
বড় এক গম্বুজের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা অপূর্ব এক স্থাপত্য যেন ব্যস্ত ক্যাম্পাসের বুকে এক টুকরো প্রশান্তির ঠিকানা। দেয়ালের নকশা ভেদ করে ভেতরে এসে পড়ে নরম আলোর রেখা, খোলা পরিসরে মৃদু বাতাস বয়ে যায় আপন মনে। চারপাশের কোলাহল পেরিয়ে এখানে পা রাখলেই বদলে যায় পরিবেশ। নেমে আসে এক স্নিগ্ধ নীরবতা। মনে হয়, ব্যস্ততার ভিড় থেকে খানিকটা দূরে এসে মনও যেন খুঁজে পায় তার নিজস্ব শান্তির ঠিকানা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জামে মসজিদটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন, ইসলামি জ্ঞান, দর্শন, সংস্কৃতি ও চর্চার কেন্দ্র হিসেবে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি এর আধুনিক স্থাপনা ও সুন্দর স্থাপত্যনকশা ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যকে করেছে অতুলনীয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পেরোলেই চোখে পড়ে প্রশাসনিক ভবন। ভবনটির ডান পাশ ধরে একটু এগোলেই দৃষ্টিতে ধরা দেয় মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত সুউচ্চ এক মিনার। মিনারের পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ। সূক্ষ্ম কারুকার্য ও নান্দনিক স্থাপত্যে নির্মিত এই মসজিদটি শুধু ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং এর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আবহে যুক্ত করেছে এক অনন্য মাত্রা। সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের এক গৌরবোজ্জ্বল প্রতীক।
মসজিদে প্রবেশ করতেই প্রাণ জুড়িয়ে যায় মুসল্লিদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীসহ নামাজ পড়তে আসেন হাজারো মুসল্লি। মসজিদের সৌন্দর্য বাড়াতে চারদিকে স্থাপন করা হয়েছে লাইটপোস্ট। নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনাও। সুবিশাল অভ্যন্তরীণ এই মসজিদে নেই কোনো পিলার। মূল কাঠামোর মধ্যবর্তী স্থানে ওপরে নির্মাণ করা হয়েছে বিশালাকার গম্বুজ। শ্বেত-শুভ্র ঝাড়বাতিগুলো এতই মনোরম যে, নির্মাণের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে তা একেবারে মিশে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭০ সালের ১৩ এপ্রিল প্রায় তিন একর জায়গায় এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে। এর মূল কাঠামোর দৈর্ঘ্য ৫২ গজ ও প্রস্থ ৫২ গজ। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের নকশাপ্রণেতা ‘থারিয়ানি’র নকশার আলোকে এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে। রাবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদটির নির্মাণব্যয় তৎকালীন সময়ে ৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরে কাজ শেষ করতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় আট লাখ টাকা।
মসজিদের বারান্দা ও বারান্দার বাইরের যে অংশ রয়েছে, তা মূল কাঠামোর প্রায় দ্বিগুণ। মূল ভবনের অভ্যন্তরে প্রায় ৫০০ মুসল্লির ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে বাইরের ফাঁকা জায়গাসহ এই মসজিদে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের আঙিনাকে মূল ক্যাম্পাস থেকে পৃথক রাখা ও পবিত্রতা রক্ষার্থে চারপাশে রয়েছে দেয়াল। আঙিনাজুড়ে রয়েছে সারিবদ্ধ ঝাউগাছ। দক্ষিণ-পূর্ব পাশে রয়েছে ফোয়ারা, নারী-পুরুষের জন্য পৃথক অজুখানা, অফিসকক্ষ, শৌচাগার ও ইমামের থাকার ব্যবস্থা। এছাড়া রয়েছে হরেক রকমের ফলের গাছ ও ঈদগাহ।
মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ইমাম ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মাওলানা জামাল উদ্দিন। মসজিদে একজন সিনিয়র পেশ ইমাম ও একজন মুয়াজ্জিন দায়িত্ব পালন করছেন। মসজিদের সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য রয়েছেন দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও একজন সেকশন অফিসার। মসজিদের অজুখানার পাশেই রয়েছে সমৃদ্ধ পাঠাগার। পাঠাগারটি মুসল্লিদের জন্য আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত খোলা থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদটি অনেক সুন্দর। প্রতিদিন এখানে শত শত মুসল্লির সমাগম হয়। ক্যাম্পাসে যারা ঘুরতে আসেন, তারা একবার হলেও মসজিদটিতে নামাজ পড়ে যান। আমি মনে করি, রাবি ক্যাম্পাসের অন্যান্য সব দৃষ্টিনন্দন জায়গার মধ্যে কেন্দ্রীয় মসজিদ অন্যতম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী মো. জুনায়েদ সোবহান বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম সুন্দর একটি স্থান। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরের অনেক মানুষও প্রতিনিয়ত নামাজ আদায় করতে আসেন। মসজিদটি এর ভিন্নধর্মী স্থাপত্যশৈলীর জন্য বেশ পরিচিত।
মসজিদটিতে বর্তমানে সিনিয়র পেশ ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মাওলানা ফাহিম মাহমুদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মাদরাসা শিক্ষায়ও পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, মসজিদটির ভেতরের অংশ তুর্কি স্থাপত্যশৈলীতে নকশা করা। একসময় মসজিদে জুমার নামাজে খুব ভিড় হতো, যা মুসল্লিদের জন্য কষ্টকর ছিল। তবে বর্তমানে তা হয় না। কারণ, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা, বিজয়-২৪ ও মতিহার হলে জুমার নামাজ চালু হওয়ায় মুসল্লিদের চাপ অনেকটাই কমে গেছে।
মসজিদের দু’পাশে নামাজের স্থান সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, সম্প্রসারিত নামাজের স্থান মূল মসজিদের সৌন্দর্যে কোনো ব্যাঘাত ফেলবে না; বরং দূর থেকে তা দেখতে মসজিদের একটি অংশের মতোই মনে হবে। মূল মসজিদের সঙ্গে সমন্বয় করেই এটি তৈরি করা হচ্ছে।
তবে এতকিছুর পরেও ঐতিহ্যের এই প্রাণকেন্দ্রে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে বলে জানান মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিরা। তারা বলেন, মসজিদের পাশেই রয়েছে শহীদ মিনার ও মুক্তমঞ্চ। প্রায়ই আসর ও মাগরিবের সময় এই মঞ্চে উচ্চস্বরে মাইক বাজিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এর কারণে নামাজরত মুসল্লিরা মারাত্মক অসুবিধায় পড়েন।
এছাড়া এখানে শৌচাগার ও অজুর জন্য যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা মুসল্লিদের জন্য অপ্রতুল। শৌচাগারগুলোর অধিকাংশই ব্যবহারের অনুপযোগী। অজুখানায় মাত্র ৪২ জন একসঙ্গে অজু করতে পারেন। এ সময় দ্বিগুণসংখ্যক মুসল্লিকে অজু করার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ফলে অনেক মুসল্লি জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন না। এ কারণে মসজিদের ফোয়ারার চারপাশে অজু করার ব্যবস্থা করা হলে সমস্যা কিছুটা হলেও দূর হবে বলে জানান তারা।
একই সঙ্গে মসজিদের পাঠাগারটিকে আরও সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে পাঠাগারটি উন্নত করার পাশাপাশি অধ্যয়নের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও যুগোপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন মসজিদের ইমাম। এদিকে, মসজিদের পাঠাগারটি আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত খোলা থাকলেও জোহরের নামাজের পর থেকে এশার নামাজের পূর্ব পর্যন্ত খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন মুসল্লিরা।
এছাড়া জুমার নামাজে অতিরিক্ত মুসল্লির চাপে বারান্দায় যারা নামাজ আদায় করেন, তাদের রোদে কষ্ট করে নামাজ পড়তে হয়। এক্ষেত্রে বারান্দায় ছাদ নির্মাণ করা হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে বলে মনে করেন মুসল্লিরা। তবে বর্তমানে মূল মসজিদের দক্ষিণ পাশে নারীদের জন্য আলাদাভাবে মসজিদ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে মসজিদের উত্তর পাশে পুরুষদের নামাজের স্থান সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এক ছাদের নিচে যখন আড়াই হাজার মানুষ সিজদায় নত হন, তখন মসজিদটি যেন শুধু একটি স্থাপত্য হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে বিশ্বাস, প্রার্থনা ও আত্মিক প্রশান্তির মিলনস্থল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিকতার ভুবনে তাই কেন্দ্রীয় মসজিদ একদিকে যেমন ইবাদতের পবিত্র স্থান, অন্যদিকে তেমনি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক।
আরটিভি/এসএস




