
নিজের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা সাবেক ক্লাব বার্সেলোনার সতীর্থ জেরার্ড পিকেকে বলছিলেন ব্রাজিলিয়ান সেনসেশন নেইমার। বার্সেলোনা ছেড়ে গেলেও স্মৃতিগুলো তাকে পুরনো ক্লাবে ফিরতে বাধ্য করে। তাইতো সেই স্মৃতির টানেই ফিরে আসেন পুরনো ক্লাবে। কথার ফাঁকে ওঠে আসে নিজের অতীত-বর্তমানের অনেক কথাই।
কিছুদিন আগেই বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের ব্যতিক্রমী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন’-এ বার্সেলোনার একসময়ের সতীর্থ জেরার্ড পিকেকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলেন তিনি। খেলার জগতের পেশাদার তারকারা এখানে কলাম লেখা ছাড়াও খোলামনে সাক্ষাৎকার দিয়ে থাকেন। বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলারটি তার সাক্ষাৎকারে সবকিছু খুলে বলেছেন গত বিশ্বকাপের সেই মারাত্মক চোট প্রসঙ্গে।
২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিল-কলম্বিয়ার মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১ গোলের জয়ে ব্রাজিল উঠেছিল সেমিফাইনালে, কিন্তু মাঠের বাইরে রেখে আসতে হয়েছিল দলের প্রাণভোমরা নেইমারকে। কোয়ার্টার ফাইনালের ৮৮ মিনিটে বল দখল করতে গিয়ে ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের পিঠে হাঁটু দিয়ে আঘাত করেছিলেন কলম্বিয়ান উইং-ব্যাক হুয়ান জুনিগা। মাঠে কাতরাতে থাকা নেইমারের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায় ওখানেই। পিএসজি ফরোয়ার্ড সেই চোট নিয়ে মুখ খুললেন এতদিন পর।
মাঠে ব্যথায় কাতরানোর সময় মার্সেলো ‘...ডাক্তার, ডাক্তার’ বলে চিৎকার করছিলেন। নেইমার জানতেন, ডাক্তার এলে ম্যাচের বাকি সময় আর মাঠে থাকতে পারবেন না। ব্রাজিল তখন ম্যাচে ২-১ গোলে এগিয়ে। এদিকে গোল না পাওয়ায় মার্সেলোর কাছে তার আর্তি ছিল, না, না, আমি খেলতে চাই। কিন্তু সতীর্থরা তা শুনবে কেন? পড়িমরি করে মাঠে ছুটে এলেন দলের ডাক্তার। নেইমারকে তার জিজ্ঞাসা, কেমন লাগছে? মাটিতে মুখ গুঁজে ব্রাজিল তারকা তখনো বলে যাচ্ছেন, না, না, আমি খেলা চালিয়ে যেতে চাই।

নেইমার মাঠে থাকতে চাইলেও পা নাড়াতে পারছিলেন না। তার পায়ে কোনো অনুভূতিই ছিল না! মাঠ ছেড়েছিলেন কাঁদতে কাঁদতে। স্টেডিয়ামের মধ্যেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। তখন নেইমারের পা দুটি ভাঁজ করা ছিল। বিছানায় শুয়ে পা দুটি যেই ছাড়ানোর চেষ্টা করলেন, অমনি...। পিকে শেষ করলেন তার অব্যক্ত কথাটা, অবিশ্বাস্য ব্যথা, তাই না? নেইমারের জবাব, হ্যাঁ, অবিশ্বাস্যই। তখন বুঝতে পারলাম, খেলা সম্ভব নয়।
স্টেডিয়ামের হাসপাতাল থেকে নেইমারকে নেয়া হয়েছিল বাইরের এক হাসপাতালে। সেখানে নানা রকম পরীক্ষা শেষে ডাক্তার তাকে যা বলেছিলেন, সেটা তুলে ধরা হলো নেইমারের ভাষায়, আমার জন্য দুটি খবর আছে। একটি ভালো, আরেকটি খারাপ। নেইমার খারাপ খবরটি আগে জানতে চাইলেন। জবাব আসল, বিশ্বকাপ খেলতে পারবে না। তোমার জন্য এটা শেষ হয়ে গেছে। ভালো খবরটি জানতে চাইলে ডাক্তার বলেছিলেন, সুস্থ হয়ে ওঠার পর তুমি হাঁটতে পারবে। তবে আঘাতটা দুই সেন্টিমিটার এদিক-ওদিক হলেই ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেত।
সেই চোটের পর নেইমার কিন্তু হাসপাতালে আর থাকেননি। ফিরেছিলেন দলীয় ক্যাম্পে। সতীর্থ আর দলীয় ডাক্তারের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ শেষে বাড়ি ফিরেছিলেন হেলিকপ্টারে করে। তা ছাড়া উপায় ছিল না, নেইমার তখন হাঁটা দূরে থাক, পা নড়াচড়াও করাতে পারতেন না! বাসায় হুইলচেয়ারে বসে দেখেছিলেন সেমিফাইনাল। পিকে সেই ম্যাচের প্রসঙ্গ তুলতেই নেইমার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘সেমিফাইনাল...সেমিফাইনাল...না...কী, ঘটেছিল ঠিক মনে নেই।’
নেইমার তো বটেই, ব্রাজিলের যেকোনো সমর্থকই ম্যাচটা ভুলে থাকতে চাইবেন। দলের সেরা খেলোয়াড়টিকে ছাড়া সেই ম্যাচে ব্রাজিল জার্মানির কাছে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছিল ৭-১ গোলে। ১৯৫০ বিশ্বকাপে ‘মারাকানাজ্জো’র (মারকানা ট্র্যাজেডি) পর ব্রাজিলিয়ানদের মনে এ ম্যাচটি ‘মিনেইরাজ্জো’ হিসেবে দাগ কেটে আছে। তবে ব্রাজিলের অনেক সমর্থকই আজো মনকে সান্ত্বনা দেন এই ভেবে, নেইমার থাকলে হয়তো ম্যাচটি অন্য রকম হতো!
এএ




