
বিশ্বের জলবায়ু বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বায়ুদূষণ। দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণের কবলে বাংলাদেশের মেগাসিটি ঢাকাও। সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় নিয়মিতই উপরের দিকে অবস্থান করছে শহরটি।
আজ বুধবারও (১১ ফেব্রুয়ারি) এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এদিন বেলা সোয়া ১১টার দিকে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক বায়ুমান বিষয় ওয়েবসাইট আইকিউএয়ারে বিশ্বের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে দেখা গেছে ঢাকার নাম।
এ সময়ে শহরটির একিউআই (ইয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) স্কোর ছিল ২৬৭। এই বায়ুমান ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বলে বিবেচিত। একই সময়ে বচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষে ছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লি। শহরটির বায়ুমান স্কোর এ সময়ে ছিল ৩৪০, যা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বা ‘বিপর্যয়কর’ বলে বিবেচিত।
এদিকে বায়ুদূষণে বিশ্বের শহরগুলোর তালিকায় আজ তৃতীয় স্থানে রয়েছে আরেক প্রতিবেশী দেশ নেপালের কাঠমুন্ডু, যার স্কোর ১৯১। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ভারতের আরেক শহর কলকাতা; বায়ুমান স্কোর ১৮৮। আর পঞ্চম স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের করাচি, যার বায়ুমান স্কোর ১৮১।
এদিকে, ঢাকার আশেপাশের তিন অঞ্চলের বায়ুমান আজ দেখা গেছে খুবই উদ্বেগজনক। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা টঙ্গীর। ঢাকার সঙ্গে লাগোয়া এই অঞ্চলটির একিউআই স্কোর ৪২৬। অন্যদিকে গাজীপুরের বায়ুমান স্কোর ৩৯৪ এবং সাভারের বায়ুমান স্কোর ৩৪৩। আইকিউএয়ারের সূচক অনুযায়ী, এই তিন অঞ্চলের বায়ুমানই আজ ‘দুর্যোগপূর্ণ’।
একটি শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, তার লাইভ বা তাৎক্ষণিক সূচক জানিয়ে থাকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ার। প্রতিষ্ঠানটির মানদণ্ড অনুযায়ী, স্কোর শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মান ভালো বলে বিবেচিত হয়।
আর ৫১ থেকে ১০০ হলে মাঝারি বা সহনীয় ধরা হয় বায়ুর মান। ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয় ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর। ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়। স্কোর ২০১ থেকে ৩০০ হলে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বলে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ৩০১-এর বেশি হলে তা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হয়।
উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ এক মারাত্মক সমস্যা। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই বায়ুদূষণের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং দিন দিন এ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো আরও বেড়েই চলছে।
বায়ুদূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। ধুলাবালি নাক-মুখ দিয়ে শ্বাসতন্ত্রে আক্রান্ত করে বেশি। প্রথমেই চোখ-নাক আক্রান্ত হওয়ার ফলে চোখ লাল হয়, পানি ঝরে, এলার্জি হয়।
নাকে প্রবেশ করে নাক বন্ধ হওয়া, নাকে পানি, অনবরত হাঁচি, নাকে এলার্জি বা রাইনাইটিস, সাইনোসাইটিস এমনকি নাকে রক্তক্ষরণও হতে পারে। মুখে প্রবেশ করলে টনসিল, ফ্যারিংস, ল্যারিংসে প্রদাহ হয়ে কাশিসহ গলার স্বর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বায়ুদূষণে এলার্জি, সোরিয়াসিসসহ বিভিন্ন চর্ম রোগের জন্য হতে পারে মারাত্মক। শ্বাসনালি ও ফুসফুসে আক্রান্তের ফলে সাধারণ কাশি, অ্যাজমা বা হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, এমফাইসিমা, সিওপিডি, নিউমোনিয়াসহ অন্য ভাইরাল ইনফেকশনের প্রকোপ বাড়তে পারে। এভাবে দীর্ঘদিন দূষিত বায়ুর গ্রহণের প্রভাবে ফুসফুসের ক্যানসারসহ অন্য রোগ যেমন-হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, মস্তিষ্ক, লিভার ও কিডনিসহ অন্য অঙ্গের রোগ হতে পারে।
বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন বয়স্ক, শিশু ও জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষরা। সবচেয়ে ক্ষতি হয় শিশুদের, বায়ুতে অতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি শিশুদের মানসিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যাহত হয় এবং স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে। শিশুর রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এখন বায়ুদূষণ।
বিশ্বে এ বয়সে যত শিশুর মৃত্যু হয়, তার এক চতুর্থাংশের বেশির জন্য দায়ী বায়ুদূষণ। গর্ভবতী মহিলাদের শারীরিক ক্ষতি, গর্ভের সন্তানের ওজন কম হওয়া ও অকাল প্রসব, জন্মগত ত্রুটি, মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়ে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হওয়ার মতো ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ছাড়া বায়ুতে সিসার পরিমাণ বেশি থাকলে স্নায়ুতন্ত্রের রোগ, পেটের পীড়াসহ রক্তশূন্যতার মতো জটিল রোগের আশঙ্কা বেশি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিবছর বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে মৃত্যু হয় প্রায় ৭০ লাখ মানুষের। এসব মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো স্ট্রোক, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, সিওপিডি, ফুসফুসের ক্যানসার এবং শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ। এর মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বায়ুদূষণ প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ৫২ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ। প্রতিবছর প্রায় ৩২ লাখ মানুষ রান্নাবান্না ও গৃহস্থালিজনিত বায়ুদূষণের শিকার হয়ে মারা যায়।
আরটিভি/এসএইচএম



