
অফিসের অতিরিক্ত কাজে আপনার হয়ে যেতে পারে বিরাট ক্ষতি। ফিনল্যান্ডে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবসায়ী ও নির্বাহীদের যারা মধ্যবয়সে কম ছুটি নিয়েছেন, তাদের অকালমৃত্যু হয়েছে বা আর জীবিত থাকা ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
শ্রম ও উৎপাদনশীলতা সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মঘণ্টা বেশি হলেই উৎপাদনশীলতা বাড়ে না বরং কাজের মান খারাপ হয়। অতিরিক্ত কাজ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় এবং বোধবুদ্ধি ও সৃজনশীলতা নষ্ট করে। অতিরিক্ত কাজের কারণে ২০১৫ সালে মারা যায় ২ হাজার ৩শ ১০ জাপানি। দেশটিতে মানুষের এমন মৃত্যু ঘটনা ‘কারোসি’নামে পরিচিত।
অন্যদিকে কাজের ক্ষেত্রে বিরতি নিলে মনোযোগ ধরে রাখা যায় এবং কর্মদক্ষতা বাড়ে। আর পরিপূর্ণ বিশ্রাম বলে কিছু নেই। কেননা, মস্তিষ্ক সব সময় সচল থাকে। আমরা যখন বিশ্রামে থাকি, তখন মস্তিষ্কের একটি অংশ সক্রিয় হয়, যা ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক (ডিএমএন) নামে পরিচিত। মস্তিষ্কের এই অংশ সৃজনশীলতার জন্মস্থান।
লেখক জোস ডেভিস তার ‘দারুণ দুই ঘণ্টা’(টু অসাম আওয়ার্স) গ্রন্থে মানসিক কাজের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন, ধরা যাক, আপনি বিরাট কোনো কর্মযজ্ঞ সাধন করতে চান, যে কাজ শারীরিক নয়, মানসিক। সবচেয়ে কার্যকর পন্থায় আপনি যদি কাজটি করেন, তবে হয়তো বিরতি ছাড়াই অনেক কষ্টে একবারেই কাজটি করতে পারেন। কিন্তু এর পরিবর্তে আপনি যদি অন্য কাজের মধ্যে অল্প অল্প করে কাজটি করতে থাকেন, তবে হয়তো কয়েক সপ্তাহেই কাজটি হয়ে যাবে কোনো কষ্ট ছাড়াই। ডেভিস বলেন, ‘আসলে মস্তিষ্ক অনেকটাই মাংসপেশির মতো।’
আমাদের অনেকেই মনে করেন, মস্তিষ্ক মাংসপেশির মতো নয়, মস্তিষ্ক কম্পিউটারের মতো নিরবচ্ছিন্ন কাজ করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধারণা কেবল মিথ্যাই নয়, বিরতি ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করলে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘অটো পাইলট’গ্রন্থের লেখক অ্যান্ড্রিউ স্মার্ট বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন কাজ করলে ধীরে ধীরে মানসিক চাপ তৈরি হতে থাকে। এরপরও কাজ অব্যাহত থাকলে তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।’
এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা হৃদরোগের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ বাড়ায়। আর ধূমপানের ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘ সময় কাজ করেন, তাদের স্ট্রোকের চরম ঝুঁকি রয়েছে। যারা দিনে ১১ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, তারা সাত-আট ঘণ্টা কাজ করা ব্যক্তিদের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি অবসন্নতায় ভোগেন।
ফিনল্যান্ডে এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবসায়ী ও নির্বাহীদের যারা মধ্যবয়সে কম ছুটি নিয়েছেন, তাদের অকালমৃত্যু হয়েছে অথবা জীবিত থাকা ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে।
ছুটি মানুষকে প্রতিদানও দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণকালীন পাঁচ হাজার কর্মীকে নিয়ে চালানো একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা পাওনা ছুটির মধ্যে ১০ দিনেরও কম ছুটি কাটিয়েছেন, তাদের বেতন বৃদ্ধি বা বোনাস পাওয়ার হার ছুটি নেওয়া কর্মীদের তুলনায় কম। অর্থাৎ ছুটি কাটানো ব্যক্তিদের মানসিক প্রফুল্লতা বাড়ে, যা কাজের মানে প্রভাব ফেলে। আর এ কারণে তারা পুরস্কৃত হন।
বিশ্বের সবচেয়ে সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল মানুষ কম কাজ করার গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কাজের ক্ষেত্রে তারা কেবল দৃঢ় নীতিগত সিদ্ধান্ত বজায়ই রাখেন না, তারা বিশ্রাম এবং খেলাধুলার প্রতিও নিবেদিত। শিল্পী ও লেখক হেনরি মিলার তার ‘লেখালেখির ১১ বিধি’গ্রন্থে বলেছেন, ‘শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটা বিষয় নিয়েই কাজ করুন। একপর্যায়ে থেমে যান। নিজেকে মানুষ রাখুন। আশপাশে দৃষ্টি দিন, বিভিন্ন স্থানে যান, মন চাইলে পান করুন।’
মার্কিন মনীষী বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন, যিনি পরিশ্রমের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, তিনি ব্যাপক সময় অলসতায় কাটাতেন। প্রতিদিন দুপুরের খাবারের জন্য তিনি দুই ঘণ্টার বিরতি নিতেন। রাতে কোনো কাজ করতেন না। জীবিকার জন্য নিরবচ্ছিন্ন কাজ না করে তিনি প্রচুর সময় ব্যয় করতেন নিজের শখ পূরণের জন্য। নিজেকে মূল পেশা থেকে দূরে রাখতে পারার কারণেই তার কাছ থেকে এসেছে বিস্ময়কর কয়েকটি আবিষ্কার।
বৈশ্বিক ক্ষেত্রেও গড় কর্মঘণ্টার সঙ্গে উৎপাদনশীলতার কোনো সম্পর্ক নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মার্কিন কর্মীরা গড়পড়তায় নরওয়ের নাগরিকদের তুলনায় দিনে ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা বেশি কাজ করেন। কিন্তু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নরওয়ের শ্রমিকেরা প্রতি ঘণ্টায় অবদান রাখেন ৭৮.৭০ ডলার। আর যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকেরা অবদান রাখেন ৬৯.৬০ ডলার।
ইতালিতে সাপ্তাহিক গড় কর্মঘণ্টা ৩৫.৫। তারা প্রতি ঘণ্টায় তুরস্কের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি উৎপাদন করে। তুরস্কের সাপ্তাহিক গড় কর্মঘণ্টা ৪৭.৯।
একটানা শ্রমের পর এর ক্ষতিকর প্রভাব দূর করতে বেশি সময় লাগে না। প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু উভয়কেই যখন কোনো ধরনের যন্ত্র না দিয়ে চারদিনের জন্য বাইরে পাঠানো হয় এবং পরে যদি তাদের এমন কাজ দেওয়া হয়, যা দিয়ে সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা পরিমাপ করা যায় দেখা যাবে, তাদের সক্ষমতা বেড়েছে ৫০ শতাংশ। এমনকি তারা যদি বাইরে গিয়ে কেবল হেঁটেও বেড়ায়, তাদের সৃজনশীলতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।
এপি/পি




