
ইসলামে বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রী উভয়ের সম্মতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে দেওয়ার অধিকার বাবা-মায়ের নেই বলে জানিয়েছেন ইসলামি চিন্তাবিদরা। বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে বিয়ের আগে তার মতামত ও সম্মতি নেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে হাদিসে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, হে যুব সমাজ, তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিয়ে করা কর্তব্য। কেননা বিয়ে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণকারী, যৌনাঙ্গের পবিত্রতাকারী। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)
ইসলামে বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিন বা তারিখ নির্ধারিত নেই। তবে বিয়ের ক্ষেত্রে ইজাব বা প্রস্তাব এবং কবুল বা গ্রহণের পাশাপাশি সাক্ষীর উপস্থিতিও জরুরি।
নারীর সম্মতি নেওয়া জরুরি
বিয়ের আগে নারীর মতামত ও সম্মতি নেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে হাদিসে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আগে বিয়ে হয়েছে এমন নারীকে তার মতামত বা সম্মতি ছাড়া এবং কুমারি নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না। কুমারি নারীর অনুমতির বিষয়ে তিনি বলেন, তার নীরবতাই তার সম্মতি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৩৬)
এমনকি সন্তানের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়ার ঘটনাও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সময়ে ঘটেছিল। খানসা বিনতে খিজাম আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, তার বাবা তাকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেন। তিনি ওই বিয়ে অপছন্দ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে তিনি বিয়েটি বাতিল করে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৩৮)
আরেক বর্ণনায় এসেছে, এক নারী অভিযোগ করেন, তার বাবা তাকে তার ভাতিজার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন নিজের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি ওই নারীর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেন। পরে তিনি জানান, তিনি বাবার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। তবে তার উদ্দেশ্য ছিল, নারীরা যেন জানতে পারে—বিয়ের বিষয়ে বাবার একতরফা সিদ্ধান্তের অধিকার নেই। (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৭৪)
ছেলে-মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেওয়া যাবে না
ইসলামি শরিয়তের আলোকে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। বিয়ের ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সন্তানের নিজস্ব মতামতকে উপেক্ষা করে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, মা-বাবার জন্য সমীচীন নয় যে তারা ছেলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন কোনো মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দেবেন, যাকে সে পছন্দ করে না। ছেলে এমন বিয়ে প্রত্যাখ্যান করলে তাকে অবাধ্য হিসেবে গণ্য করা হবে না। (মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩২, পৃষ্ঠা: ৩০)
এদিকে শায়খ আহমাদুল্লাহ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, কোনো সন্তানের অপছন্দে তাকে কারও সঙ্গে বিয়ে দিতে বাধ্য করার অধিকার মা-বাবার নেই। সন্তানের অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া ইসলামে জায়েজ নয়। ছেলে বা মেয়ে রাজি না হলে বাবা-মায়ের জোর করে বিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, বাবা-মা যদি জোর করে সন্তানের জন্য অনুপযুক্ত জায়গায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে চান, তাহলে সন্তানের নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত। সন্তানের ন্যায্য দাবি ও মতামত শোনা মা-বাবার দায়িত্ব।
বিয়েতে পারিবারিক সম্মতি ও সন্তানের মত দুটিই গুরুত্বপূর্ণ
ইসলাম বাবা-মায়ের সম্মান ও তাদের সঙ্গে সদাচরণকে গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সম্মতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই অভিভাবকদের উচিত পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সন্তানের মতামত নেওয়া এবং তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সম্মান করা।
অর্থাৎ, সন্তানকে জোর করে বিয়েতে বাধ্য না করে পারিবারিকভাবে আলোচনা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরটিভি/এসকে

