কুমিল্লার ৩০০ বছরের পুরোনো সেই মসজিদ সংরক্ষণের দাবি 

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ০৩:২৭ পিএম


কুমিল্লার ৩০০ বছরের পুরোনো সেই মসজিদ সংরক্ষণের দাবি 
ছবি: সংগৃহীত

কুমিল্লার গোমতী নদীর উত্তর তীরে সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো নুরজাহান মসজিদ। ইতিহাস, জনশ্রুতি আর অবহেলার ভারে জীর্ণ এই স্থাপনাটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিশাল বটগাছের শেকড় যেন আঁকড়ে ধরে রেখেছে এর অস্তিত্ব। স্থানীয়দের বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই মসজিদে কোনো দিন আজান দেওয়া হয়নি, এমনকি জামাতে নামাজও আদায় হয়নি। কারণ, এর নির্মাতা ছিলেন ত্রিপুরা মহারাজা দ্বিতীয় ধর্ম-মানিক্যের রাজদরবারের একজন নর্তকী।

অবহেলায় ক্ষয়ে যাওয়া এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় স্থানীয়দের পাশাপাশি সক্রিয় হয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ভূমির তফশিল নির্ধারণের জন্য ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছে সংস্থাটি। একই দাবিতে আবেদন করেছেন শিক্ষানুরাগী মোশাররফ খান চৌধুরী।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, গোমতীর উত্তরপাড়ের মাঝিগাছা গ্রামে তিন বোন— নুরজাহান, মোগরজান ও ফুলজানের বসবাস ছিল। শৈশবে সাপে কাটা নুরজাহানকে ভেলায় তুলে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হলে ত্রিপুরা রাজদরবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার পর রাজদরবারের মেনেকার তত্ত্বাবধানে তিনি নাচ-গান শেখেন এবং সময়ের অন্যতম খ্যাতিমান নর্তকীতে পরিণত হন।

দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর রাজদরবারে কাটানোর পর মধ্যবয়সে তিনি নিজ গ্রাম মাঝিগাছায় ফিরে আসেন। একজন জমিদারের বিধবা স্ত্রী পরিচয়ে জীবন শুরু করেন। বিদায়ের সময় ত্রিপুরার মহারাজা তাকে কয়েক একর জমি, বিপুল অর্থ ও স্বর্ণালংকার উপহার দেন। সেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে তিনি গ্রামের মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসেন। অতীত জীবনের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ১৭১৪ থেকে ১৭৩৪ সালের মধ্যে নির্মাণ করেন একটি মসজিদ।

মসজিদ নির্মাণ শেষে নামাজ শুরুর দিন নির্ধারণে গ্রামবাসীকে নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করেন নুরজাহান। কিন্তু তার আগেই তার অতীত জীবন নিয়ে এলাকায় আলোচনা শুরু হয়। পরে গ্রামের প্রভাবশালীরা সিদ্ধান্ত নেন, তার অর্থে নির্মিত মসজিদে কেউ নামাজ আদায় করবেন না। সেই সিদ্ধান্তই আজও জনশ্রুতির অংশ হয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এরপর থেকে এই মসজিদে আর কখনো আজান দেওয়া হয়নি, নামাজও অনুষ্ঠিত হয়নি।

এই ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নুরজাহান। কয়েক বছর নিভৃতে জীবন কাটানোর পর তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে একটি প্রচলিত মত রয়েছে। আবার অন্য একটি জনশ্রুতি বলছে, সামাজিক অপবাদ সহ্য করতে না পেরে তিনি আত্মহত্যা করেন। পরে মসজিদের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।

আরও পড়ুন

সরেজমিনে দেখা গেছে, কুমিল্লা নগরীর চাঁনপুর গোমতী সেতু পার হয়ে মাঝিগাছা-নন্দীর বাজার সড়কের বাম পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক মসজিদটি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এটি দেখতে এলেও চারপাশে গড়ে ওঠা স'মিল ও দোকানপাটের কারণে স্থাপনাটি অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে।

মসজিদের গম্বুজের একাংশ ইতোমধ্যে ধসে পড়েছে। দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও বটগাছের শেকড় ইটের গাঁথুনিকে ভেদ করে নেমে এসেছে। ভেতরে জমে থাকা পানি ও অযত্নে আরও নাজুক হয়ে পড়েছে পুরো স্থাপনাটি। উত্তর পাশে রয়েছে একটি কবরস্থান।

শিক্ষানুরাগী মোশাররফ খান চৌধুরী বলেন, প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাতায়াতের সময় মসজিদটির করুণ অবস্থা চোখে পড়ে। দ্রুত সংরক্ষণ না করলে এটি একসময় হারিয়ে যাবে। আশপাশের দখলও বন্ধ করতে হবে। যথাযথ উদ্যোগ নিলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কুমিল্লা কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার সজিব মিয়া বলেন, গোমতী নদীর তীরের এই ঐতিহাসিক মসজিদ প্রত্ন-পর্যটনের সম্ভাবনাময় একটি স্থাপনা। ভূমির তফসিল নির্ধারণের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংরক্ষণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবিএম মশিউজ্জামান বলেন, মসজিদের ভূমি নির্ধারণ ও সংরক্ষণসংক্রান্ত আবেদন পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আদর্শ সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission