
আফ্রিকার সংঘাতকবলিত বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আন্তরিক সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার মর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশি সদস্যরা।
দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে বিপর্যস্ত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশটির বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
সিয়েরা লিওন থেকে হাইতি এবং দক্ষিণ সুদান থেকে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো)- দশকের পর দশক ধরে জাতিসংঘের নীল হেলমেটধারী বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক পরিসরে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
জাতিসংঘ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রশংসা করে বলেছে, আপনারা আপনাদের জাতির জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘের নীল হেলমেটের অধীনে দায়িত্ব পালনের সময় আমাদের সদস্যরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের সঙ্গে মানবিক সেবার সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি সদস্যরা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, পুলিশি দায়িত্ব, সামরিক অভিযান, চিকিৎসাসেবা ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে নিয়োজিত ছিলেন। তারা প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, নিরাপত্তা টহল পরিচালনা করেছেন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছেন।
জাতিসংঘের পতাকার নিচে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা বহন করে তারা সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে নিরাপত্তা অভিযান, চিকিৎসাসেবা, প্রকৌশল প্রকল্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়েছেন।
বিশেষ করে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ ও ওষুধ বিতরণের মাধ্যমে সংঘাতকবলিত এলাকার মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। শান্তিরক্ষা মিশনের দায়িত্বের অংশ হিসেবে তারা এসব মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
২০২৫ সালের মার্চ মাসেই দক্ষিণ সুদানের ওয়াউ শহরে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা ৪০০ জনেরও বেশি অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষকে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দেন। আফ্রিকার দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দেশ দক্ষিণ সুদানে প্রায় চার দশক ধরে সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায় চলেছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের দক্ষিণ সুদান মিশনে (ইউএনএমআইএসএস) দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কাছ থেকে চিকিৎসা ও ওষুধ নিতে রোগীদের দীর্ঘ সারি অপেক্ষা করছিল।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ওয়াউ শহরে আরেকটি চিকিৎসা কার্যক্রমে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ৩০০ জনেরও বেশি স্থানীয় বাসিন্দাকে চিকিৎসা দেন।
বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, এ ধরনের উদ্যোগ প্রমাণ করে যে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম কেবল নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা জোরদার করাও সম্ভব হচ্ছে।
১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের যাত্রা
১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক দলে সামরিক পর্যবেক্ষক পাঠানোর মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়।
১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীও এ কার্যক্রমে যুক্ত হয়।
এরপর থেকে সিয়েরা লিওন, হাইতি, লাইবেরিয়া, সোমালিয়া, কম্বোডিয়া, আইভরি কোস্ট, সুদান, দক্ষিণ সুদান ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রসহ আফ্রিকা, এশিয়া, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশি সদস্যরা।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জাতিসংঘের ৪৩টি শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ৫ হাজার ৫৬৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মোট ১ হাজার ৯৭৭ জন নারী সদস্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছেন।
ওয়েবসাইটে বিভিন্ন মিশনে বর্তমানে মোতায়েন থাকা ২৮৮ জন নারী সামরিক সদস্যের তথ্যও দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ২৭৪ জন, নৌবাহিনীর সাতজন এবং বিমানবাহিনীর সাতজন রয়েছেন। তবে এসব পরিসংখ্যান সর্বশেষ কবে হালনাগাদ করা হয়েছে, তা ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়নি।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারী শান্তিরক্ষীদের অবদান
সিয়েরা লিওনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের পর স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা অবদান রেখেছেন। সংঘাত-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পুনরুদ্ধার কার্যক্রমেও তারা সহায়তা করেন।
হাইতিতে ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত জাতিসংঘ মিশনের অধীনে বাংলাদেশের ১৬০ সদস্যের একটি সম্পূর্ণ নারী গঠিত পুলিশ ইউনিট দায়িত্ব পালন করে। নিরাপত্তা কার্যক্রম, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং পুনর্গঠন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগে ইউনিটটি অবদান রাখে।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকা জোরদারে নারীদের অংশগ্রহণও ক্রমেই বাড়ছে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তামান্না-ই-লুৎফি গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে জাতিসংঘ মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব পালন একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে ‘ফিমেল এনগেজমেন্ট টিম’ চালু করে। স্থানীয় নারী ও শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং তাদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ চিহ্নিত করাই এসব দলের প্রধান উদ্দেশ্য।
আন্তর্জাতিক মিশনে দায়িত্ব পালনের আগে সদস্যদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং।
দায়িত্ব পালনে ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ
প্রতিকূল ও প্রায়ই বিপজ্জনক পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের উল্লেখযোগ্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে তাদের কেউ কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, আবার কেউ আহত হয়েছেন।
আইএসপিআরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে এবং বৈশ্বিক শান্তি, সংহতি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য শান্তিরক্ষীদের বহন করা লাল-সবুজ পতাকা কেবল জাতীয় গৌরবের প্রতীক নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক সেবা এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিও দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
আরটিভি/এমএম



