
আধুনিকতার ছোঁয়া লাগার আগে বরেন্দ্রভূমির মেঠোপথগুলো কেমন ছিল? সন্ধ্যা নামলেই চারপাশের খাঁ-খাঁ নীরবতা, বন্যপ্রাণীর ভয় আর ডাকাতের উপদ্রব— এমন এক অনিশ্চিত সময়ে ক্লান্ত পথিকের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটি অনন্য মানবিক উদ্যোগ। প্রায় ১২ যুগ বা ১১৮ বছর ধরে নওগাঁর পোরশার ঐতিহাসিক ‘মুসাফিরখানা’ সেই মানবতার ঐতিহ্যকে পরম যত্নে টিকিয়ে রেখেছে। নিজ সম্পত্তির উপার্জনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আশ্রয় ও খাবারের এমন দৃষ্টান্ত আধুনিক সমাজেও এক বিরল মানবসেবার বার্তা দেয়।
শতবছর আগে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বা দ্রুতগতির যানবাহনের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মেঠোপথ ধরে হেঁটে কিংবা গরুর গাড়িতে চড়ে মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রায় বের হতো। তৎকালীন সময়ে বণিক খাদেম মোহাম্মদ শাহ্ ব্যবসার তাগিদে দূরদূরান্তে ঘুরে বেড়াতেন। ভারতের কলকাতায় প্রথম মুসাফিরখানা দেখে তিনি নিজ জন্মভূমিতেও এমন একটি সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন দেখেন।
তারই ধারাবাহিকতায় ১৯০৮ সালে নওগাঁর পোরশার সদর এলাকার মিনা বাজারে নিজের বাসভবনের পাশে মাটির দেওয়াল ও টিনের চালে চার কক্ষের এক ছোট্ট মুসাফিরখানা গড়ে তোলেন। এই নিঃস্বার্থ সেবা চিরসচল রাখতে তিনি তার ৮০ বিঘা জমি দান করে যান। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে সেই সম্পত্তির অর্জিত আয় থেকেই আধুনিক দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছুই বদলে গেলেও বদলায়নি এই প্রতিষ্ঠানের অতিথিপরায়ণতার চিত্র।
<iframe width="560" height="315" src="https://www.youtube.com/embed/fdF8jnXUml0?si=ctrP8vxc7HTuzna5" title="YouTube video player" frameborder="0" allow="accelerometer; autoplay; clipboard-write; encrypted-media; gyroscope; picture-in-picture; web-share" referrerpolicy="strict-origin-when-cross-origin" allowfullscreen></iframe>
পোরশা উপজেলা সদর বা আশপাশে বাণিজ্যিক কোনো আবাসিক হোটেল না থাকায় দূরদূরান্ত থেকে আসা পথচারী ও ব্যবসায়ীদের একমাত্র আস্থার স্থান এই মুসাফিরখানা। বর্তমানের দ্বিতল এই ভবনটিতে মোট ১৬টি কক্ষ ও একটি বড় হলরুম রয়েছে। যেখানে একসঙ্গে প্রায় ৬০ জন অতিথির থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। এখানে অবস্থান করার ক্ষেত্রে কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই। যেকোনো ধর্ম ও বর্ণের যে কেউ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সর্বোচ্চ তিন দিন পর্যন্ত এখানে থাকতে পারেন। অতিথিদের সার্বিক দেখভালের জন্য একজন ম্যানেজার ও দুজন কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মিত তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও সময়ের পরিবর্তনে নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রতি বুধবার দুপুরে বিনামূল্যে বিশেষ খাবার সরবরাহ করা হয়। এছাড়া প্রতিদিন যারা এখানে রাত যাপন করেন, তাদের খাবার গ্রহণের একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। মুসাফিরখানায় অবস্থানরতরা দুপুরে খেতে চাইলে সকাল ৯টার মধ্যে এবং রাতে খেতে চাইলে বিকেল ৪টার মধ্যে ম্যানেজারকে জানাতে হয়। তবে অতিথিদের নিজেদের বিছানা নিজেদেরই প্রস্তুত করতে হয় এবং পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলোও তাদের নিজ দায়িত্বে দেখাশোনা করতে হয়।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এখানে আগতদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন খাদেম মোসলেম উদ্দিন। প্রতিদিন ছায়া খুঁজে পাওয়া ৬-৭ জন পথিকের থাকার পাশাপাশি দুপুর ও রাতের খাবারের নিয়মও বেশ সুনির্দিষ্ট।
তিনি জানান- যারা থাকেন, নিজেদের বিছানা তাদের নিজেদেরই প্রস্তুত করে নিতে হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলোও তাদেরই দেখভাল করতে হয়। প্রতিদিনই ছয়-সাতজন বিনা খরচে এখানে রাত যাপন করেন। দুপুরে খেতে চাইলে সকাল নয়টা আর রাতে খেতে চাইলে বিকেল চারটার মধ্যে জানাতে হয়।
মুসাফিরখানার প্রতিষ্ঠাতার বংশধর ষাটোর্ধ্ব ফারুকুজ্জামান শাহ বলেন- খাদেম মোহাম্মদ শাহ্ আমার দাদার আপন বাবা। এই মুসাফিরখানায় যে কেউ থাকতে পারে, যেকোনো ধর্মের, যেকোনো বর্ণের। এখানে তিন দিন থাকা ফ্রি। আগে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার দেওয়া হতো, এখন প্রতি বুধবার দুপুরে বিনামূল্যে খাবার খাওয়ানো হয়। এই মুসাফিরখানার সম্পত্তি থেকে যে আয় আসে, সেটা দিয়েই এটি পরিচালিত হয়। অতিথিদের সার্বিক দেখভালের জন্য একজন ম্যানেজার ও দুজন কর্মচারী আছেন।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, তারা ছোটবেলা থেকেই এই মুসাফিরখানা দেখে আসছেন এবং মুরব্বিদের মুখে এর ইতিহাস শুনেছেন। অতীতে বরেন্দ্রভূমির মেঠোপথে গরুর গাড়িতে যাতায়াতের সময় বিপদের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ এখানেই আশ্রয় নিত। দূরদূরান্ত থেকে আসা অতিথিরা জানান, এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভাড়ায় থাকার মতো কোনো আবাসিক হোটেল না থাকায় বিনা খরচে এমন থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সত্যিই কল্পনাতীত। এখানকার মানুষের আন্তরিকতা ও সেবার মান অতিথিদের মুগ্ধ করে।
প্রতিষ্ঠাতা খাদেম মোহাম্মদ শাহ্ আজ আর বেঁচে নেই, তবে তার দূরদর্শী চিন্তায় রোপিত মানবতার বীজটি আজও বরেন্দ্রভূমির বুকে ছায়া দিয়ে চলেছে শত শত ক্লান্ত পথিককে।
আরটিভি/এমএইচজে




