দ্রুত নগরায়ণ ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়েছে দেশের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের বৃহত্তম শহর রাজশাহী। নগরীর পানির সরবরাহ অবকাঠামোর সক্ষমতা চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় এ সংকট ক্রমেই বাড়ছে।
বর্তমানে রাজশাহী শহরে প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ লিটার সুপেয় পানির ঘাটতি রয়েছে, যা বাড়তে থাকা পানি সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমানো এবং নগরবাসীর জন্য টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বহুল প্রতীক্ষিত ‘সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ মেগা প্রকল্পের ভৌত কাজ ইতোমধ্যে ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্পটির সার্বিক কাজ শেষ হলে পদ্মা নদীর পানি এনে পরিশোধনের মাধ্যমে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এমনকি, এতে ২০৩৫ সালের সম্ভাব্য পানির চাহিদাও সহজেই পূরণ করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে, রাজশাহী মহানগর এলাকায় প্রতিদিন মোট পানির চাহিদা প্রায় ১১ লাখ ৩২ হাজার লিটার। এ চাহিদা পূরণে ওয়াসা মূলত গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে প্রতিদিন ৮ লাখ ৬৫ হাজার লিটার পানি উত্তোলন করে।
বৃহৎ এ প্রকল্পটি তিনটি প্রধান ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে প্রধান পানির উৎস নিশ্চিত করতে গোদাগাড়ীতে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মিলনস্থলে একটি আধুনিক ইনটেক পয়েন্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। সমীক্ষা অনুযায়ী, সেখানে সারা বছর অন্তত ৩০ ফুট গভীরতায় নিরবচ্ছিন্ন পানিপ্রবাহ থাকবে।
দ্বিতীয় ধাপে ইনটেক পয়েন্টের পাশে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার পানি পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। তৃতীয় ধাপে পবা উপজেলার হরিপুরে একটি বুস্টার পাম্প প্রকল্প ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে।
প্রধান প্ল্যান্ট থেকে হরিপুর হয়ে নগরী পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রান্সমিশন পাইপলাইনের মধ্যে ইতোমধ্যে ২১ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে গোদাগাড়ী-রাজশাহী মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায় দ্রুতগতিতে পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছে।
এছাড়া নগরীতে ১৬ কিলোমিটার ডিস্ট্রিবিউশন লাইন স্থাপন করা হয়েছে এবং আরও ১০ কিলোমিটার লাইনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রকল্পটিতে বিশ্বখ্যাত ফরাসি পানি পরিশোধন প্রযুক্তি এবং চীনের জিংজিয়ান কোম্পানির উন্নতমানের দীর্ঘস্থায়ী পাইপলাইন ব্যবহার করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে এসব পাইপলাইন নির্বাচন করা হয়েছে, যেগুলোর স্থায়িত্বকাল অন্তত ৭০ বছর।
শনিবার (২৫ জুলাই) ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী পারভেজ মামুদ বলেন, ২০৩৫ সালের সম্ভাব্য নাগরিক চাহিদা এবং নগরীর সীমানা সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্ল্যান্টটির নকশা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে, ২৬ দশমিক ৫ কিলোমিটারের মধ্যে ২১ কিলোমিটার পাইপলাইনের কাজ সম্পন্ন হওয়া আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে একটা বড় ধরনের সাফল্য।
প্রকল্পের আওতায় পদ্মা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে তা পরিশোধনের পর পাইপলাইনের মাধ্যমে পবা উপজেলার হরিপুরে স্থাপিত বুস্টার পাম্প স্টেশনে নেওয়া হবে।
সেখান থেকে পরিশোধিত পানি নগরবাসীর মধ্যে সরবরাহ করা হবে। একইসঙ্গে, এই প্রকল্পের আওতায় কাটাখালী, নওহাটা ও গোদাগাড়ীর ৩০টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারাও নিরাপদ সুপেয় পানি পাবেন।
চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলী সানচিং বাসস’কে জানান, ভূমি ভরাট ও সমতলকরণের পর মূল সাইটের স্ট্রাকচারাল পাইলিং এবং উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিশ্লেষকরা রাজশাহীর পরিবেশ সুরক্ষায় এ মেগা প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল ওয়াকিল বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর শতভাগ নির্ভরশীলতা পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক।
পরিশোধনের মাধ্যমে পদ্মার পানি নগরীতে আনার এ উদ্যোগ রাজশাহীর জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নাগরিক সংগঠন ‘সুজন’ এর রাজশাহী জেলা সভাপতি সুফিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এদিকে, প্রকল্পটির প্রাথমিক মেয়াদ চার বছর নির্ধারণ করা হলেও কাজের বর্তমান গতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ২০২৭ সালের মধ্যে পানি পরিশোধনাগারের শতভাগ নির্মাণকাজ শেষ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে নগরবাসীর কাছে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
আরটিভি/এমএ




