
তৃণমূল পর্যায়ের ক্রিকেট পুনরুজ্জীবিত করা এবং বাংলাদেশের খেলোয়াড় তৈরীর পাইপলাইন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ও ১০টি আঞ্চলিক ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছে আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) দায়িত্ব পালনকালে কোকো যে মডেল চালু করেছিলেন, সেই আদলেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে প্রস্তাাবিত টুর্নামেন্ট ও একাডেমিগুলোর লক্ষ্য হলো তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল উন্নয়নপথ তৈরি করা, যাতে তারা তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটের উচ্চতর পর্যায় এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেতে পারেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকো ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিসিবির গেমস ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার দায়িত্বকালে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটকে শক্তিশালী করা এবং দেশের খেলোয়াড়দের সার্বিক উন্নয়ন এবং খেলোয়ার পাইপলাইন তৈরীতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিসিবির প্রতিভা অন্বেষণ ও খেলোয়াড় তৈরির ধারাবাহিক প্রক্রিয়া গড়ে তুলতেও তিনি ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো ক্রিকেটাররা বাংলাদেশের ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
নিজেও একজন ক্রিকেটার হিসেবে কোকো ক্রিকেটকে আরও পেশাদার রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ক্রিকেটকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ তৈরিতে সহায়তা করেন তিনি।
ক্রিকেট উন্নয়নের বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটারদের দক্ষতা বাড়াতে বিসিবির হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) কর্মসূচি চালু করা হয়। কোকো তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেন। এর অংশ হিসেবে ৬৪ জেলায় কোচ নিয়োগ এবং স্কুল ক্রিকেটের পাশাপাশি নিয়মিত জেলা লিগ আয়োজনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রতিভা অন্বেষণ ও খেলোয়াড় তৈরির ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছিল।
পরবর্তীতে সেই ধারার সুফল পায় বাংলাদেশের ক্রিকেট। বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল ও তাঁর সতীর্থদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ২০১৭ সালের আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
এ সময় বাংলাদেশ একাধিকবার এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলেছে। পাশাপাশি ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপাও জিতেছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট আগের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। ফলে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেট ক্রমেই ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বাইরে ক্রিকেট খেলার সুযোগ কমে যাওয়ায় জাতীয় দলের প্রতিভার গভীরতা এবং প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের মানসম্পন্ন বিকল্প তৈরি করার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
তিন সংস্করণের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের তুলনামূলকভাবে অল্প কয়েকজন ক্রিকেটারের ওপর নির্ভরশীলতার প্রভাব স্পষ্ট।
অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও ভারতের মতো শীর্ষ ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর দলে বিকল্প খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে একই সময়ে সূচি থাকলেও তারা টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য আলাদা দল মাঠে নামাতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ প্রায়ই তিন সংস্করণে পাঁচ-ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে। এতে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ পড়ে, বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, চোটের ঝুঁকি বাড়ে এবং দলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
বিসিবি পরিচালক ও আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সমন্বয়ক শরফরাজ আহমেদ মনে করেন, জাতীয় দল নির্বাচনের জন্য খেলোয়াড়ের সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে কোকোর উন্নয়ন মডেল এসব সমস্যা সমাধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
শরফরাজ বলেন, আমরা বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা দেয়া সত্বেও গত ১৭ বছরে আমাদের ট্রাস্টের মাধ্যমে ক্রিকেট নিয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, ট্রাস্টের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো দেশব্যাপী একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আয়োজন এবং আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা। বিসিবির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব উদ্যোগের লক্ষ্য উদীয়মান খেলোয়াড়দের দক্ষতা বিকাশের আরও বেশি সুযোগ তৈরি করা।
প্রস্তাবিত টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টটি ১০টি আঞ্চলিক পর্বে আয়োজন করা হবে। এতে দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি ফরিদপুর ও কুমিল্লাকে পৃথক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রতিটি অঞ্চলের চ্যাম্পিয়ন দল ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। সেখানে সেমিফাইনাল ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।
শরফরাজ বলেন, আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক ক্রিকেটার রয়েছেন, যারা খেলার সুযোগ পান না। এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে তারা ভালো মানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এই প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়দের জন্য নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণিভিত্তিক বিধিনিষেধ থাকবে না। জাতীয় দল, প্রিমিয়ার লিগ, প্রথম বিভাগ ও অন্যান্য পর্যায়ের ক্রিকেটাররা টুর্নামেন্ট চলাকালে তাঁদের প্রাপ্যতা সাপেক্ষে অংশ নিতে পারবেন।
অন্তর্ভুক্ত জেলার সংখ্যা বিবেচনায় রাখা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সহজ করার লক্ষ্যে ১০টি আঞ্চলিক পর্বের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
শরফরাজ জানান, বিসিবির জন্য বৃহত্তর প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের ভান্ডার গড়ে তোলাই হবে এ উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। পুরো প্রতিযোগিতাটি ট্রাস্টের উদ্যোগেই আয়োজন করা হবে।
তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণভাবে আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। এর আয়োজক আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাস্ট।
টুর্নামেন্টের পাশাপাশি উদীয়মান ক্রিকেটারদের জন্য পরিকল্পিত কোচিং ও উন্নত প্রশিক্ষণসুবিধা নিশ্চিত করতে ১০টি ক্রিকেট একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে ট্রাস্টের।
শরফরাজ বলেন, দেশে আটটি বিভাগে আমাদের ১০টি আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। এসব অঞ্চলের উদীয়মান ক্রিকেটারদের বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা দিতে আমরা ১০টি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
কোকোর সময় গড়ে ওঠা ক্রিকেট উন্নয়ন-দর্শন পুনরুজ্জীবিত করা এবং ঢাকা ও জেলাগুলোর মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কমানোর উচ্চাকাঙ্খা থেকেই ট্রাস্টের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ধারাবাহিক কোচিং, নিয়মিত প্রতিযোগিতা এবং উদীয়মান ক্রিকেটারদের উন্নতির সুস্পষ্ট সুযোগ তৈরির ওপর।
সূত্র: বাসস
আরটিভি/এসকে




