ঢাকা সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

মক্কার ইমামের ভুল ধরেছিলেন যে বাংলাদেশি আলেম

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.) । ছবি: সংগৃহীত

সিলেটের আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান আলেম ও হাদিসবিশারদ। গভীর জ্ঞান, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও দ্বীনি শিক্ষায় তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরেও। ১৯৪৭ সালে হজ পালন করতে গিয়ে মক্কার ইমামের খুতবায় ভুল ধরার ঘটনা তার জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়।

১৯০৭ সালে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বায়ামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আল্লামা মুশাহিদ আহমদ বায়ামপুরী (রহ.)। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারান তিনি। মায়ের কাছেই তার শিক্ষাজীবনের শুরু। মাত্র সাত বছর বয়সে কোরআন শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য ভারত যান।

রামপুর আলিয়া মাদরাসা ও মিরাঠ আলিয়া মাদরাসায় প্রায় সাত বছর পড়াশোনা করেন তিনি। হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আকাইদ ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর ১৯৩৬ সালে ভর্তি হন বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে। সেখানে হাদিসশাস্ত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন বলে জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৪৭ সালে হজে আলোচনায় আসেন

তিনবার হজ পালন করেছিলেন আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.)। ১৯৪৭ সালের হজে তার জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় পেয়ে আরবের আলেমরা বিস্মিত হয়েছিলেন বলে তার জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। সে সময় মক্কার ইমামের খুতবায় একটি ভুল তার নজরে আসে এবং তিনি তা সংশোধনের বিষয়টি তুলে ধরেন।

তার হাদিসশাস্ত্রের জ্ঞান ও গভীর পাণ্ডিত্যে তৎকালীন সৌদি আলেমরা মুগ্ধ হন বলেও বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে দাবি করা হয়েছে। এমনকি সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ তাঁর সামনে রাষ্ট্রীয় সংবিধান পেশ করে কোথাও ভুল বা সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি না দেখতে বলেছিলেন—এমন কথাও তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায়। পরে তিনি বেশ কয়েকটি বিষয় সংশোধনের পরামর্শ দেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

দেশে ফিরে হাদিস শিক্ষায় আত্মনিয়োগ

দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে পড়াশোনা শেষ করে আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.) ভারতে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে সিলেটবাসীর অনুরোধে দেশে ফিরে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গাছবাড়ী জামিউল উলুম কামিলা মাদরাসাতেও তিনি হাদিসের পাঠদান করেন।

১৯৫৩ সালে নিজ জন্মস্থান কানাইঘাটে ফিরে এসে কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসায় যোগ দেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে ‘দারুল উলুম কানাইঘাট’ রাখা হয়। ১৯৫৪ সালে সেখানে দাওরায়ে হাদিস চালু করেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তার পাঠদানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা কানাইঘাটে ছুটে আসতেন। তার গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়।

সমাজ সংস্কারেও ছিল বড় ভূমিকা

শিক্ষাদান ও লেখালেখির পাশাপাশি মুসলিম সমাজের কুসংস্কার, অনাচার ও বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.)। সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় তিনি ওয়াজ ও নসিহত করতেন।

রমজান মাসে সিলেটের বন্দরবাজার জামে মসজিদে তারাবির পর থেকে সাহরি পর্যন্ত তাঁর তাফসির ও আলোচনা শুনতে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হতেন। তার আলোচনা ছিল ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও সমাজজীবনের বিভিন্ন বিষয়েও সমৃদ্ধ।

সিলেটের_আল্লামা_মুশাহিদ_বায়ামপুরী_(রহ.)
সিলেটের আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.) । ছবি: সংগৃহীত

রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন

আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.) রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি তার শিক্ষক মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে যুক্ত হন।

১৯৬২ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও অংশ নেন। সংসদে তিনি কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আইন, ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার এবং পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরেন।

রেখে গেছেন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ

আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.) ছিলেন একজন লেখকও। রাজনীতি, তাসাউফ, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ফাতহুল কারীম ফি সিয়াসাতিন্নাবিয়ীল আমীন, আল-ফুরকান বাইনাল হক্বে ওয়াল বাতিল ফি ইলমিত তাসাউফে ওয়াল ইহসান, সত্যের আলো, ইসলামে ভোট ও ভোটের অধিকার এবং সেমাউল কোরআন।

১৯৭১ সালে ইন্তেকাল

আল্লামা মুশাহিদ বায়ামপুরী (রহ.) ১৩৯০ হিজরির ১০ জিলহজ, ১৯৭১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঈদুল আজহার রাতে ইন্তেকাল করেন। পরদিন ঈদের দিন আসরের পর তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার ছোট ভাই আল্লামা মুজাম্মিল (রহ.) জানাজায় ইমামতি করেন।

নিজ হাতে গড়ে তোলা দারুল উলুম কানাইঘাট মাদরাসার সামনেই তাকে দাফন করা হয়।

আল্লামা বায়ামপুরী (রহ.)-এর জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা, হাদিস শিক্ষা, সমাজ সংস্কার ও দ্বীনি খেদমতের এক দীর্ঘ অধ্যায়। সিলেটের কানাইঘাটের এই আলেম তার শিক্ষা ও কর্মের মাধ্যমে উপমহাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছেন।

সূত্র: শিক্ষক বাতায়ন


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
অজুর পর যে দোয়া পড়লে মিলবে জান্নাতের আট দরজা খোলার সুসংবাদ
পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একজন মুমিনের জীবনে শারীরিক ও আত্মিক পবিত্রতার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নামাজ আদায় ও কোরআন তিলাওয়াতসহ বিভিন্ন ইবাদতের জন্য অজু গুরুত্বপূর্ণ আমল।
অজুর পর যে দোয়া পড়লে মিলবে জান্নাতের আট দরজা খোলার সুসংবাদ
নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাতায়াত করলে কী ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়
মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় কখনো কখনো নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে যাতায়াত করলে কী ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়
আজকের নামাজের সময়সূচি
রোববার (৪ অক্টোবর) ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ-
আজকের নামাজের সময়সূচি
হাদিসের বর্ণনা / বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে যারা
মুমিনের জীবনে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার গুরুত্ব অপরিসীম। বিনা হিসাবে জান্নাত পাওয়া মহান আল্লাহর অনন্য নেয়ামতের একটি।
বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে যারা
২০৩০ সালে একই বছরে দুইবার রমজান, কেন ঘটবে এমন বিরল ঘটনা?
২০৩০ সালে একই গ্রেগরিয়ান বছরে দুইবার পবিত্র রমজান মাস পেতে যাচ্ছেন বিশ্বের মুসলমানরা। জানুয়ারি ও ডিসেম্বর মাসে রমজান পড়ার সম্ভাবনা থাকায় ওই বছর দুই দফায় রোজা পালনের বিরল পরিস্থিতি তৈরি হবে।
২০৩০ সালে একই বছরে দুইবার রমজান, কেন ঘটবে এমন বিরল ঘটনা?
আরও পড়ুন
মালয়েশিয়ান কুকুর মাটি খুঁড়ে বের করল নিখোঁজ বাংলাদেশির মরদেহ
দিল্লির ছাত্র আন্দোলন থেকে গ্রেপ্তার, ৬ বছর পর ৭ দিনের জামিন
নিউইয়র্ক পুলিশে ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পেলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মোহাম্মদ ইসলাম
২৮ নতুন মুখে সাউথ ক্যারোলিনায় বাংলাদেশিদের মিলনমেলা