
শিগগিরই ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের নতুন কমিটি গঠিত হতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তৃণমূলে সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করা, দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নতুন কমিটিতে আনতে সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে মাতৃ সংগঠন বিএনপি। ফলে শুধু দলীয় নেতা-কর্মীরাই নন, রাজনীতি সচেতন মানুষমাত্রই অনাগত কমিটির দিকে নজর রাখছেন।
এর আগে, গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূইয়া স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।
পুরোনো কমিটি বিলুপ্তির পর নতুন কমিটি ঘিরে ইতোমধ্যে যুবদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কারা আসছেন, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। প্রত্যাশিত পদ পেতে নেতা-কর্মীরাও শুরু করেছেন দৌড়ঝাঁপ, লবিং।
দলীয় নীতিনির্ধারকদের সূত্রে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদেরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তৃণমূলে গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিতর্কমুক্ত ভাবমূর্তির বিষয়টিকে সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই, এমন ক্লিন ইমেজের নেতাদের সামনে নিয়ে আসা হবে। থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিগুলোও দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফের সচল করা হবে। মূলত রাজধানীতে সাংগঠনিক ভিত মজবুত করাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
আলোচনায় আছেন যারা
দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূ্র্তির কারণে মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বাঙলা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব ও সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ আইয়ুব আলী। স্বৈরাচারী আমলে আইয়ুব আলীকে শতাধিক মামলার আসামি করা হয় তাকে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সক্রিয়তার কারণে জেলও খেটেছেন বেশ কয়েকবার।
পাশাপাশি আলোচনায় আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও উত্তর যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম মিজানুর রহমান রাজ, মনিরুল ইসলাম স্বপন ও তসলিম আহসান মাসুমের নামও আলোচনা আছে।
এছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদে উত্তর যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আমিনুল হক হিমেল, যুগ্ম আহ্বায়ক জুলহাস আহমেদ, রফী উদ্দিন ফয়সাল, কামরুল ইসলাম, তানভীর আহম্মেদ ইকরাম, আবু সালেহ চৌধুরী মানিক, ফরহাদ আলী সজীব, আরিফ হোসেন, ছাত্রদলের সাবেক নেতা মেহেদী হাসান রুয়েলের নামও শোনা যাচ্ছে।
তবে আলোচনায় থাকা নামগুলো এখনো সম্ভাব্য হিসেবেই রয়েছে; আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে কারও নিয়োগ নিশ্চিত নয়। দলটির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন কমিটি অতি শিগগিরই ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
যদিও পদপ্রাপ্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তাদের ভাষ্য, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাংগঠনিক অভিভাবক। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সেটিই তারা আনন্দের সঙ্গে মেনে নেবেন।
নেতৃত্বে কী চাইছে বিএনপি
নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দলটি সাংগঠনিকভাবে কার্যকর নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে পারে বলে নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা, তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
তবে নতুন কমিটিতে কারা স্থান পাবেন, সে বিষয়ে বিএনপির বা যুবদলের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নাম ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হবে সেটিও স্পষ্টভাবে বলা হয়নি।
ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর একটি। ফলে নতুন কমিটির নেতৃত্বে কারা আসছেন, তা নিয়ে দলটির তৃণমূল থেকে কেন্দ্র দুই পর্যায়েই আগ্রহ রয়েছে। নতুন কমিটি ঘোষণার পর মহানগর উত্তরের সাংগঠনিক কার্যক্রম, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে।
দলীয় নেতাদের মতে, বিতর্কিত ব্যক্তিদের হাতে নেতৃত্ব গেলে, ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের সংগঠন দুর্বল বা বিভক্ত থাকলে শুধু জনপ্রিয়তা দিয়ে নির্বাচনে জয় পাওয়া কঠিন হবে।
কী বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে বিএনপির কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি নতুন কমিটি গঠনের পর তৃণমূলের কর্মীদের সম্পৃক্ত রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করা নেতা-কর্মীরা যেন নিজেদের বঞ্চিত মনে না করেন বা দল থেকে দূরে সরে না যান, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দীর্ঘদিনের নিবেদিত নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়লে বা তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে নির্বাচনের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রায় একই মতামত ব্যক্ত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে সাবেক অধ্যাপক এবং পার্লামেন্টারি রাজনীতির প্রখ্যাত গবেষক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে নিবেদিত ও যোগ্য নেতাদের সামনে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় হতাশা তৈরি করা এড়িয়ে চলা উচিত।
আরটিভি/এসকে


