মাংস কেন সবুজ হলো, বিশেষজ্ঞ জানালেন নতুন কারণ

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ০৯:৩৮ এএম


মাংস কেন সবুজ হলো, বিশেষজ্ঞ জানালেন নতুন কারণ
খুলনায় রান্নার সময় সবুজ রঙ ধারণ করা মাংস। ছবি: সংগৃহীত

খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় গরুর মাংস রান্নার সময় হঠাৎ রঙ লাল থেকে সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। 

বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে পৌরসভার মডার্ন বেকারির কয়েকজন কর্মী পিকনিকের জন্য কেনা মাংস রান্না করতে গিয়ে এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখতে পান। হতবাক ও শঙ্কিত হয়ে তারা রান্না করা মাংসসহ কড়াই নিয়ে সরাসরি থানায় গিয়ে হাজির হন। ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. এম এস মিনারা খাতুন বলেন, ‘মাংস আগের দিনের হওয়াই সবুজ রঙ ধারণ করেছে- এটি কারণ হিসেবে যথেষ্ট নয়।’

তার মতে, সামাজিক মাধ্যমে ছবি দেখে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিষয়টিকে অবহেলাও করা উচিত নয়। কারণ খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে একমাত্র বৈজ্ঞানিক প্রমাণই নির্ভরযোগ্য। মাংসে অস্বাভাবিক সবুজ রঙ, দুর্গন্ধ বা পিচ্ছিল ভাব দেখা দিলে তা না খেয়ে পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানোর পরামর্শ দেন তিনি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগেও মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানান অধ্যাপক মিনারা খাতুন। তার মতে, এর নেপথ্যে বেশ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ থাকতে পারে- মাংসের রঞ্জক পদার্থ মায়োগ্লোবিনের রাসায়নিক পরিবর্তন, অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে সালফমায়োগ্লোবিন তৈরি হওয়া, কপার বা অন্য ধাতব যৌগের সংস্পর্শ যা তুলনামূলকভাবে বিরল, সিউডোমোনাসের মতো পিগমেন্ট উৎপাদনকারী জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ও জবাই-পরবর্তী সংরক্ষণ-পরিবহনে ত্রুটি, এমনকি মাংসের পেশিতন্তুর গঠন ও আলোর প্রতিফলনের কারণেও কখনও কখনও সবুজ, নীল বা রংধনুর মতো আভা দেখা দিতে পারে।

শুধু একদিন ফ্রিজে সংরক্ষণের কারণে মাংস সবুজ হওয়ার কথা নয় বলে জানান অধ্যাপক মিনারা খাতুন। তার ভাষ্যে, শূন্য থেকে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে মাংসের রঙ কিছুটা গাঢ় বা বাদামি হতে পারে, কিন্তু স্পষ্ট সবুজ আভা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। রান্না করা মাংস সবুজ হলেও ঝোলের রঙ লাল থাকার বিষয়টিকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ বলে উল্লেখ করেন।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সবুজ পরিবর্তন যদি মাংসের নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ঝোলের রঙ স্বাভাবিক থাকতে পারে। কারণ ঝোলের রঙ মূলত নির্ধারিত হয় মাংসের রক্তরঞ্জক পদার্থ, মসলা ও রান্নার সময় ঘটা রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে। তাই ঝোল লাল থাকা মানেই মাংস নিরাপদ ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিজ্ঞানসম্মত নয়।

মাংস বিক্রেতার দাবি, একই গরুর মাংস কিনে অন্যরা কোনও সমস্যায় পড়েননি। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মিনারা খাতুন বলেন, ‘একই পশুর বিভিন্ন অংশের সংরক্ষণ পরিবেশ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও দূষণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে, ফলে সব অংশে একই রকম পরিবর্তন নাও ঘটতে পারে। তাই অন্যদের কিছু হয়নি এই যুক্তি খাদ্য নিরাপত্তার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে বেকারির কোনও রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার যে জল্পনা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তারও এখন পর্যন্ত কোনও সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কেননা খাদ্যশিল্পে ব্যবহৃত বেশির ভাগ রাসায়নিক সাধারণত তাপের সংস্পর্শে এসে মাংসকে সবুজ করে না।’

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে জবাই থেকে শুরু করে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে নিরাপদ তাপমাত্রা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন অধ্যাপক মিনারা খাতুন। এ ছাড়া পরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্বাস্থ্যসম্মত জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিরাপদ পানি ও প্রশিক্ষিত কর্মী নিশ্চিত করা, ফ্রিজ বা ডিপ ফ্রিজের তাপমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং মাংসের উৎস, জবাইয়ের তারিখ ও সংরক্ষণ পদ্ধতি সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেন তিনি।

আরও পড়ুন

খাদ্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যে কোনও পরিবর্তন দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।’

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission