
সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের যে প্রাকৃতিক নিয়ম, সে নিয়মে আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেল আরও একটি বছর। আমাদের জীবনে বছর যায়, বছর আসে কিন্তু বদলায় না রোগ-শোক আর দুর্দশা। বিদায়ী বছর ২০২৩ সালেও ছিল বিভিন্ন রোগের প্রকোপ। তবে দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে মশাবাহী রোগ ডেঙ্গু। আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড তৈরি করেছে নতুন মাইলফলক।
করোনার অভিঘাত সামলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে বিশ্ব। সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল-মিলিয়ে বাংলাদেশের সবকিছুই উন্মুক্ত হয়েছে। শিক্ষা, পর্যটন কিংবা ব্যবসা সবই স্বাভাবিক। তবে এরপর গত বছর ২০২২ সালে দাপট দেখিয়েছে ডায়রিয়া। হাসপাতালজুড়ে ছিল ডায়রিয়া রোগী ভরা। কিন্তু সদ্য বিদায় নিতে যাওয়া ২০২৩ সাল ছিল ডেঙ্গুর দখলে। বছর শেষ হয়নি এখনও। এরই মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ জন (১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত)। এদের মধ্যে মারা গেছেন ১ হাজার ৬৬৭ জন। বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে এত আক্রান্ত ও মৃত্যু এর আগে হয়নি।
এ বছর বিশ্বে আর কোনো দেশে ডেঙ্গুতে এত মৃত্যু হয়নি। পুরো বছর শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯০ হাজার ৫৯৬ এবং নারী ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৬০। মোট মৃত্যু ১ হাজার ৬৬৭, যার মধ্যে নারী ৯৫৪ জন ও পুরুষ ৭১৩। গড়ে প্রতিদিন ৯১৯ আক্রান্ত, মৃত্যু ৫ জন। এ বছর ১৫ বছরের কম বয়সী ১৬৬ জন শিশু মারা গেছে ডেঙ্গুতে। ডেঙ্গুতে এত শিশুর মৃত্যু আগে কখনো হয়নি। তবে সরকারি তথ্যের বাইরে বহু মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের একটি অংশ নিজেদের মতো করে চিকিৎসা নিয়েছে, অনেকে আবার চিকিৎসা নেননি। সরকারি হিসাবের বাইরে আক্রান্তদের সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন।
তবে জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করেন, যত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, তার চার থেকে পাঁচ গুণ মানুষ বাস্তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত থাকেন। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে ডেঙ্গু হলেও ২০২৩ সালে কোনো নিয়ম মানেনি এডিস মশা।
উদ্বেগের কারণ হচ্ছে এ বছর শীতকালেও মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নিয়মিত মারা যাচ্ছেন। গত ১২ ডিসেম্বরের চিত্র দেখলেই বোঝা যায় হিসাবটা।
ওইদিন ২৪ ঘণ্টার বুলেটিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে- সারা দেশে ৩১১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে মারা গেছেন ২ জন। আর ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৬৫ জন ও মারা গেছেন ৪৫ জন। যে সময়টা পুরোটাই শীতকাল। এ বছর ৬৪ জেলার মানুষই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু ডেঙ্গু ছিল মূলত শহরের মশাবাহিত রোগ। এ বছর সেসব গল্পকে পুরোনো গল্প বানিয়ে ছেড়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্তদের ৬৬ শতাংশ ঢাকা শহরের বাইরের মানুষ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৩ হাজার, বরিশাল বিভাগে ৩৭ হাজার এবং খুলনা বিভাগে ৩৪ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। সবচেয়ে কম আক্রান্ত হয়েছেন সিলেট বিভাগে। এই বিভাগের চারটি জেলায় ১ হাজার ৪২৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন, আর মারা গেছেন একজন। যেখানে ২০২১ সালে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। মারা যান ১০৫ জন।
২০২২ সালে প্রায় ৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬২ হাজার হয় আক্রান্ত এবং মৃত্যু আড়াই শতাধিক। সেখানে ২০২৩ সালে ৩ লক্ষাধিক আক্রান্ত এবং দেড় শহস্রাধিক মৃত্যু জনমনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। বের হয়ে আসে স্বাস্থ্যখাতে দুর্বল দিক। স্কুলগুলোতেও ছিল বিশেষ পোশাক পরার নির্দেশনা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগ নানান পরিকল্পনা হাতে নেয়। মশকনিধন কার্যক্রমসহ সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং ডেঙ্গু পরীক্ষার ফি নির্ধারণ ও সিটি করপোরেশন থেকে অভিযান চালানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বেশ কিছু পদক্ষেপ কখনও প্রশংসিত আবার কিছু পদক্ষেপ হয় সমালোচিত। তবে সব জরাজীর্ণ স্মৃতি পেছনে ফেলে নতুন আশায় বুক বেঁধে আবারও এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, আরও সামনে এগিয়ে যাবে দেশের প্রতিটা মানুষ এই প্রত্যাশা নিয়ে নতুন বছর শুরু করছে সবাই। শীতের সকালে আদর মাখা রোদ যেমন বিতাড়িত করে রিক্ততা, তেমন নতুন বছরও সরিয়ে দিক সকল রোগ-শোক সুস্থ হয়ে উঠুক প্রতিটা প্রাণ।




