ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

মলত্যাগ করতে সপ্তাহে একবার নামে গাছ থেকে, অলস প্রাণী সম্পর্কে জানুন ১০ তথ্য

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১১ এএম
ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম স্লথ। দিনের বেশির ভাগ সময় গাছের ডালে ঝুলে কাটানো, ধীরগতিতে চলাফেরা এবং অদ্ভুত জীবনযাপনের কারণে প্রাণীটি পরিচিত। তবে স্লথের জীবনযাপনের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা জানলে অবাক হতে হয়। যেমন, কিছু প্রজাতির স্লথ সাধারণত সপ্তাহে একবার মলত্যাগের জন্য গাছ থেকে মাটিতে নামে। আর এই সময়েই তাদের শিকারির আক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

আজ ২০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক স্লথ দিবস। স্লথের সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালন করা হয়। ২০১০ সালে কলম্বিয়ার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা এআইইউএনএইউ (AIUNAU) ফাউন্ডেশন দিবসটি চালু করে। বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণে ঝুঁকিতে থাকা এই প্রাণী সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

স্লথকে সাধারণভাবে অলস প্রাণী বলা হলেও তাদের ধীরগতির পেছনে রয়েছে বিশেষ শারীরবৃত্তীয় অভিযোজন।

চলুন, জেনে নেওয়া যাক প্রাণীটি সম্পর্কে ১০টি চমকপ্রদ তথ্য।

১. অলস নয়, ধীর বিপাকই মূল রহস্য

স্লথের প্রধান খাবার গাছের পাতা। পাতায় থাকা পুষ্টি উপাদান হজম করা কঠিন হওয়ায় তাদের বিপাক প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। ফলে খাবার হজম করতে অনেক সময় লাগে এবং শরীরের শক্তি সাশ্রয় করে চলতে হয়। কিছু খাবার হজম হতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহও লাগতে পারে। এ কারণেই স্লথ সাধারণত ধীরগতিতে চলাফেরা করে এবং দীর্ঘ সময় বিশ্রাম নেয়।

২. মাটিতে ধীর, পানিতে দক্ষ সাঁতারু

গাছের ডালে চলাফেরার সময় স্লথের গতি খুবই কম। মাটিতেও তারা ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগোয়। তবে পানিতে স্লথ বেশ দক্ষ সাঁতারু। তাদের দীর্ঘ অঙ্গ ও শরীরের গঠন সাঁতারে সহায়তা করে। কিছু স্লথ পানির নিচে দীর্ঘ সময় শ্বাস ধরে রাখতে পারে; প্রয়োজন হলে হৃদস্পন্দন কমিয়েও অক্সিজেন সাশ্রয় করে।

৩. লোমের মধ্যে লুকিয়ে থাকে ক্ষুদ্র বাস্তুতন্ত্র

স্লথের লোমে শ্যাওলা, ছত্রাক ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রাণী বাস করতে পারে। লোমের মধ্যে জন্মানো শ্যাওলা তাদের শরীরকে আশপাশের সবুজ পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে ছদ্মবেশ তৈরিতে সহায়তা করে। এতে শিকারির চোখ এড়িয়ে থাকার সুবিধা পায় তারা। স্লথের লোমে থাকা অণুজীবের কিছু উপাদান নিয়েও বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন, যা ভবিষ্যতে ওষুধ আবিষ্কারে কাজে লাগতে পারে।

৪. মলত্যাগ করতে সপ্তাহে একবার নামে মাটিতে

স্লথের জীবনযাপনের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো তাদের মলত্যাগের অভ্যাস। বিশেষ করে তিন-আঙুলবিশিষ্ট স্লথ সাধারণত সপ্তাহে প্রায় একবার মলত্যাগের জন্য গাছ থেকে মাটিতে নামে। গাছের ওপর নিরাপদে থাকার পরিবর্তে মাটিতে নামার কারণে এ সময় তারা শিকারির আক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে। কেন তারা এই ঝুঁকি নেয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।

৫. দৃষ্টিশক্তি দুর্বল, ঘ্রাণশক্তি গুরুত্বপূর্ণ

স্লথের দৃষ্টিশক্তি তুলনামূলক দুর্বল। কিছু প্রজাতি রঙের পার্থক্য বুঝতেও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। ফলে পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতে তারা ঘ্রাণশক্তি ও স্পর্শের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। গাছের ডাল আঁকড়ে ধরা, খাবার খুঁজে বের করা এবং আশপাশের পরিবেশ বুঝতে তাদের এসব ইন্দ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৬. গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও শরীর অভিযোজিত

স্লথ গাছের ডালে চলাফেরা করার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। তাদের লম্বা, বাঁকানো নখ এবং শক্তিশালী আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা ডালে ঝুলে থাকতে সাহায্য করে। তবে গাছ থেকে পড়ে গেলে তারা গুরুতর আহত হতে পারে। তাই অনেক উচ্চতা থেকে পড়েও সহজে বেঁচে যায় এমন ধারণাকে নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

৭. শরীরের গন্ধ কম থাকায় ছদ্মবেশে সুবিধা পায়

স্লথের ধীরগতির পাশাপাশি তাদের লোমের রং ও গঠনও শিকারির চোখ এড়াতে সহায়ক। লোমে জন্মানো শ্যাওলা তাদের পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকতে সাহায্য করে। তবে স্লথের শরীরে একেবারেই গন্ধ হয় না বা তারা ঘামতে পারে না এমন দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। তাদের শরীরের গন্ধ ও তাপ নিয়ন্ত্রণের বৈশিষ্ট্য প্রজাতি এবং পরিবেশভেদে ভিন্ন হতে পারে।

৮. উল্টো হয়ে ঝুলেও সহজে শ্বাস নিতে পারে

স্লথের জীবনের বড় একটি অংশ কাটে গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে। দীর্ঘ সময় এভাবে থাকার উপযোগী করে তাদের শরীর গঠিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের পেটের ভেতরের অঙ্গগুলো বিশেষ টিস্যুর মাধ্যমে শরীরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত থাকে, যা উল্টো হয়ে ঝুললে ফুসফুসের ওপর অঙ্গগুলোর চাপ কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া তাদের বাঁকানো নখ ও বিশেষ পেশিগঠন ডাল আঁকড়ে ধরে থাকতে কম শক্তি ব্যয় করতে সহায়তা করে।

৯. মাথা অনেকটা ঘোরাতে পারে

স্লথের ঘাড়ের গঠন তাদের মাথা অনেকটা ঘোরাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে তিন-আঙুলবিশিষ্ট স্লথের ঘাড়ে সাধারণ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় বেশি কশেরুকা থাকে। প্রজাতিভেদে এই সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে। মাথা ঘোরানোর এই ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা শরীর বেশি না ঘুরিয়েই আশপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং সম্ভাব্য বিপদের দিকে নজর রাখতে পারে।

১০. শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল

অন্যান্য অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় স্লথের বিপাকের হার কম এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও সীমিত। ফলে পরিবেশের তাপমাত্রা তাদের শরীরে তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। রোদ পোহানো বা উষ্ণ স্থানে অবস্থান করার মাধ্যমে তারা শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য পায়। তবে তারা সরীসৃপের মতো পুরোপুরি পরিবেশের তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল নয়; স্লথও স্তন্যপায়ী প্রাণী।

প্রজাতি ও বিলুপ্তির ঝুঁকি

বর্তমানে স্লথের প্রধান দুটি গোষ্ঠী হলো দুই-আঙুলবিশিষ্ট ও তিন-আঙুলবিশিষ্ট স্লথ। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে এদের বসবাস। প্রজাতিভেদে তাদের খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও সংরক্ষণ পরিস্থিতিতে পার্থক্য রয়েছে।

বিশেষ করে পানামার এসকুডো দে ভেরাগুয়াস দ্বীপে বসবাসকারী পিগমি তিন-আঙুলবিশিষ্ট স্লথ অত্যন্ত বিপন্ন। বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন স্লথের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্লথ সংরক্ষণে প্রাকৃতিক বন রক্ষা, বন্যপ্রাণী পাচার বন্ধ এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমানো জরুরি। আন্তর্জাতিক স্লথ দিবসের মূল বার্তাও হলো প্রকৃতির এই ধীরগতির প্রাণীকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে।

আরটিভি/এসকে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
বাজারে ‘হেসেখেলে’ বেড়াচ্ছে পলিথিন
নিষেধাজ্ঞার পরেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছে। মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, মাছের আড়ৎ ও ফলের দোকানে পলিথিন ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজারে ‘হেসেখেলে’ বেড়াচ্ছে পলিথিন
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘নতুন পরিকল্পনা’
এ ল্যাবরেটরি স্থাপিত হলে রাসায়নিক ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা সহজ হবে এবং অবৈধ মাছ শিকার অনেকাংশে কমে আসবে বলে বন বিভাগ আশা করছে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘নতুন পরিকল্পনা’
মানুষের যন্ত্রণায় নিজেকে বদলে ফেলছে হিমালয়ের এই পাখি
মানুষের কর্মকাণ্ডের বিস্তারে বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পাখি মোনালের জীবনযাপন। অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন ও শব্দদূষণের কারণে পাখিটি তার স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে আরও উঁচু এলাকায় সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে যোগাযোগ বজায় রাখতে ডাকের ধরনও বদলাচ্ছে মোনাল।
মানুষের যন্ত্রণায় নিজেকে বদলে ফেলছে হিমালয়ের এই পাখি
মানুষের যন্ত্রণায় নিজেকে বদলে ফেলছে হিমালয়ের এই পাখি
মানুষের কর্মকাণ্ডের বিস্তারে বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পাখি মোনালের জীবনযাপন। অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন ও শব্দদূষণের কারণে পাখিটি তার স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে আরও উঁচু এলাকায় সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে যোগাযোগ বজায় রাখতে ডাকের ধরনও বদলাচ্ছে মোনাল।
মানুষের যন্ত্রণায় নিজেকে বদলে ফেলছে হিমালয়ের এই পাখি
বন্যপ্রাণীর গায়ে মাইক্রোচিপ বসাবে বন বিভাগ, কিন্তু কেন?
দেশের বন্যপ্রাণীর পাচার ঠেকাতে এবং সুরক্ষিত রাখতে এবার জন্তুদের গায়ে মাইক্রোচিপ বসানোর কথা ভাবছে বাংলাদেশ বন বিভাগ।
বন্যপ্রাণীর গায়ে মাইক্রোচিপ বসাবে বন বিভাগ, কিন্তু কেন?