ঢাকা শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

অন্তরে প্রতিহিংসা জন্মালে ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে যে আমল করবেন

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০২ এএম
অন্যের সাফল্য ও নিয়ামত দেখে অন্তরে হিংসা জাগলে ইসলামের শিক্ষা, কোরআনের দোয়া ও হাদিসের আলোকে জেনে নিন হিংসা থেকে মুক্ত থাকার উপায়। ছবি: সংগৃহীত

অন্যের সাফল্য, সম্পদ, সৌন্দর্য কিংবা সুখ দেখে কখনো নিজের মনে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতি যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অন্যের ভালো কিছু নষ্ট হয়ে যাক—এমন কামনা জাগে, তখন তা হিংসায় পরিণত হয়। ইসলামে অন্তরের এই নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। হিংসা মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করে, মনে অশান্তি বাড়ায় এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করে।

তবে কারও ভালো কিছু দেখে নিজেরও তেমন ভালো কিছু পাওয়ার ইচ্ছা করা আর তার নিয়ামত নষ্ট হয়ে যাক—এমন কামনা করা এক বিষয় নয়। তাই অন্তরে হিংসা জন্মালে তা প্রশ্রয় না দিয়ে নিজের মনকে সংশোধন করা জরুরি। ইসলামের শিক্ষা ও কিছু অভ্যাস এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

১. হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকুন

হিংসা মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে এবং পারস্পরিক ভালোবাসা নষ্ট করে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا تَبَاغَضُوا، وَلَا تَحَاسَدُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا

অর্থ: “তোমরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না এবং একে অপরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে থাকো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০৬৫)।

এই শিক্ষার আলোকে অন্যের সাফল্যে কষ্ট না পেয়ে তার প্রতি সদয় হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কারও সঙ্গে মতের অমিল থাকলেও তার ক্ষতি কামনা করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।

২. নিজের নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন

অন্যের সম্পদ, সাফল্য কিংবা জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের তুলনা করতে থাকলে নিজের প্রাপ্তিগুলোও অনেক সময় ছোট মনে হয়। এতে মনের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। তাই অন্যের কী আছে, তা নিয়ে পড়ে না থেকে নিজের জীবনে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলোর কথা ভাবুন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ، وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ، فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ

অর্থ: “তোমরা নিজেদের চেয়ে নিচের অবস্থানে থাকা মানুষের দিকে তাকাও, তোমাদের চেয়ে উঁচু অবস্থানে থাকা মানুষের দিকে তাকিয়ো না। এতে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে করার প্রবণতা কমবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৬৩)।

নিজের সুস্থতা, পরিবার, নিরাপত্তা, জীবিকা কিংবা জীবনের ছোট ছোট প্রাপ্তির জন্যও কৃতজ্ঞ থাকা জরুরি। কৃতজ্ঞতা মানুষকে নিজের জীবনের ভালো দিকগুলো চিনতে সাহায্য করে।

৩. যার প্রতি হিংসা হয়, তার জন্য দোয়া করুন

কারও উন্নতি দেখে মনে হিংসা জাগলে তার ক্ষতি কামনা না করে বরং তার কল্যাণের জন্য দোয়া করার চেষ্টা করুন। এতে নিজের মনকে বিদ্বেষ থেকে সরিয়ে শুভকামনার দিকে নেওয়া সহজ হতে পারে।

পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি সুন্দর দোয়া শেখানো হয়েছে—

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ

উচ্চারণ: রব্বানাগফির লানা ওয়া লি-ইখওয়ানিনাল্লাজিনা সাবাকুনা বিলঈমানি, ওয়া লা তাজআল ফি কুলুবিনা গিল্লাল্লিল্লাজিনা আমানু, রব্বানা ইন্নাকা রাউফুর রহিম।

অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও ক্ষমা করুন, যারা ঈমানে আমাদের আগে অগ্রগামী হয়েছে। আর যারা ঈমান এনেছে, তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি পরম স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা হাশর, আয়াত ১০)।

এই দোয়ার মাধ্যমে নিজের অন্তরকে বিদ্বেষমুক্ত রাখার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া যায়।

৪. নিজের জন্য যা চান, অন্যের জন্যও তা চান

নিজের জন্য সাফল্য, সম্মান ও সুখ কামনা করা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যের জন্যও একই ধরনের কল্যাণ কামনা করতে পারা উত্তম চরিত্রের পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ

অর্থ: “তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩)।

তাই অন্যের ভালো কিছু দেখে মনে কষ্ট হলে নিজেকে প্রশ্ন করুন—আমি কি নিজের জন্য যেমন সাফল্য চাই, তার জন্যও তেমন সাফল্য চাইতে পারি? এই মনোভাব চর্চা করলে অন্যের প্রতি শুভকামনা বাড়তে পারে।

৫. হিংসার ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন

সুনান আবু দাউদে একটি বর্ণনায় হিংসাকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, আগুন যেমন জ্বালানি পুড়িয়ে ফেলে, হিংসাও তেমনি নেক আমল ধ্বংস করে। তবে এই বর্ণনাটিকে মুহাদ্দিস আলবানী দুর্বল বলেছেন। তাই এটিকে নিঃশর্তভাবে সহিহ হাদিস বলা ঠিক নয়।

তবে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ সহিহ বুখারির হাদিসেও রয়েছে। হিংসা মানুষকে অন্যের ক্ষতি কামনা, অপবাদ দেওয়া কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই এমন অনুভূতি তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা জরুরি।

৬. হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান

অন্যের হিংসা বা অনিষ্টের আশঙ্কা হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া যায়। পবিত্র কোরআনের সুরা ফালাকে আল্লাহ তাআলা শিক্ষা দিয়েছেন—

وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

অর্থ: “আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।” (সুরা ফালাক, আয়াত ৫)।

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া। একই সঙ্গে নিজের অন্তরেও যেন অন্যের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ বাসা না বাঁধে, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

অন্তরে হিংসা জাগলে তাৎক্ষণিক করণীয়

ইস্তিগফার করুন: নিজের ভুল অনুভূতি বুঝতে পারলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। বলতে পারেন—

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ

উচ্চারণ: আসতাগফিরুল্লাহ।

অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন: নিজের প্রাপ্তির কথা মনে করে বলুন—

الْحَمْدُ لِلَّهِ

উচ্চারণ: আলহামদুলিল্লাহ।

অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

অন্যের কল্যাণ কামনা করুন: যার প্রতি হিংসা হচ্ছে, তার জন্য ভালো কিছু কামনা করুন এবং তার নিয়ামতে বরকতের দোয়া করুন।

তুলনা কমিয়ে নিজের উন্নতিতে মন দিন: অন্যের সাফল্যে মন খারাপ না করে নিজের লক্ষ্য ঠিক করুন। কীভাবে নিজের দক্ষতা ও জীবনমান উন্নত করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দিন।

অন্যের ভালো কিছু নষ্ট হয়ে যাক—এমন কামনা করে কারও লাভ হয় না; বরং এতে নিজের মনেই অশান্তি বাড়ে। তাই অন্যের অর্জনে কষ্ট না পেয়ে নিজের প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞ থাকা, অন্যের কল্যাণ কামনা করা এবং অন্তরকে বিদ্বেষমুক্ত রাখার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ আমাদের অন্তরকে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে পবিত্র রাখুন। আমিন।

আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
জুমার দিন দুই খুতবার মাঝে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনায় যা পড়বেন 
জুমার দিন মুসলমানদের কাছে বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ। এ দিনের দোয়া কবুলের বিশেষ সময়কে কাজে লাগাতে অনেকেই বিভিন্ন দোয়া ও ইস্তিগফার পড়েন।
জুমার দিন দুই খুতবার মাঝে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনায় যা পড়বেন 
আজকের নামাজের সময়সূচি
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা ব্যস্ততায় কাটে আমাদের প্রতিটি দিন। কাজ, পরিবার, পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে অনেক সময় আত্মিক প্রশান্তির কথা ভুলে যাই।
আজকের নামাজের সময়সূচি
নামের আগে শায়খ কেন কারণ জানালেন আহমাদুল্লাহ
নিজের নামের আগে শায়খ কেন ব্যবহার করা হয়, সে বিষয়ে খোলামেলা ব্যাখ্যা দিয়েছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আহমাদুল্লাহ। সম্প্রতি তিনি  এই বহুল আলোচিত সম্মানসূচক শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য ও প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন তিনি। আলাপচারিতার একপর্যায়ে সাংবাদিক জানতে চান যে সাধারণত দেশে ইসলামী স্কলারদের নামের পূর্বে মুফতি বা মাওলানা জাতীয় পরিচিতি দেখা গেলেও তার নামের শুরুতে ‘শায়খ’ যুক্ত হওয়ার কারণ কী। জবাবে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, শায়খ আসলে সম্মানসূচক একটি ভূষণ। আমরা যেরকম ‘জনাব’, ‘শ্রদ্ধেয়’—এ ধরনের শব্দ দিয়ে মানুষকে সম্মানিত করার চেষ্টা করি, শায়খও অনেকটা তেমন। শায়খ শব্দটি মূলত সিনিয়রিটি বোঝায়। আরব বিশ্বে এটি খুব পরিচিত একটি সম্বোধন বা টাইটেল বলা যেতে পারে। সেখানে আলেম-ওলামাসহ সর্বস্তরের মানুষ পরস্পরকে সম্মান করে শায়খ বলে সম্বোধন করেন। আলেমদের ক্ষেত্রে এটি একটু বেশি ব্যবহৃত হয়। তিনি নিজের প্রবাস জীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সৌদি আরবে তিনি প্রায় ১০ বছর অবস্থান করেছিলেন। সেখানে দেশটির ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাভাষী প্রবাসীদের ধর্মীয় নানা বিষয়ে সহায়তা দেওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। কোনো প্রবাসী আইনি জটিলতা বা মামলায় জড়িয়ে পড়লে কখনো কখনো স্থানীয় আদালতের বিচারকদের সাথে দোভাষীর দায়িত্বও পালন করতে হতো তাকে। সেখানে বাংলা ভাষাভাষীরাও ‘শায়খ’ শব্দটি বলতে অভ্যস্ত। মূলত সেখান থেকেই ‘শায়খ’ শব্দটি আমার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বিষয়টি এমন নয় যে এটি কোনো অর্জনের টাইটেল, তিনি স্পষ্ট করেন যে এটি বিশেষ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা আনুষ্ঠানিক অর্জনের মাধ্যমে পাওয়া কোনো উপাধি নয়। মুফতিদের ক্ষেত্রে যেমন নির্দিষ্ট যোগ্যতা বা দায়িত্বের বিষয় আছে, এটি তেমন নয়। আমাদের দেশে যেমন মাওলানা বা হুজুর বলে সম্বোধন করা হয়, সেখানে শায়খ বলে সম্বোধন করা হয়। আরটিভি/টিআর
নামের আগে শায়খ কেন কারণ জানালেন আহমাদুল্লাহ
কবর জিয়ারত ও সালাম দিলে মৃতরা কি টের পান?
মৃত্যু অবধারিত। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। প্রিয়জনের মৃত্যুতে স্বজনরা যেমন শোকাহত হন, তেমনি অনেকেই কবর জিয়ারত করতে গিয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও সালাম করেন।
কবর জিয়ারত ও সালাম দিলে মৃতরা কি টের পান?
আজকের নামাজের সময়সূচি
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ-
আজকের নামাজের সময়সূচি
আরও পড়ুন
জুমার দিন দুই খুতবার মাঝে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনায় যা পড়বেন 
জুমার দিন যে আমলগুলো ভুলবেন না
‘তাবিজ-আমল’ প্রসঙ্গে ইসলামের ব্যাখ্যা
সংসারে বরকত আনতে মেনে চলুন ৬ আমল