সামাজিক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৫ তরুণ-তরুণীকে ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য দেশের ৪৩২টি যুব সংগঠনকে মোট ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে।
আগামী ১৭ অক্টোবর (শনিবার) সন্ধ্যা ৬টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার এবং নির্বাচিত যুব সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের হাতে অনুদানের প্রতীকী চেক তুলে দেবেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, তরুণদের উদ্যম, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি দিতে এবং সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা যুব সংগঠনগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুবকল্যাণ তহবিলের মাধ্যমে দুটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর একটি হলো স্থায়ীভাবে প্রবর্তিত ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ এবং অন্যটি প্রকল্পভিত্তিক অনুদান কার্যক্রম ২০২৫-২৬।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, সামাজিক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে অসাধারণ অবদান রাখা ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্য থেকে আটটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি ক্যাটাগরিতে দুজন করে মোট ১৬ জনকে পুরস্কার দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও চূড়ান্তভাবে ১৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে।
পুরস্কারের আটটি ক্যাটাগরি হলো- আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ক্রীড়া উন্নয়ন, সমাজসেবা ও জনকল্যাণ, অসহায় ও দুস্থ মানুষের সেবায় অসাধারণ অবদান, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও কারিগরি ক্ষেত্র, নারী ও শিশু উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। এছাড়া কলা ও সংস্কৃতিতে অবদানের বিষয়টিও ক্যাটাগরির তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আমিনুল হক জানান, নির্বাচিত প্রত্যেককে এক লাখ টাকা, একটি আকর্ষণীয় সম্মাননা ক্রেস্ট, পদক ও রাষ্ট্রীয় সনদ দেওয়া হবে। এসব পুরস্কারের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত তরুণদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি দেশের অন্যান্য তরুণকেও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত হতে অনুপ্রাণিত করা হবে।
যুব সংগঠনগুলোর জন্য প্রকল্পভিত্তিক অনুদানের বিষয়ে তিনি বলেন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে দেশের নিবন্ধিত যুব সংগঠনগুলোর জন্য এ কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। এ উদ্যোগের আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত ৪৩২টি যুব সংগঠনকে মোট ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে।
অনুদান বণ্টনের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাধারণ ক্যাটাগরিতে প্রতিটি জেলার নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠনকে এক লাখ টাকা এবং প্রতিটি উপজেলার নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ সংগঠনকে ৭৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। বিশেষ ক্যাটাগরিতে বৃহৎ প্রভাবসম্পন্ন ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংগঠনগুলোকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, তরুণদের সামাজিক উদ্যোগকে টেকসই করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড জোরদার করাই এ অনুদান কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। যুব সংগঠনগুলো আর্থিক সহায়তা পেলে তারা নিজেদের এলাকায় আরও কার্যকরভাবে সামাজিক সমস্যা সমাধান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারবে।
পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
তিনি জানান, গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতীয় দৈনিক সমকাল ও ডেইলি স্টারসহ পত্রিকায় পুরস্কার ও অনুদানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। প্রান্তিক পর্যায়ের তরুণদের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মাধ্যমে মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠানো হয়। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়।
তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসকদের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে আবেদন যাচাই-বাছাই ও সুপারিশের পর চূড়ান্ত নির্বাচন করা হয়েছে। ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ডের জন্য আটটি ক্যাটাগরিতে মোট ৪১৩টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে জেলা পর্যায়ের কমিটি ১৮০টি আবেদন সুপারিশ করে। অন্যদিকে, যুব সংগঠনের প্রকল্পভিত্তিক অনুদানের জন্য সাধারণ ও বিশেষ ক্যাটাগরি মিলিয়ে ১ হাজার ৬০৮টি আবেদন জমা পড়ে।
পরবর্তী সময়ে যুবকল্যাণ তহবিল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের ৫৪তম সভায় মেধা, কাজের প্রভাব ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হয়। এর ভিত্তিতে ১৫ জন তরুণ-তরুণীকে পুরস্কারের জন্য এবং ৪৩২টি যুব সংগঠনকে অনুদানের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
আগামী ১৭ অক্টোবরের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সারাদেশের যুব সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মূল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়কে যুক্ত রাখা হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত তিনটি যুব সংগঠনের প্রতিনিধিদের হাতে অনুদানের প্রতীকী চেক তুলে দেবেন। একই সময়ে জেলা প্রশাসকদের ব্যবস্থাপনায় বাকি ৪২৯টি নির্বাচিত সংগঠনের হাতে জেলাভিত্তিক প্রতীকী চেক দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অনুদানের অর্থ বিতরণে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার বা ইএফটির মাধ্যমে সরাসরি নির্বাচিত সংগঠনগুলোর ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে চেক প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই পুরস্কারের অর্থ সংশ্লিস্ট সংগঠনগুলোর ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিমন্ত্রী গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ ও সামাজিক অবদান জাতির সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু পুরস্কার দেওয়া নয়; বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা তরুণ ও যুব সংগঠনগুলোর সাফল্যের গল্প সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
যুবসমাজের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আত্মকর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির পথ সুগম করতে সরকার এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে চায় বলেও জানান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।
আরটিভি/এসআর