
অন্যের সাফল্য, সম্পদ, সৌন্দর্য কিংবা সুখ দেখে কখনো নিজের মনে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতি যখন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে অন্যের ভালো কিছু নষ্ট হয়ে যাক—এমন কামনা জাগে, তখন তা হিংসায় পরিণত হয়। ইসলামে অন্তরের এই নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। হিংসা মানুষের সম্পর্ক নষ্ট করে, মনে অশান্তি বাড়ায় এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি করে।
তবে কারও ভালো কিছু দেখে নিজেরও তেমন ভালো কিছু পাওয়ার ইচ্ছা করা আর তার নিয়ামত নষ্ট হয়ে যাক—এমন কামনা করা এক বিষয় নয়। তাই অন্তরে হিংসা জন্মালে তা প্রশ্রয় না দিয়ে নিজের মনকে সংশোধন করা জরুরি। ইসলামের শিক্ষা ও কিছু অভ্যাস এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
১. হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকুন
হিংসা মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে এবং পারস্পরিক ভালোবাসা নষ্ট করে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا تَبَاغَضُوا، وَلَا تَحَاسَدُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا
অর্থ: “তোমরা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না এবং একে অপরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে থাকো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০৬৫)।
এই শিক্ষার আলোকে অন্যের সাফল্যে কষ্ট না পেয়ে তার প্রতি সদয় হওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কারও সঙ্গে মতের অমিল থাকলেও তার ক্ষতি কামনা করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
২. নিজের নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন
অন্যের সম্পদ, সাফল্য কিংবা জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের তুলনা করতে থাকলে নিজের প্রাপ্তিগুলোও অনেক সময় ছোট মনে হয়। এতে মনের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। তাই অন্যের কী আছে, তা নিয়ে পড়ে না থেকে নিজের জীবনে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলোর কথা ভাবুন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ، وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ، فَهُوَ أَجْدَرُ أَنْ لَا تَزْدَرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ
অর্থ: “তোমরা নিজেদের চেয়ে নিচের অবস্থানে থাকা মানুষের দিকে তাকাও, তোমাদের চেয়ে উঁচু অবস্থানে থাকা মানুষের দিকে তাকিয়ো না। এতে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে তুচ্ছ মনে করার প্রবণতা কমবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৬৩)।
নিজের সুস্থতা, পরিবার, নিরাপত্তা, জীবিকা কিংবা জীবনের ছোট ছোট প্রাপ্তির জন্যও কৃতজ্ঞ থাকা জরুরি। কৃতজ্ঞতা মানুষকে নিজের জীবনের ভালো দিকগুলো চিনতে সাহায্য করে।
৩. যার প্রতি হিংসা হয়, তার জন্য দোয়া করুন
কারও উন্নতি দেখে মনে হিংসা জাগলে তার ক্ষতি কামনা না করে বরং তার কল্যাণের জন্য দোয়া করার চেষ্টা করুন। এতে নিজের মনকে বিদ্বেষ থেকে সরিয়ে শুভকামনার দিকে নেওয়া সহজ হতে পারে।
পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি সুন্দর দোয়া শেখানো হয়েছে—
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
উচ্চারণ: রব্বানাগফির লানা ওয়া লি-ইখওয়ানিনাল্লাজিনা সাবাকুনা বিলঈমানি, ওয়া লা তাজআল ফি কুলুবিনা গিল্লাল্লিল্লাজিনা আমানু, রব্বানা ইন্নাকা রাউফুর রহিম।
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও ক্ষমা করুন, যারা ঈমানে আমাদের আগে অগ্রগামী হয়েছে। আর যারা ঈমান এনেছে, তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি পরম স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” (সুরা হাশর, আয়াত ১০)।
এই দোয়ার মাধ্যমে নিজের অন্তরকে বিদ্বেষমুক্ত রাখার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া যায়।
৪. নিজের জন্য যা চান, অন্যের জন্যও তা চান
নিজের জন্য সাফল্য, সম্মান ও সুখ কামনা করা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যের জন্যও একই ধরনের কল্যাণ কামনা করতে পারা উত্তম চরিত্রের পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
অর্থ: “তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৩)।
তাই অন্যের ভালো কিছু দেখে মনে কষ্ট হলে নিজেকে প্রশ্ন করুন—আমি কি নিজের জন্য যেমন সাফল্য চাই, তার জন্যও তেমন সাফল্য চাইতে পারি? এই মনোভাব চর্চা করলে অন্যের প্রতি শুভকামনা বাড়তে পারে।
৫. হিংসার ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক থাকুন
সুনান আবু দাউদে একটি বর্ণনায় হিংসাকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, আগুন যেমন জ্বালানি পুড়িয়ে ফেলে, হিংসাও তেমনি নেক আমল ধ্বংস করে। তবে এই বর্ণনাটিকে মুহাদ্দিস আলবানী দুর্বল বলেছেন। তাই এটিকে নিঃশর্তভাবে সহিহ হাদিস বলা ঠিক নয়।
তবে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ সহিহ বুখারির হাদিসেও রয়েছে। হিংসা মানুষকে অন্যের ক্ষতি কামনা, অপবাদ দেওয়া কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই এমন অনুভূতি তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা জরুরি।
৬. হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান
অন্যের হিংসা বা অনিষ্টের আশঙ্কা হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া যায়। পবিত্র কোরআনের সুরা ফালাকে আল্লাহ তাআলা শিক্ষা দিয়েছেন—
وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
অর্থ: “আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।” (সুরা ফালাক, আয়াত ৫)।
এই আয়াতের শিক্ষা হলো, হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া। একই সঙ্গে নিজের অন্তরেও যেন অন্যের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ বাসা না বাঁধে, সেদিকেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
অন্তরে হিংসা জাগলে তাৎক্ষণিক করণীয়
ইস্তিগফার করুন: নিজের ভুল অনুভূতি বুঝতে পারলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। বলতে পারেন—
أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ
উচ্চারণ: আসতাগফিরুল্লাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন: নিজের প্রাপ্তির কথা মনে করে বলুন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ
উচ্চারণ: আলহামদুলিল্লাহ।
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
অন্যের কল্যাণ কামনা করুন: যার প্রতি হিংসা হচ্ছে, তার জন্য ভালো কিছু কামনা করুন এবং তার নিয়ামতে বরকতের দোয়া করুন।
তুলনা কমিয়ে নিজের উন্নতিতে মন দিন: অন্যের সাফল্যে মন খারাপ না করে নিজের লক্ষ্য ঠিক করুন। কীভাবে নিজের দক্ষতা ও জীবনমান উন্নত করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দিন।
অন্যের ভালো কিছু নষ্ট হয়ে যাক—এমন কামনা করে কারও লাভ হয় না; বরং এতে নিজের মনেই অশান্তি বাড়ে। তাই অন্যের অর্জনে কষ্ট না পেয়ে নিজের প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞ থাকা, অন্যের কল্যাণ কামনা করা এবং অন্তরকে বিদ্বেষমুক্ত রাখার চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ আমাদের অন্তরকে হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে পবিত্র রাখুন। আমিন।
আরটিভি/জেএমএ


