
কুমিল্লা নগরীর ধর্মসাগর পাড়ে ভাষাসৈনিক ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাসভবন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ দাবিতে বাড়িটির সামনে জমির মালিকানা দাবি করে স্থাপন করা একটি সাইনবোর্ড ভেঙে বাড়িটি সংরক্ষণ করে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাতের এই ঘটনাটিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত। তার পক্ষ থেকেই সাইনবোর্ডটি স্থাপন করা হয়েছিল।
এদিকে রোববার (৮ নভেম্বর) বিষয়টি নিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়েছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। ফেসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে চরম নোংরামি করা হচ্ছে। মূলত স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী বাড়িটি কেনার জন্য মালিকপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠায়। তারা শর্ত দেয় যে, বাড়িটি তাদের কাছে বিক্রি না করলে এটিকে ‘সংরক্ষিত সম্পদ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হবে। মালিকপক্ষ যখন সম্পত্তিটি বিক্রি করতে রাজি হয়, তখন বাজার মূল্যের চাইতে অর্ধেকেকম দাম প্রস্তাব করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই মালিকপক্ষ এতে রাজি না হওয়ায় একজন প্রভাবশালী আইনজীবীর মদদে গত দুই বছর ধরে পরিবারটিকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আর বর্তমানে এই হয়রানির সাথে যুক্ত হয়েছে এনসিপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও অনুসারীরা।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করে সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি বাড়িটির সামনে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন আরমা দত্ত। এতে জমিটির মালিকানা ওয়ারিশ সূত্রে তার বলে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু শুক্রবার রাতে সাইনবোর্ডটি ভাঙচুর করা হয়। পরে রাতেই এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়। এটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটিকে ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে। বাড়িটি সংরক্ষণের দাবিতে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হবে।
এছাড়া মাসুমুল বারী কাওসার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণকে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।
সাইনবোর্ড ভাঙার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আরমা দত্ত বলেন, এটা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানে। তাই এ বাড়িটির জায়গা আমি কী করব, রাখব না বিক্রি করব, এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করব।
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লা শহরের নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ও তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তার ছেলে দিলীপ কুমার দত্তের মেয়ে আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।
আরটিভি/এমএ


