
বাংলা কবিতার ইতিহাসে মোহাম্মদ রফিক এক অনন্য নাম। তার কবিতা যেমন মানুষের অনুভূতি ও জীবনসংগ্রামের কথা বলেছে, তেমনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও জুগিয়েছে সাহস ও প্রেরণা। তার লেখা ‘খোলা কবিতা’র কয়েকটি পঙ্ক্তি একসময় ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে লেখা এই কবিতা কাঁপিয়ে দিয়েছিল শাসকের ভিত। কবিতাটি লেখার কারণে সেনাবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
আজ ২৩ অক্টোবর কবি মোহাম্মদ রফিকের জন্মদিন। ১৯৪৩ সালের এই দিনে বাগেরহাটের বৈটপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ২০২৩ সালের ৬ আগস্ট ৮০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। কবিতা, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন।
‘সব শালা কবি হবে’—যে পঙ্ক্তিতে তোলপাড়
‘সব শালা কবি হবে, পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই,
দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।’

মোহাম্মদ রফিকের ‘খোলা কবিতা’র এই পঙ্ক্তিগুলো আশির দশকে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তখন দেশে সামরিক শাসন চলছে। ক্ষমতায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার শাসনামলে মাঝেমধ্যেই ছাত্র-জনতা আন্দোলনে ফুঁসে উঠছিল। অন্যদিকে, ক্ষমতায় বসার পর এরশাদ কবি হিসেবেও পরিচিতি পেতে শুরু করেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে তার কবিতা।
সে সময় কানাঘুষা ছিল, এরশাদের নামে প্রকাশিত কবিতাগুলোর সব কটির রচয়িতা তিনি নন। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল। এই পরিস্থিতিতে মোহাম্মদ রফিক সরাসরি প্রতিবাদ করেন কবিতার মাধ্যমে।
১৯৮৩ সালের জুন মাসের এক রাতে এক বসাতেই তিনি লেখেন ‘খোলা কবিতা’। ২০১৯ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কবি জানিয়েছিলেন, একজন সামরিক শাসক লেখালেখির সঙ্গে আগে যুক্ত না থেকেও ক্ষমতার জোরে কবিখ্যাতি অর্জন করছেন—এ বিষয়টি তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল। তার ভাষায়, মনে হচ্ছিল, একজন ‘ভুঁইফোড় জেনারেল’ এসে তাদের কবিতার অপমান করছেন।
কবিতাটি ছাপাতে সাহস পাচ্ছিলেন না কেউ
‘খোলা কবিতা’ ছিল প্রায় ১৬ পৃষ্ঠার দীর্ঘ একটি কবিতা। সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে লেখা হওয়ায় এটি প্রকাশ করা নিয়ে তৈরি হয় বড় সমস্যা। তখনকার পরিস্থিতিতে কবিতাটি ছাপানোর সাহস পাচ্ছিলেন না প্রকাশকেরা।
শেষ পর্যন্ত কবির কয়েকজন ছাত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষীর উদ্যোগে গোপনে ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়। ছাপাখানায় নিউজপ্রিন্টে এক ফর্মায় ছাপানো কবিতাটি তার ছাত্রছাত্রীরা হাতে হাতে বিলি করতে থাকেন। নিষিদ্ধ ইশতেহারের মতো কবিতাটি ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
কবিতাটি এরশাদকে উদ্দেশ করে লেখা হলেও পরে মোহাম্মদ রফিক জানিয়েছিলেন, এটি শুধু একজন শাসককে নিয়ে লেখা কবিতা নয়। তার কাছে এরশাদের সামরিক আইন জারি ছিল একটি ঘটনা। সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার জোরে কবিখ্যাতি অর্জনের প্রবণতার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
কবিতার জন্য সেনা দপ্তরে তলব
‘খোলা কবিতা’ ছড়িয়ে পড়ার পর নড়েচড়ে বসে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। একপর্যায়ে মোহাম্মদ রফিককে সাভারে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের দপ্তরে ডেকে নেওয়া হয়। এর আগে মামলা মাথায় নিয়ে তিন দিন হাজারীবাগে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি।
সেনা দপ্তরে তিনজন কর্মকর্তার মুখোমুখি হতে হয় কবিকে। তারা প্রথমেই জানতে চান, কবিতাটি তার লেখা কি না। মোহাম্মদ রফিক নিজের লেখা বলে স্বীকার করেন। তবে কবিতাটি কে ছাপিয়েছেন, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ, প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকে বিপদে ফেলতে চাননি তিনি।
তার এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, নিজের লেখা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের দায় নিতে তিনি পিছপা হননি; একই সঙ্গে সহযোগীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছেন।
‘খোলা কবিতা’ থেকে আন্দোলনের স্লোগান
প্রথমে গোপনে ছড়িয়ে পড়লেও পরে ‘খোলা কবিতা’ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালের অমর একুশে বইমেলায় কবিতাটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। বই করার সময় কবি কবিতাটি আরও বড় করেন। এক ফর্মার কবিতা তখন চার ফর্মার বইয়ে রূপ নেয়।
বইটি প্রকাশের কাজে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন দিলওয়ার হোসেন। তার স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি গোপীবাগের সুবর্ণ প্রিন্টার্সে রাত জেগে বইটির মুদ্রণ-প্রস্তুতির কাজ করা হয়। ছাপাখানার মালিক মজিবর রহমান কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সব বাধা পেরিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি বইটি মেলায় নিয়ে আসতে পেরেছিলেন মোহাম্মদ রফিক ও দিলওয়ার হোসেন।
পরবর্তী সময়ে বইটি পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলে। ‘খোলা কবিতা’র পঙ্ক্তিগুলো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অনেকটা স্লোগানের মতো ব্যবহৃত হতে থাকে। একটি কবিতা কীভাবে শাসকের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে, তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে আছে এই রচনা।
ছাত্র আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ
মোহাম্মদ রফিকের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর বাগেরহাট জেলার বৈটপুর গ্রামে। তার বাবা সামছুদ্দীন আহমদ এবং মা রেশাতুন নাহার। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। শৈশব কেটেছে বাগেরহাটে।
১৯৫৮ সালে খুলনা জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকার নটরডেম কলেজে ভর্তি হন। পরে ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করেন। স্নাতক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা তার সাহিত্যিক চিন্তায় প্রভাব ফেলেছিল।
কৈশোরে কৃষ্ণা নামের এক মেয়ের প্রতি ভালো লাগা থেকে অষ্টম শ্রেণিতে প্রথম কবিতা লেখেন তিনি। তবে প্রথম যৌবনে কবিতার পাশাপাশি রাজনীতিও তাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এ সময় তাকে কারাগারেও যেতে হয়। সামরিক আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল বলে তার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে। পরে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য তিনি মুক্তি পান।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন মোহাম্মদ রফিক। প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের কর্মকর্তা হিসেবে এবং পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করেন। দেশের স্বাধীনতা এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল।
‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ দিয়ে কাব্যজগতে যাত্রা
ষাটের দশকের শুরুতে সমকাল, কণ্ঠস্বর, স্বাক্ষর ও অচিরার মতো সাহিত্যপত্রে কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন মোহাম্মদ রফিক। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বৈশাখী পূর্ণিমা’ প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধুলার সংসারে এই মাটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে।
তার কবিতায় গ্রামবাংলার প্রকৃতি, নদী, মানুষের জীবনসংগ্রাম ও আধুনিক মননশীলতার প্রকাশ ঘটেছে। শহরের বাইরে গ্রামীণ জীবনকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার কবিতায় বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে। গাওদিয়া তার বহুলপঠিত কাব্যগ্রন্থগুলোর একটি।
তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে কীর্তিনাশা, খোলা কবিতা, কপিলা, গাওদিয়া, স্বদেশী নিশ্বাস তুমিময়, মেঘে ও কাদায়, রূপকথা কিংবদন্তি, মৎস্যগন্ধা, মাতিকিসকু, বিষখালি সন্ধ্যা, কালাপানি, নোনাঝাউ, দোমাটির মুখ ও ত্রয়ী। এছাড়া তার নির্বাচিত কবিতা এবং দুই খণ্ডে মোহাম্মদ রফিক রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে।
কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লিখেছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে আত্মরক্ষার প্রতিবেদন, স্মৃতি বিস্মৃতির অন্তরাল, ভালোবাসার জীবনানন্দ, দূরের দেশ নয় আইওয়া, খুচরো গদ্য ছেঁড়া কথা ও গল্প সংগ্রহ।
শিক্ষকতা ও পুরস্কার
মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন মোহাম্মদ রফিক। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে যোগ দেন। দীর্ঘদিন শিক্ষকতার পর ২০০৯ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেন তিনি।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮১ সালে আলাওল পুরস্কার এবং ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ২০১০ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া তার সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছে।
২০২৩ সালের ৬ আগস্ট বরিশাল থেকে ঢাকায় ফেরার পথে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
মোহাম্মদ রফিকের জীবন ও সাহিত্যকর্মের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তিনি শুধু কবিতার ভাষায় প্রকৃতি ও মানুষের কথা বলেননি; অন্যায় ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছেন। ‘খোলা কবিতা’ তার সেই সাহসী অবস্থানের স্মারক হয়ে আছে। তার কবিতার পঙ্ক্তি আজও মনে করিয়ে দেয়, সাহিত্য কখনো কখনো প্রতিবাদের শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
আরটিভি/জেএমএ


