আকাশে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে ইউরোপের প্রথম ষষ্ঠ প্রজন্মের বিমান বাহিনী গড়ার লক্ষ্যে এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাজ্য। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বিএই সিস্টেমস আন্তর্জাতিক এয়ারশোতে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেছে তাদের নতুন কোলাবোরেটিভ কমব্যাট এয়ারক্রাফট বা লয়াল উইংম্যান ড্রোন ব্রন্টান্যাক্স। প্রাচীন গ্রীক ভাষায় এই নামের অর্থ বজ্ররাজ।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সম্প্রতি ঘোষিত ‘স্টর্ম ফাইটার’ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে এই ড্রোনটি সামনে আনা হলো। নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের উপস্থিতিতে প্রদর্শিত ড্রোনটি কেবল কোনো প্রাথমিক ধারণা নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রোটোটাইপ। এটি ল্যাঙ্কাশায়ারের ওয়ার্টনে বিএই সিস্টেমসের নিজস্ব কারখানায় সম্পূর্ণ গোপনে তৈরি করা হয়েছে।
ব্রন্টান্যাক্স ড্রোনটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪১ ফুট এবং এর ডানার বিস্তার ৩৩ ফুট—যা আকারে বিএই সিস্টেমসের বিখ্যাত ‘হক’ অ্যাডভান্সড ট্রেইনার জেটের সমান। ড্রোনটির বাহ্যিক নকশায় উচ্চমানের স্টিলথ (Stealth) প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে রয়েছে চ্যাপ্টা ফিউজেলেজ, ট্র্যাপিজয়েডাল ডানা এবং কম-দৃশ্যমান বা 'লো-অবজারভেবল' (LO) এয়ার ইনটেক।
ফিউজেলেজের গভীরতা নির্দেশ করে যে, ড্রোনটির ভেতরে পর্যাপ্ত জ্বালানি ও শক্তিশালী অস্ত্র বহনের জায়গা রয়েছে। এর শক্তিশালী ল্যান্ডিং গিয়ার দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোনটি সাধারণ রানওয়ের পাশাপাশি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার (যুদ্ধজাহাজ) থেকেও পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
ড্রোনটি প্রাথমিকভাবে উইলিয়ামস টার্বোফ্যান ইঞ্জিনে চালিত হলেও পরবর্তীতে রোলস-রয়েসের ‘অরফিয়াস’ ইঞ্জিন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি এখনই ড্রোনটির স্বায়ত্তশাসন প্রযুক্তির বিশদ বিবরণ প্রকাশ করেনি।
মিশনের দিক থেকে ব্রন্টান্যাক্স মূলত তিনটি প্রধান কাজ করবে:
১. ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার (EW)
২. নিখুঁত হামলা (Precision Strike)
৩. আকাশ থেকে আকাশে যুদ্ধ (Air-to-Air Combat)
এটি বিমান বাহিনীর টাইফুন (Typhoon), এফ-৩৫ এবং ভবিষ্যতের ‘টেমপেস্ট’ ফাইটার জেটের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে। যুদ্ধক্ষেত্রে পাইলটদের নিরাপত্তায় এটি 'গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল' ও আক্রমণকারী হিসেবে কাজ করবে। এমনকি ড্রোনটি মাটির মিশন কমান্ডার দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।
একটি আধুনিক টাইফুন ফাইটার জেটের আনুমানিক মূল্য ১১৫ মিলিয়ন ডলার হলেও, ব্রন্টান্যাক্সের নির্মাণ খরচ হবে তার চার ভাগের এক ভাগ (প্রায় ২৮.৫ মিলিয়ন ডলার)। ফলে কম খরচে অধিক শক্তিমত্তা বা ‘কমব্যাট মাস’ তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিএই সিস্টেমসের নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি এই প্রজেক্টটি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করবে। তবে বাজার দখলের ক্ষেত্রে বিএই সিস্টেমসকে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং (MQ-28 Ghost Bat), জেনারেল অ্যাটমিক্স বা নর্থ্রপ গ্রুম্যানের মতো পরাশক্তিগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে।
যুক্তরাজ্য সরকার ইতিমধ্যে এই সিসিএ প্রোগ্রামে ৪০৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে। আগামী বছরই ইউকে-র আকাশে ড্রোনটির প্রথম উড্ডয়ন (Flight Test) হতে পারে এবং এটি ন্যাটোর কোনো সামরিক মহড়াতেও অংশ নিতে পারে।
রয়্যাল এয়ার ফোর্সের প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল স্যার হার্ভ স্মিথ বলেন, মানবসংচালিত বিমানের সাথে চালকমুক্ত আকাশযানের নিখুঁত সমন্বয় আমাদের যুদ্ধক্ষমতা ও প্রথাগত প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
সব মিলিয়ে, ব্রন্টান্যাক্স ড্রোনের আগমন আধুনিক আকাশযুদ্ধে যুক্তরাজ্যের শক্ত অবস্থানেরই স্পষ্ট বার্তা দেয়।
সূত্র: দ্য টিএমজি নিউজলেটার
আরটিভি/এসএস



