
শসা, লেবু, আদা কিংবা পুদিনা পানিতে ভিজিয়ে তৈরি করা পানীয় এখন বেশ জনপ্রিয়। অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের পানি শরীরের জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থ দূর করে, ওজন কমায়, ত্বক ভালো রাখে এবং শরীরকে ভেতর থেকে পরিষ্কার করে। কিন্তু এসব দাবির কতটা সত্যি?
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ফল, সবজি বা ভেষজ উপাদান মিশিয়ে পানি পান করা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হতে পারে। তবে শুধু এ ধরনের পানি পান করলেই শরীরের স্বাভাবিক বিষমুক্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুত বা আরও কার্যকর হয়ে যায়—এমন প্রমাণ নেই।
ডিটক্স পানি আসলে কী?
ডিটক্স পানি হলো পানিতে বিভিন্ন ফল, সবজি বা ভেষজ উপাদান ভিজিয়ে তৈরি পানীয়। যেমন—লেবু ও আদা, শসা ও পুদিনা, তরমুজ ও পুদিনা, কমলা ও লেবু, স্ট্রবেরি ও তুলসী, আপেল ও দারুচিনি ইত্যাদি।
এতে ফলের রস বা পুরো ফল মিশিয়ে দেওয়া হয় না। ফলে সাধারণত এতে ক্যালরির পরিমাণও খুব কম থাকে। এ কারণে বেশি চিনি থাকা কোমল পানীয় বা ফলের রসের পরিবর্তে অনেকে ডিটক্স পানি পান করেন।
কীভাবে তৈরি করবেন?
ডিটক্স পানি তৈরি করা খুব সহজ। পছন্দের ফল, সবজি বা ভেষজ উপাদান ছোট করে কেটে ঠান্ডা বা গরম পানিতে দিতে হবে।
উপাদানগুলো একটু চটকে দিলে পানিতে স্বাদ ও গন্ধ আরও ভালোভাবে মিশতে পারে। ঠান্ডা পানীয় তৈরি করলে এক থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ফ্রিজে রেখে দেওয়া যায়। তবে এর বেশি সময় রেখে দেওয়া ঠিক নয়। নির্দিষ্ট সময় পর পানিতে থাকা উপাদানগুলো তুলে ফেলতে হবে।
ওজন কমাতে কি সাহায্য করে?
পানি পান করা ওজন নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়ক হতে পারে। ডিটক্স পানির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পর্যাপ্ত পানি পান করলে কিছু সময়ের জন্য শরীরের বিপাকক্রিয়ার গতি বাড়তে পারে এবং ক্ষুধাও কিছুটা কমতে পারে।
খাওয়ার আগে পানি পান করলে কেউ কেউ তুলনামূলক কম খাবার খান। আবার বেশি ক্যালরিযুক্ত বা চিনি দেওয়া পানীয়ের বদলে ডিটক্স পানি পান করলে মোট ক্যালরি গ্রহণও কমতে পারে।
শরীরে পানি পর্যাপ্ত থাকলে শরীরের বর্জ্য বের হতে এবং মল নরম রাখতে সাহায্য করে। ব্যায়ামের সময়ও পর্যাপ্ত পানি শরীরের প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান সঠিকভাবে কাজে লাগাতে সহায়তা করে।
তবে এসব উপকার শুধু ডিটক্স পানির জন্য নয়—সাধারণ পানিও একই ধরনের উপকার দিতে পারে।
হজমের জন্য কেমন?
শরীরের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এর ফলে পেট ফাঁপা ও অলস লাগার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান করলে খাবার অন্ত্রের ভেতর দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
মন-মেজাজ ও শক্তিতেও প্রভাব আছে
শরীরে সামান্য পানির ঘাটতিও মন-মেজাজ, মনোযোগ ও কর্মশক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। পানিশূন্যতার কারণে মাথাব্যথা, মনোযোগ কমে যাওয়া বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
যারা প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করেন, তারা পানির পরিমাণ বাড়ালে শরীর তুলনামূলক সতেজ অনুভব করতে পারেন। মনও ভালো থাকতে পারে এবং কর্মশক্তি বাড়তে পারে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়?
ফল ও সবজিতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য উপকারী। বিশেষ করে ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়তা করে।
তবে ডিটক্স পানিতে ফল বা সবজি ভিজিয়ে রাখার ফলে যে পরিমাণ পুষ্টি পানিতে আসে, তা খুবই কম এবং উপাদানভেদে এর পরিমাণও আলাদা হতে পারে। তাই ডিটক্স পানি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে—এমন দাবি করার যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
শরীরের বিষ দূর করে—এ ধারণা কতটা সত্য?
ডিটক্স পানিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দাবি হলো, এটি শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। কিন্তু ‘বিষ’ বলতে ঠিক কোন পদার্থকে বোঝানো হচ্ছে বা কীভাবে তা শরীর থেকে বের হয়—এ বিষয়ে এসব দাবিতে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকে না।
আসলে মানুষের শরীরের নিজস্ব বিষমুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে, যা শরীর থেকে বিভিন্ন বর্জ্য ও ক্ষতিকর পদার্থ অপসারণে কাজ করে। ডিটক্স পানি পান করে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে দ্রুত বা আরও কার্যকর করা যায়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
শরীরের অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য বদলায়?
আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, ডিটক্স পানি শরীরকে বেশি ক্ষারীয় করে। কিন্তু খাবার বা পানীয় গ্রহণ করে রক্ত কিংবা শরীরের কোষের অম্ল-ক্ষার মাত্রা ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা যায়—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
ত্বক কি আরও সুন্দর হবে?
অনেকে মনে করেন, ডিটক্স পানি শরীরের বিষ দূর করে ত্বক পরিষ্কার ও উজ্জ্বল করে। কিন্তু এ দাবির পক্ষেও যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে পর্যাপ্ত পানি পান করলে ত্বকের পানিশূন্যতা কমতে পারে। তবে সাধারণ পানির তুলনায় ডিটক্স পানি ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে বেশি কার্যকর—এমন প্রমাণ নেই।
তাহলে ডিটক্স পানি কি খাবেন?
ডিটক্স পানি শরীরের বিষ দূর করার কোনো জাদুকরি পানীয় নয়। তবে এটি সতেজ ও কম ক্যালরিযুক্ত পানীয় হিসেবে ভালো বিকল্প হতে পারে।
অনেকের কাছে সাধারণ পানি একঘেয়ে মনে হয়। পানিতে লেবু, শসা, পুদিনা, আদা বা অন্য উপাদান মেশালে স্বাদ বাড়ে। এর ফলে কেউ যদি প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি পান করতে পারেন এবং চিনি দেওয়া পানীয় কমিয়ে দেন, তাহলে সেটি অবশ্যই ভালো অভ্যাস।
অর্থাৎ, ডিটক্স পানির আসল উপকার শরীর পরিষ্কার করার অলৌকিক ক্ষমতায় নয়; বরং পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস তৈরি করাতেই এর বড় সুবিধা।
আরটিভি/জেএমএ



