
বাংলাদেশের উপকূলের জেলেরা যখন ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে নামেন, তখন তাদের চোখে থাকে রোজগারের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ ধ্বংস করছে অবৈধ জালের ভয়ঙ্কর বিস্তার। বাহারি নামের অবৈধ জালের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি মাছের পোনা ধ্বংস হচ্ছে। কেবল মাছই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমুদ্রের জীবনবৈচিত্র্য ও সম্ভাবনাময় মৎস্য অর্থনীতি।
উপকূলীয় অঞ্চল কুয়াকাটা, মহিপুর ও আলীপুরে দেখা যায়, মৎস্য অধিদপ্তরের নিষিদ্ধ ঘোষিত জাল প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে।
_20250930_132140028.jpg)
স্থানীয়রা জানান, সরকারি নিষিদ্ধ জাল প্রকাশ্যে বিক্রি হয়, কিন্তু অভিযান এবং তদারকি নেই। ফলে এই বাজারগুলো পরিণত হয়েছে অবৈধ জালের মূল কেন্দ্র।
সরেজমিনে দেখা যায়, দোকান ও গুদামে স্তুপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম ফাঁসযুক্ত জাল। বেশিরভাগই চিংড়ি ও পোনা মাছ ধরার কাজে ব্যবহার হয়। এসব জাল ২০১১ সালে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও স্থানীয়ভাবে বিক্রি অব্যাহত আছে। স্থানীয় জেলেরা জানাচ্ছেন, ছোট ফাঁসের জাল ছাড়া বাজারে মাছ পাওয়া যায় না। বড় ট্রলার ছাড়া কম মূলধনে বেহুন্দি, গড়াজাল বা বেড়জাল ব্যবহার করে তারা মাছ ধরে।
_20250930_132214384.jpg)
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বেহুন্দি জাল, গড়াজাল, বেড়জাল সমুদ্রের মাছের উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। এই জালের কারণে প্রতিদিন কোটি কোটি পোনা নিধন হচ্ছে, সমুদ্রজীবনের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, আর সৎ জেলেরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
জালের উৎপাদন ও সরবরাহ চক্রও গোপন নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালের কিছু ফ্যাক্টরি থেকে গোপনে জাল তৈরি করে ট্রাকযোগে মহিপুর-আলীপুর এলাকায় আনা হয়। পাইকাররা তা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করেন এবং কিছু সরাসরি ট্রলার মালিকের গুদামে চলে যায়। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় এই চক্র টিকে আছে।
_20250930_132233143.jpg)
দোকানিরা জানাচ্ছেন, ট্রলিং ট্রলারে ব্যবহৃত আধুনিক বেহুন্দি জাল প্রতি কেজি ১৪৫০-১৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। কালো কট সূতার লম্বাজাল ৪৬০-৫০০ টাকা কেজি, লাল কট সূতার জাল ৪৫০-৪৭০ টাকা কেজি এবং সাদা সূতার জাল ৩৫০-৩৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। গড়াজাল, বেড়জাল ও অন্যান্য জালের দাম প্রতি কেজি ৩৫০-৪০০ টাকা।
_20250930_132515030.jpg)
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এসব জাল সমুদ্র থেকে কোটি কোটি পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ ধ্বংস করছে। ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে এবং দেশের মৎস্য উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
_20250930_132444881.jpg)
ওয়ার্ল্ডফিসের গবেষণা সহকারী বখতিয়ার রহমান বলেন, নিষিদ্ধ জাল শুধু মাছ নয়, সমুদ্রের ভবিষ্যৎও ধ্বংস করছে। প্রতিদিন অভিযান চালিয়ে এই জাল ধ্বংস করতে হবে। উপকূলের হাট যেন ‘জালের রাজধানী’ না হয়ে ওঠে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, যতক্ষণ জাল মাছ ধরার উপযোগী না হয়, ততক্ষণ অভিযান চালানো যায় না। তবে কারেন্ট জাল, বুচনা, আটন ও চায়না দুয়ারি জাল থাকলে অভিযান চালানো হয়। চলতি বছর আমরা ৪৮০ পিস জাল পুড়ে ধ্বংস করেছি। অভিযান অব্যাহত থাকবে।
আরটিভি/এমকে/এস




