম নোলোর প্রভাবে পার্কের বিভিন্ন এলাকা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পার্কের বেশিরভাগ অংশ খুলে দেওয়া হয়। তখনই জানা যায়, দীর্ঘদিনের পরিচিত হোলে সি আর্চ আর নেই। তবে ঠিক কখন এটি ধসে পড়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রায় ৫৫০ বছর আগে আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে তৈরি পাথরের স্তরে প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খিলানটির সৃষ্টি হয়েছিল। নরম ও শক্ত পাথরের অংশ সমানভাবে ক্ষয় না হওয়ায় সমুদ্রের ঢেউ ধীরে ধীরে পাথর কেটে খিলানের আকৃতি তৈরি করে। ভূতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ডিফারেনশিয়াল ইরোশন’। বছরের পর বছর ঢেউ, বাতাস ও আবহাওয়ার প্রভাবে কাঠামোটি দুর্বল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট অংশটুকুও ভেঙে সমুদ্রে পড়ে যায়।

খিলানটির ভেঙে পড়ার আশঙ্কা অবশ্য বহু বছর ধরেই ছিল। ২০১৮ সালে কিলাউয়া আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ও সংশ্লিষ্ট ভূমিকম্পে আশপাশের পাথুরে এলাকায় ফাটল সৃষ্টি হয় এবং উপকূলের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে নতুন করে ফাটল ও অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পুরোনো পর্যবেক্ষণ এলাকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই বছরের মার্চে খিলান থেকে দূরে একটি নিরাপদ পর্যবেক্ষণ এলাকা তৈরি করা হয়।
২০২০ সালের পর ট্রপিক্যাল স্টর্ম ডার্বির সময় প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে খিলানটির নিচের অংশ থেকে বড় একটি পাথরের খণ্ড ভেঙে পড়ে। তখনই কাঠামোটির দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২১ সালে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসও সতর্ক করেছিল, প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে একদিন খিলানটি ধসে পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিল।

‘হোলে সি আর্চ’ নামটির পেছনেও রয়েছে স্থানীয় প্রকৃতির ইতিহাস। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ‘হোলে’ স্থানীয় একটি উদ্ভিদের নাম, যার বৈজ্ঞানিক পরিচয় ওক্রোসিয়া। সেই উদ্ভিদের নাম থেকেই খিলানটির নামকরণ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, সমুদ্রের ঢেউয়ে লাভার পাথর ক্ষয় হয়ে খিলানের মতো আকৃতি তৈরি হওয়ায় এর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘সি আর্চ’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের খিলান দেখতে শক্ত ও স্থায়ী মনে হলেও এগুলো প্রকৃতপক্ষে ক্ষয়শীল ভূপ্রাকৃতিক কাঠামো। সময়ের সঙ্গে খিলান ভেঙে পাথরের স্তূপ বা বিচ্ছিন্ন সমুদ্র-স্তম্ভ তৈরি হতে পারে। একই উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নতুন খিলানও সৃষ্টি হতে পারে।

হোলে সি আর্চ ধসে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই জায়গাটির পুরোনো ছবি ও স্মৃতি ভাগ করে নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটকদের কাছে পরিচিত এই প্রাকৃতিক দৃশ্য এখন ইতিহাসের অংশ। প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাব্দী ধরে প্রকৃতির নানা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকা খিলানটির পতন আবারও মনে করিয়ে দিল প্রকৃতির সৌন্দর্য চিরস্থায়ী নয় অবিরাম ক্ষয়ের কাছে একসময় হার মানতে হয় পাথরের তৈরি বিস্ময়কেও।
আরটিভি/এসকে


