ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

থামছেই না মেঘনার ভাঙন, নিঃস্বদের ঠাঁই বেড়িবাঁধে

হাতিয়া প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম
হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নের ভূমিহীন বাজার থেকে তোলা। ছবি: আরটিভি

বছরের পর বছর মেঘনার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে নোয়াখালীর হাতিয়ার চানন্দী, নলচিরা, সুখচর ও চরঈশ্বর ইউনিয়নের হাজার হাজার ঘরবাড়ি; নিঃস্ব হয়েছে এ উপকূলের কয়েক হাজার পরিবার। একসময় শুধু বর্ষায় এ ভাঙন থাকলেও বর্তমানে পুরো বছর জুড়েই চলে এই তাণ্ডব। ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, হাট-বাজার ও ফসলি জমিসহ নানা স্থাপনা। কোনো কোনো পরিবার একাধিকবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। এসব গৃহহীন পরিবারের স্থান হয়েছে বিভিন্ন বেড়িবাঁধে। কর্তৃপক্ষ শুধু আশ্বাস দিলেও গত এক যুগেরও বেশি সময়ে কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

সুজতী বালা মজুমদার (৬৫)। নাতি-নাতনি ও ছেলে-বউকে নিয়ে এসেছেন নদীর তীরে। মুখে হাসি নেই, আছে তীব্র হতাশার ছাপ। রাস্তার পাশে মাটিতে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন নদীর দিকে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেলেও বাড়ি যাওয়ার চিন্তা নেই এই বৃদ্ধার। পারিবারিকভাবে স্বামী ও সন্তানেরা নরসুন্দর পেশার সাথে জড়িত। চানন্দী ইউনিয়নের ভূমিহীন বাজারের পশ্চিম পাশে নদীর তীরে দেখা হয় সুজতীর সাথে।

সুজতী জানান, হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে নদীভাঙনের শিকার হয়ে এসেছিলেন এই চরে। নগদ টাকা ছিল না। ছেলে-বউদের গয়না বিক্রি করে একটুকরো জমি কিনে বসবাস শুরু করেন চানন্দী ইউনিয়নের নলেরচরে ভূমিহীন বাজারের দক্ষিণ পাশে। আগ্রাসী মেঘনা গিলে খেয়েছে তাঁর শেষ সম্বল বাড়িটি। নতুন ঠিকানা এখনো তৈরি করতে পারেননি। নদীভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুচোখে অন্ধকার দেখছেন এই নারী। গত এক মাস ধরে পরিবারের ৮ সদস্যকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। মন ভালো নেই, তাই নদীর তীরে এসেছেন নিজের শেষ স্মৃতিটুকু একবার দেখতে।

চানন্দী ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্র ভূমিহীন বাজার। প্রায় ৫ শতাধিক দোকান ছিল এই বাজারে। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পাকা রাস্তার সংযোগ থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষজন আসতেন এই বাজারে। বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী মমিন ভাণ্ডারি (৭০) জানান, গত এক সপ্তাহ আগে বাজারটি নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। ৭ দিনে বাজারের অর্ধেকের বেশি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। অনেকে তাদের শেষ সম্বলটুকু ভেঙে নিয়ে যেতেও পারেনি। কেউ কেউ দোকানঘরের অংশবিশেষ খুলে গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে।

মমিন ভাণ্ডারি আরও জানান, তিনি এই চরে বসবাস শুরু করেছেন ২০ বছর আগে থেকে। এখন ভূমিহীন বাজার ভাঙছে। নদী এখান থেকে আরও ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল। উত্তর দিকে এই চরের আর মাত্র দুই কিলোমিটার বাকি আছে, এরপরই সুবর্ণচর উপজেলা। কিন্তু বিভিন্ন সময় সরকার বা রাজনৈতিক নেতারা শুধু আশ্বাসই দিয়ে গেছেন। অনেকে এই ভাঙন নিয়ে রাজনীতি করলেও ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এই চরের বাসিন্দারা এখন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বেড়িবাঁধের ঢালে আশ্রয় নিয়েছে।

বাজারের পূর্ব পাশে গড়ে তোলা হয়েছিল এলাকার সবচেয়ে বড় মসজিদ, যেখানে দুই হাজার লোক একসাথে নামাজ পড়ার সুযোগ পেত। তার পাশেই ছিল গণকবরস্থান, যেখানে ৭০০–৮০০ লোককে দাফন করা হয়েছে। কবরস্থানের পাশে দেখা হয় কয়েকজন নারীর সাথে। তাদের একজন নাজমা আক্তার (৪৫) জানান, ১০ বছর আগে তাঁর বড় বোনকে এখানে দাফন করা হয়েছিল। কবরস্থানটি এখন নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনের যে গতি, তাতে আগামী দু-একদিনের মধ্যে মসজিদসহ সম্পূর্ণ কবরস্থান নদীতে বিলীন হবে। এজন্য বোনের কবরটি শেষবারের মতো দেখতে এসেছেন।

আরও পড়ুন

নাজমা আরও জানান, অনেকে এখানে কবর দেওয়া স্বজনদের মৃতদেহ তুলে নিয়ে অন্যত্র দাফন করছেন। একটি কবর স্থানান্তরে অনেক টাকা ব্যয় হয়, যা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই নিরুপায় হয়ে শুধু চোখভরে দেখতে এসেছেন।

এমন অসংখ্য অসহায়ত্ব আর হারানোর গল্প আছে এ চরে বসবাসকারী হাজারো পরিবারের। গত ১৭ বছরে হাতিয়ার চানন্দী আর হরনী ইউনিয়নের অন্তত ৪০ হাজার একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বসতি হারিয়েছে অন্তত ২০ হাজার পরিবার। যত দিন যাচ্ছে, ততই তীব্র হচ্ছে মেঘনার ভাঙন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও বাজারসহ অসংখ্য স্থাপনা ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে। হাতিয়ার এ দুটি ইউনিয়নে ধানের পাশাপাশি সর্জন পদ্ধতিতে চাষ হতো নানা মৌসুমি সবজি ও মাছ। এসব সবজি নোয়াখালীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলাতেও সরবরাহ করা হতো। কিন্তু প্রতিনিয়ত ভাঙনের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে এখানকার মানুষ। এখন তাদের ঠাঁই বিভিন্ন বেড়িবাঁধের পাশে।

নতুন জেগে ওঠা এই চরে মানুষের বসবাস শুরু হয় ১৯৯৮ সালের দিকে। ২০০৩ সালে একে ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা করা হয়। শুরুতে চানন্দী ইউনিয়ন পরিষদটি দুটি প্রশাসনিক এরিয়াতে ভাগ করে কার্যক্রম চালানো হতো— একটি কেরিংচর প্রশাসনিক এরিয়া ও অপরটি নলেরচর প্রশাসনিক এরিয়া। পার্শ্ববর্তী সুবর্ণচর উপজেলার সাথে সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকায় তা মীমাংসা করে ২০২২ সালের ১৫ জুন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন।

সম্প্রতি ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী। তিনি নদীভাঙনে নিঃস্ব পরিবারগুলোর দুঃখ-কষ্টের কথা চিন্তা করে এই অঞ্চলে জরুরি কাজের পাশাপাশি স্থায়ী নদীভাঙন রোধে ব্যবস্থার কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলের নদীভাঙন রোধে একটি প্রকল্প যাচাই-বাছাই চলছে, যা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ফেরি করে মাদক বিক্রি, ক্রেতার বদলে মিলল ‘যমের দেখা’
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় রতন ও সাকিল আহমেদ নামের দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছে থাকা ১৭৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
ফেরি করে মাদক বিক্রি, ক্রেতার বদলে মিলল ‘যমের দেখা’
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ, ১০ কিলোমিটার যানজট 
টাঙ্গাইলে আন্ডারপাস নির্মাণের দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক অবরোধ করেছে এলাকাবাসী। 
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ, ১০ কিলোমিটার যানজট 
ছেলের মরদেহ কবরস্থানে নেওয়ার সময় মায়ের মৃত্যু!
ছেলের মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে মারা গেলেন মা তারা বানু (৭৭)। ছেলের মরদেহ বাড়ি থেকে কবরস্থানে নেওয়ার সময় এ ঘটনাটি ঘটে।
ছেলের মরদেহ কবরস্থানে নেওয়ার সময় মায়ের মৃত্যু!
‘মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি সহায়তার চেয়েও জেলেদের মানসিক অঙ্গীকারই গুরুত্বপূর্ণ’
মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি সহায়তার চেয়েও জেলেদের মানসিক অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
‘মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি সহায়তার চেয়েও জেলেদের মানসিক অঙ্গীকারই গুরুত্বপূর্ণ’
অবশেষে বাঁধের কাজের অর্থ আত্মসাতকারীর পরিচয় মিলল
হাওরের বোরো ফসলরক্ষা ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ কাজের প্রকল্পের স্টেশনারি মালামাল ক্রয় ও আপ্যায়ন খরচসহ আনুষাঙ্গিক বিল বাবদ ১ পারসেন্ট (ভাগ) টাকার একটি চেকের আড়াই লাখের বেশি টাকা বাহক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অগোচরেই উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় এই ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবশেষে বাঁধের কাজের অর্থ আত্মসাতকারীর পরিচয় মিলল
আরও পড়ুন
রাতের আধারে দেওয়া হলো বিষ, খামারির ৫ লাখ টাকার মাছ নিমিষেই শেষ
প্রেমে সাড়া না পেয়ে কিশোরীর বাথরুমে যাওয়ার পথে ওঁত পাতেন রবিউল, অতঃপর...
প্রতিবেশীর ঘর বাঁচাতে গিয়ে নিভে গেল সোহাগের জীবন প্রদীপ
নোয়াখালীতে এসিড গিলে যুবকের মৃত্যু