
অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনকারী সংস্থাগুলোর কাছে এখন চ্যালেঞ্জ হয়েছে দাঁড়িয়েছে কী করে মহামারি করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করা যায়। এরই অংশ হিসেবে মাস্ক পড়া নিশ্চিত করতে একের পর এক অভিযান চালানো হচ্ছে। করোনা পূর্ববর্তী সময়ে দেশের ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো সাধারণত ভেজালবিরোধী ও চাঁদাবাজি রোধে অভিযানে চালালেও অধিকাংশরা এখন মাস্ক পড়া নিশ্চিত করার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এই ফাঁকে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে গোটা চাঁদাবাজ চক্র ও ভেজাল পণ্য ব্যবসায়ীরা।
মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপের মধ্যেও কিছুতে থামছে না চাঁদাবাজি। রাজধানীর ফুটপাথ থেকে শুরু করে নির্মাণাধীন বহুতল ভবন পর্যন্ত হরদম চাঁদাবাজি চলছেই। অসাধু প্রভাবশালীদের আশকারায় চাঁদাবাজদের অবৈধ কর্মকাণ্ডও যেনো বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। যারা এ সংক্রান্ত দায়িত্বপালন করার কথা তাদের নাকের ডগায় বসেই চলছে এসব অপকর্ম।
চাঁদাবাজির বাইরে নেই বাস, টেম্পু, নিষিদ্ধ ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ডিশ, ইন্টারনেট প্রোভাইডার সেক্টর। এখন পুরো রাজধানীর পাড়া মহল্লায় রাস্তা দখল করে বসানো হচ্ছে ভ্যানগাড়ির দোকান। সেখান থেকেও প্রতিদিন তোলা হচ্ছে চাঁদা। একই ধাঁচে চলছে ভেজাল পণ্যের রমরমা বাণিজ্য। করোনা মহামারিতে চাঁদাবাজ চক্র ও ভেজাল পণ্য ব্যবসায়ীরা যেনো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সুযোগের সৎ ব্যবহার করে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের মতে, চাঁদাবাজির ধরণ এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। আগে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি করতো। এখন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগীতায় যুক্ত হয়েছে কতিপয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। এ কাজে সহযোগিতা করছে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ পুলিশ। সন্ত্রাসীদের তৎপরতা একেবারে নেই তা নয়। তবে প্রভাবশালীদের চাঁদা না দিলে সন্ত্রাসীরাও টিকতে পারে না। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে পুলিশও অসহায় রাজনীতিকদের কাছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররাও এ কাজে পিছিয়ে নেই। সরকারি জায়গা-জমি-বাড়ি, রাস্তা ও ফুটপাথ দখল করে কেউ কেউ চাঁদার রাজত্ব কায়েম করেছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব নিয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলে না।
আজ বুধবার (৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স সংলগ্ন সড়কে দেখা গেছে, ফুটপাথ দখল করে চলছে পোষাকসহ বিভিন্ন পণ্যের রমরমা বাণিজ্য। যা সম্ভব হচ্ছে চাঁদাবাজ চক্রের হস্তক্ষেপে।
মতিঝিল শাপলা চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, সোনালী ব্যাংকের সামনে ফুটপাথ দখল করে ভাসমান কাপড় ব্যবসায়ীরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু সোনালী ব্যাংকের সামনে নয়, পুরো শাপলা চত্বরের চারপাশে ফুটপাথ দখল করেছে ভাসমান ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, দিনে ফুটপাথ দখল করে ব্যবসা করলেও রাতে তাদের ভ্যানগাড়ি ও মালামাল গোডাউনে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এতে ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গোডাউন মালিকরা দিনে ৮০ টাকা ও রাতে ১০০ টাকা নিয়ে থাকেন। একই অবস্থা দিলকুশা এলাকায়ও।
গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, জিপিও এর পশ্চিম পাশ ও সামনের ফুটপাথ দখল করে ভাসমান ব্যবসায়ীরা শীতের কাপড় বিক্রি করছেন। একই অবস্থা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনের ফুটপাথেও। সেই এলাকায় শুধু ফুটপাথ দখল করেই খ্যান্ত হয়নি দখলবাজরা। মূল সড়ক দখল করেও কাপড় ও ফলের ব্যবসা করতে দেখা গেছে তাদের।
সূত্র জানায়, রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকা থেকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে চাঁদা আদায় করা হয়। চাঁদা আদায় করতে গিয়েও রয়েছে একাধিক সিন্ডিকেট। তাদের মধ্যে পল্টনের বাসস অফিসের সামনের ফুটপাথ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করেন আদালত থেকে নিষিদ্ধ হকার্স সংগঠনের সভাপতি আবুল হাসেম কবির, তার সহযোগী মুকিদুল ইসলাম শিমুল ও হযরত আলী। বায়তুল মোকারম পূর্ব গেইটের বন্ধ রাস্তার হকার্সের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন পল্টন থানা পুলিশের ক্যাশিয়ার পরিচয়দানকারী ও ইয়াবা ব্যবসায়ী দুলাল, সেকেন্দার হায়াত ও আরিফ চৌধুরী।
বায়তুল মোকারম পশ্চিম পাশের ফুটপাথ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করেন অবৈধ সংগঠন হকার্স সংগ্রাম পরিষদের নেতা চাট গাইয়া হারুন ওরফে বাটপার হারুন, হিন্দু খোকন মজুমদার, মিজান, মোস্তফা ও জাহাঙ্গীর। বায়তুল মোকারম উত্তর পাশের ফুটপাথ থেকে চাঁদা আদায় করেন সাজু, মন্টু, কালা নুরু, আব্দুল্লাহ খোকন ও সবুজ।
বঙ্গবন্ধু এক নম্বর গেটে বাবুল, তার দুই ছেলে আকাশ ও হৃদয়, ২ নম্বর গেট ও ভাষানী স্টেডিয়ামের পাশে চাঁদা সংগ্রহ করেন আলী, গফুর, বায়তুল মোকারম লিঙ্ক রোডে ছোটন, ফারুক, জিপিও এর দক্ষিণ পাশে বুড়া ছালাম, নজরুল মুক্তাঙ্গনের পাশে নাছির, আলমঙ্গীর, মনির, হাউজ বিল্ডিং এর পাশে ফলপট্টিতে ওসমান, আলমগীর, জাহাঙ্গীর, কমিউনিস্টপার্টি অফিসের সামনে হানিফ, কালাম, আবুল হোসাইন, এল মল্লিক বিল্ডিং এর সামনে পল্টন মোড়ে বিল্লাল, টিটু, আহাদ পুলিশ বক্সের দক্ষিণ পাশে সাইদের ছেলে রিপন, জনি, জয়নাল, আহাদ বক্সের উত্তর পাশে লম্বা হারুন ও ফোন বক্সের দোকান নামধারি শাহিন।
সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের পূর্ব পাশে সেলিম, জয়নাল, লম্বা বাবুল, ভোলা, সালেক, আবু সাইদ, রজ্জব, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার এর পশ্চিম পাশে বিমল, মিন্টু, হান্নান সিদ্দিকি, গুলিস্তান হলের সামনে টাকা ওয়ালা বাবুল, খোরশেদ ওরফে বড়মিয়া, কালাম, বাচ্চু, সুলতান, আহাদ বক্সের সামনে নয়ন মুন্সি হান্নান, জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের সামনে লিপু, শহিদ, রমনা ভবনের পশ্চিম পাশে মনির, শফিক, খদ্দর মার্কেটের সামনে কাদের ও মো. আলী, রাজধানী হোটেলের সামনে কালানবী, রব, সেলিম, নাছির, পূর্ণিমা স্ন্যাক্স ও অগ্রণী ব্যাংকের সামনে আক্তার, জাহাঙ্গীর, দুলাল, শাহবুদ্দিন, সোনালী ব্যাংক ও খাবার দাবার হোটেলের সামনে জুয়ারী সালাম, রহিম, অপু।
বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেইটে খলিল, তাজু, নবী, আনোয়ার, ওসমানী উদ্যানের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশে গাউরা বাবুল, লম্বা শাহজাহান, হিন্দু শাহিন, মোহন, বাচ্চু, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সামনে একাধিক মামলার আসামি সাইফুল মোল্লা, তার দুই ছেলে সিবলু, হোসাইন, মোহর আলী, শাহ জাহান, টিপু, বাংলাদেশ ব্যাংকের উত্তর পাশে ইয়াবা ও গানজুট্টি হারুন শহীদ, মতিঝিল সোনালী ব্যাংকের সামনে মকবুল, সাইদ, ফারুক, বক চত্ত্বরে মান্নান মোল্লা, নুরুল ইসলাম, কালা কাশেম, ইউসূফ, নিউ মার্কেটে জুতা সেলিম, চুন্নু, আলামিন, জয়কলি মন্দির এলাকায় মহসিন ও তার বৌ রিতা বেগম।
নিউ মার্কেট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা কলেজের উল্টো দিকে, গাউছিয়া মার্কেটের এলাকায় ফুটপাথ দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। একই অবস্থা রাজধানীর ফার্মগেট এলাকাতেও। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, ফার্মভিউ মার্কেট, তেজগাঁও কলেজের সামনে ফুটপাথ দখল করে কাপড় ও সবজি বিক্রি করছে ভাসমান ব্যবসায়ীরা।
শুধু মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন, নিউ মাকের্ট ও ফার্মগেট এলাকাই নয়, রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাথের মধ্যে ভাসমান ব্যবসায়ীদের দখলে ১০৯ কিলোমিটার। আর ২ হাজার ২৯০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৫৭৩ কিলোমিটার সড়ক অবৈধ দখলে। আর এসব রাস্তা ও ফুটপাথ দখলের নেপথ্যে রয়েছে সরকারদলীয় কতিপয় অসাধু নেতাকর্মী ও পুলিশের বিশাল অর্থ বাণিজ্য। এ কারণে পর্যাপ্ত আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকার পরেও ফুটপাথ দখলমুক্ত করা সম্ভব হয় না।
সূত্রমতে, হকার উচ্ছেদের নামে চোর-পুলিশ খেলা চললেও তাদের প্রশ্রয়ে প্রতিদিন দোকান পেতে বসে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হকার। ফুটপাথ থেকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশ সদস্যরা দৈনিক চাঁদা পায় প্রায় ৩ কোটি টাকা। যা কয়েক স্তরে বণ্টন হয়।
এদিকে, করোনা মহামারিতেও ফুটপাথ দখল করে চাঁদাবাজরা রামরমা বাণিজ্য চললেও নিরব সংশ্লিষ্টরা। তবে করোনার কারণে ফুটপাথে অভিযান বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র্যাব) অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার আরটিভি নিউজকে বলেন, বর্তমানে সারা বাংলাদেশে র্যাবের অধিন ৬ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। আমাদের আরও কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের চাহিদা রয়েছে। মহামারি করোনার প্রেক্ষাপটে ভেজাল বিরোধী অভিযানে কিছুটা ভাটা পড়েছে, তবে এ অভিযান বন্ধ হয়নি। গতকালও সিলেটে আমাদের ভেজাল বিরোধী অভিযান চলেছিল। ক্রমেই দেশের বিভিন্ন স্থানের এ অভিযান চালানো হবে। অন্যদিকে ফুটপাথ উচ্ছেদের দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। তবে এটিকে কেন্দ্র করে যদি চাঁদাবাজি হয়ে থাকে, তা অবশ্যই অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা আমলে নেবো। পাশাপাশি চাঁদাবাজি প্রতিরোধে আমরা গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছি। চাঁদাবাজদের ধরতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা আমরা কামনা করছি।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ওয়ালিদ হোসেন বলেন, করোনাকালীন সময়ে সবাইকে মাস্ক পড়া নিশ্চিত করতে এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। তবে যদি সিটি কর্পোরেশনের নির্দেশনা পাওয়া যায়, তাহলে ফুটপাথ উচ্ছেদের অভিযান শুরু করা হবে।
ফুটপাথ উচ্ছেদের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. তারিক বিন ইউসুফ বলেন, উচ্ছেদের পর সুযোগ বুঝে হকাররা আবার ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে তাদের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে এর সত্যতা রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন ঢাকা শহরে ১৪ হাজার হতদরিদ্র আসছে, যাদের ঠিকানা হচ্ছে বস্তি ও ফুটপাতগুলোতে ব্যবসা করার জন্য।
চাঁদা আদায়ে কাউন্সিলররা জড়িত আছে কিনা? এমন প্রশ্নে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এই কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে পুলিশ ও কাউন্সিলর একে অপরের উপর পল্টাপাল্টি দোষারোপ করে। তবে খুব শিগগিরই একটা বোর্ড মিটিং ডাকা হচ্ছে, যেখানে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই বোর্ড মিটিংয়ে পুলিশ কমিশনার, ওসি ও কাউন্সিলররা উপস্থিত থাকবেন। শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।
কেএফ/এমকে




