
বিমান বাহিনীর চাকরিচ্যুত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। চার দিনের রিমান্ডে থাকা তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বান্ধবীর সঙ্গে বিরোধের পর হেরোইন সেবনের উদ্দেশ্যে টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যান তাহসিফ। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় নদীতে পড়ে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
তবে তাহসিফকে নদীতে পড়ে যেতে দেখেননি বলে দাবি করেছেন দীপ। ফলে তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে দীপকে মাঠ থেকে একা বের হতে দেখা যায়। এর ১৫ মিনিট পর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে বলেন, ‘রওনা হয়েছি।’ এরপর ঠিক কী ঘটেছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
দীপের জবানবন্দি অনুযায়ী, তাহসিফের বান্ধবী কিছুদিন আগে অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে ওই যুবকের সঙ্গে তার শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে গত ২৭ অক্টোবর মেয়েটিকে ফোন করে দেখা করতে বলেন তাহসিফ।
পরে তাকে নিয়ে উত্তরার সোনারগাঁ জনপথ সড়কের নেস্ট বারে যান তিনি। সেখানে তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে স্যাড সং বাজানোর অনুরোধ করেন। এরপর ওয়েটাররা তাদের মদ পরিবেশন করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা তারা মদ পান করেন। এ সময় দীপও তাদের সঙ্গে ছিলেন।
মদ্যপানের একপর্যায়ে অন্য যুবকের সঙ্গে ইয়াবা সেবন ও রাত কাটানোর বিষয়টি নিয়ে বান্ধবীকে প্রশ্ন করেন তাহসিফ। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ বলেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় মাদক (হেরোইন) খাব।’
এরপর তিনজনই বার থেকে বের হয়ে যান। তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে বান্ধবীকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তার বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান। তাদের বাসা সামনাসামনি বলে জানিয়েছেন তিনি।
দীপের দাবি, বান্ধবীকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তিনি ও তাহসিফ নিজ নিজ মোটরসাইকেলে টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে বস্তির কাছের একটি দোকানের সামনে মোটরসাইকেল রেখে গলি দিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন তারা।
দীপের ভাষ্য, মাঠে তখন অনেক লোকজন ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারি। সেখানে গিয়ে তাহসিফ হেরোইন কিনে সেবন করেন। বারে মদ্যপানের পর আবার মাদক সেবন করায় তিনি নিজের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
কিছুক্ষণ পর টহল পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালাতে শুরু করেন। দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান।
দীপ জানান, তিনি নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন। দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরেন। নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসার ঠিকানা জানান।
পুলিশ সদস্যরা তাকে প্রশ্ন করেন, মোহাম্মদপুরে বাসা হলে এত রাতে সেখানে কেন এসেছেন। জবাবে দীপ জানান, তিনি ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু এবং একটি কাজে সেখানে এসেছেন। পরে পুলিশ তাকে বাসায় চলে যেতে বলে।
দীপের দাবি, এরপর তাহসিফের ফোনে একাধিকবার কল করলেও প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান তিনি। পরে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন।
ঘটনার রাতের টঙ্গী মাজার বস্তির একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে মোটরসাইকেল পার্ক করে একটি গলি দিয়ে তুরাগ তীরের মাঠের দিকে যেতে দেখা যায়। এ সময় তিন নারী তাদের যেতে নিষেধ করেন। তারা বলেন, ‘এই, তোমরা চলে যাও।’
তখন তাহসিফ ইংরেজিতে দীপকে বলেন, ‘বেশি কথা বলো না, হাঁটো।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তাহসিফের মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ঘটনাটি হত্যাকাণ্ডের চেয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তার ধারণা, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অন্যদের সঙ্গে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করার সময় তাহসিফও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যেতে পারেন। তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
তিনি জানান, দীপ ও তার বান্ধবী দুজনই রিমান্ডে রয়েছেন। তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দীপের বক্তব্যের সঙ্গে মেয়েটির বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তাহসিফের সঙ্গে ওই নারীর পরিচয়, সম্পর্ক, ঘটনার দিন নেস্ট বারে কী ঘটেছিল এবং তাদের মধ্যে কী কথোপকথন হয়েছিল, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন জানান, তাহসিফ মাদক সেবন করেছিলেন কি না কিংবা তার শরীরে কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে জানা যাবে।
এ জন্য তার রক্ত, পাকস্থলী, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা ও রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আরটিভি/এসকে


