
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জন্য যেমন বড় বিপর্যয়, তেমনি ইসলামের দৃষ্টিতে এসব ঘটনা মহান আল্লাহর কুদরত ও নিদর্শন স্মরণ করার উপলক্ষ। ভূমিকম্প, ভূমিধস, বন্যা কিংবা অন্যান্য বিপদের সময় একজন মুমিনের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, তওবা-ইস্তিগফার করা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
ভূমিকম্পে কোরআনের সতর্কবার্তা
পবিত্র কোরআনে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়াবহ ব্যাপার।’
এর পরের আয়াতগুলোতে কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে—মানুষ আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়বে এবং গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত হয়ে যাবে।
—সুরা আল-হজ, আয়াত: ১-২
সুরা যিলযালেও পৃথিবীর প্রচণ্ড কম্পনের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কম্পনে প্রকম্পিত হবে। আর পৃথিবী তার বোঝাসমূহ বের করে দেবে। আর মানুষ বলবে, এর কী হলো?’
এরপর বলা হয়েছে, সেদিন পৃথিবী তার ওপর সংঘটিত সব কর্মকাণ্ডের বিবরণ প্রকাশ করবে।
—সুরা আজ-যিলযাল, আয়াত: ১-৬
ভূমিধস ও ধ্বংসও আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন
কোরআনে অতীতের বিভিন্ন জাতির ওপর আল্লাহর শাস্তির কথাও বর্ণিত হয়েছে। সুরা আল-আরাফে আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘অতঃপর ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল; ফলে তারা নিজ নিজ ঘরে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’
—সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৭৮
এছাড়া সুরা আল-ওয়াকিয়ায় কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ প্রকম্পনের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছে—
‘যখন পৃথিবী প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। অতঃপর তা বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হবে।’
—সুরা আল-ওয়াকিয়া, আয়াত: ৪-৬
দুর্যোগ কি শুধু শাস্তি?
ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্প, বন্যা বা ভূমিধসকে নিশ্চিতভাবে ‘আল্লাহর শাস্তি’ বলে ঘোষণা করা ঠিক নয়। কারণ একই বিপদ কারও জন্য পরীক্ষা, কারও জন্য সতর্কবার্তা এবং কারও জন্য গুনাহ মোচনের কারণ হতে পারে। প্রকৃত কারণ ও আল্লাহর কাছে প্রত্যেক ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান একমাত্র তাঁরই রয়েছে।
তবে কোরআনে মানুষের কর্মের কারণে পৃথিবীতে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ার কথাও বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে, যাতে তিনি তাদের কিছু কর্মের ফল তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’
—সুরা আর-রূম, আয়াত: ৪১
দুর্যোগের সময় মুমিনের করণীয়
ভূমিকম্প, বন্যা কিংবা ভূমিধসের মতো বিপদের সময় ইসলামের শিক্ষা হলো আল্লাহকে স্মরণ করা, নিজের ভুলের জন্য তওবা করা এবং বেশি বেশি ইস্তিগফার করা। পাশাপাশি বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো, উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করা, খাবার-পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্বই নয়, এটি নেক আমলও।
ভূমিকম্প নিয়ে হাদিসে সতর্কতা
কিছু হাদিসে সমাজে বিভিন্ন অনাচার, অন্যায় ও পাপাচার ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন বিপর্যয়ের সম্পর্কের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তিরমিজির একটি বর্ণনায় অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন, আমানতের খেয়ানত, জাকাতকে বোঝা মনে করা, মদ ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপক প্রচলনসহ নানা অনাচারের কথা উল্লেখ করে বিপর্যয়ের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
—জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৪৭
আরেক বর্ণনায় গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপক প্রচলন এবং মদ্যপানের প্রসার ঘটলে ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
—জামে তিরমিজি, হাদিস: ২২১২
তবে এসব হাদিসের আলোকে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে কারও পাপের শাস্তি হিসেবে চিহ্নিত না করে, নিজের আমল সংশোধন ও আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই মুমিনের জন্য উত্তম।
আল্লাহর ক্ষমতা ও নিদর্শন
এসব দুর্যোগের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর অসীম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটান, যাতে মানুষ অহংকার ত্যাগ করে এবং স্রষ্টাকে স্মরণ করে। সুরা আনআমের আয়াতাংশে ওপর থেকে আজাব (যেমন- বন্যা, প্রবল ঝড়) এবং নিচ থেকে আজাব (যেমন- ভূমিকম্প, ভূমিধস) পাঠানোর ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
পাপের পরিণতি ও সতর্কবার্তা
সমাজে যখন অন্যায়, জুলুম, সুদ, ও পাপাচার বেড়ে যায়, তখন অনেক সময় তা মানুষের ওপর আল্লাহর গজব বা সতর্কবার্তা হিসেবে নেমে আসে। কোরআনে বলা হয়েছে, জলে ও স্থূলে মানুষের নিজেদের হাতের কামাইয়ের কারণেই বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে।
তাই ভূমিকম্প, ভূমিধস বা বন্যার মতো দুর্যোগ এলে আতঙ্কের পাশাপাশি আল্লাহর কুদরত স্মরণ, তওবা-ইস্তিগফার, ধৈর্য এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানো—ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আরটিভি/জেএমএ


