
কবিতা, সাহিত্য এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্য বিনিময়ে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানজনক ‘সার্ক–ফোসওয়াল আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ২০২৬’ (SAARC–FOSWAL Lifetime Achievement Award 2026)-এ ভূষিত হয়েছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক নূরুল হক।
২০২৬ সালের ১৫ নভেম্বর ‘ফাউন্ডেশন অফ সার্ক রাইটার্স অ্যান্ড লিটারেচার’ (FOSWAL)-এর উদ্যোগে নয়া দিল্লিতে আয়োজিত সার্ক সাহিত্য উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্য ও সংস্কৃতির বন্ধন সুদৃঢ়করণে ভূমিকা রাখার জন্য নির্বাচিত যে ছয়জন বিশিষ্ট সাহিত্যিককে এই মর্যাদাপূর্ণ আজীবন সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, নূরুল হক তাদের অন্যতম। এই তালিকার অন্য সম্মানিত সাহিত্যিকেরা হলেন— ভুটানের কুঞ্জাং চোডেন; ভারতের আলোক ভল্লা, অমরেন্দ্র খাটুয়া ও সুরেশ গোয়েল এবং নেপালের কেশব সিগদেল। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক সম্পর্ক জোরদারে তাদের নিরলস পথচলাকে এই পুরস্কারের মাধ্যমে সম্মানিত করা হলো।
এ পুরস্কার-এর জন্য আরও যারা মনোনীত— ভারতের দেও প্রকাশ চৌধুরী, শেহপার রসুল, রাওয়েল সিং, কবিতা সিঙ্ঘল, অনামিকা ও বনিতা; শ্রীলঙ্কার কুমার হেত্তিআরাচ্চি এবং নেপালের রাম দয়াল রাকেশ।
৩ দশকের সাহিত্য সাধনা ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি
১৯৬৫ সালে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণকারী কবি নূরুল হক তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে লিখে যাচ্ছেন। তার লেখায় ফুটে উঠেছে মানবতা, শান্তি, প্রেম, প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং মানুষের অস্তিত্বের নানা জটিল সমীকরণ। কবিতার নিজস্ব শক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বাঁধার একটি নিরন্তর প্রয়াস তার পুরো সাহিত্যজীবনেই পরিলক্ষিত হয়।
তার উল্লেখযোগ্য বাংলা কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— ঝরা পাতার শোকগাথা, নিশীথের পদাবলী এবং দগ্ধবতী জলের নদী। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পাঠকসমাজের জন্য ইংরেজিতে প্রকাশিত তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে— পেইন অব ইনোসেন্স (Pain of Innocence), হোয়াট ডু ইউ নিড (What Do You Need) এবং অ্যান এলিজি অব ফলেন লিভস (An Elegy of Fallen Leaves)। এসব রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
আন্তর্জাতিক সাহিত্য বিনিময় ও সম্পাদনা
নিজের মৌলিক লেখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক সহযোগিতায় অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন কবি নূরুল হক। বিভিন্ন দেশের কবিদের নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সাময়িকী ও সংকলন সম্পাদনায় তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালে বিশ্ব সাহিত্যের বৈচিত্র্যময় কণ্ঠস্বরগুলোকে একত্র করে তিনি সম্পাদনা করেন ‘ওডিসি ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্থলজি অব ওয়ার্ল্ড পোয়েটস’। এ ছাড়া ‘ওডিসি এশিয়া’-র সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলাদেশ ও বিদেশের লেখকদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সাহিত্যভিত্তিক আলোচনা প্রসারে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর আগেও একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে কাজাখস্তানের ‘ওয়ার্ল্ড নেশনস রাইটার্স ইউনিয়ন’ তাকে ‘ওয়ার্ল্ড লরিয়েট ইন লিটারেচার’ হিসেবে ভূষিত করে, যা ছিল তার সাহিত্য যাত্রার অন্যতম প্রধান একটি মাইলফলক।
সার্ক–ফোসওয়াল আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ২০২৬ নূরুল হকের সুদীর্ঘ সাহিত্য চর্চা ও সাংস্কৃতিক পরিক্রমার এক উজ্জ্বল স্বীকৃতি। তার এই অর্জন বাংলাদেশের সাহিত্য সমাজের জন্য চরম গৌরব বয়ে আনার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার সমৃদ্ধ সাহিত্য ঐতিহ্যে বাংলাদেশের জোরালো উপস্থিতি আবারও প্রমাণ করল। সীমান্ত ও ভাষার বাধা পেরিয়ে সাহিত্যকে যে সেতু হিসেবে ব্যবহার করা যায়, কবি নূরুল হকের আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও সাধনা তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আরটিভি/এমএম




