পুকুরপাড়ের ঝুপড়ি ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন বিমলা রানী

স্টাফ রিপোর্টার (ঠাকুরগাঁও), আরটিভি নিউজ

সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ , ০৫:৩০ পিএম


পুকুরপাড়ের ঝুপড়ি ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন বিমলা রানী
ছবি: আরটিভি

জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে যখন প্রতিটি মানুষের একটু উষ্ণতা ও বিশ্রামের প্রয়োজন, ঠিক তখনই ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পুকুরপাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন প্রায় ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা বিমলা রানী। স্বামী মারা যাওয়ার পর শেষ সম্বল স্বামীর ভিটেমাটিও তার ভাগ্যে জোটেনি। সন্তানহীন এই বৃদ্ধা মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন পুকুরপাড়ের এক নির্জন স্থান। সেখানে ভাঙা টিন ও বেড়ার একটি জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

মর্মস্পর্শী এ ঘটনাটি ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার কোষারানীগঞ্জ ইউনিয়নের রামদেবপুর গ্রামের।

সরেজমিনে রামদেবপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ বিমলা রানীর শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা জটিল রোগ। চোখেও ঠিকমতো দেখতে পান না। কোমরের তীব্র ব্যথায় সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন। ভাঙা ঘরের সামনে স্যাঁতসেঁতে মাটিতে বসে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তিনি। ঘরের চালে থাকা ভাঙা টিন ও বেড়ার ফাঁক দিয়ে অনায়াসেই বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢুকে পড়ে। নেই কোনো বিছানাপত্র। একটি ছেঁড়া বস্তা ও পুরোনো কাপড়ের ওপর কষ্টে দিন কাটে তার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ২০ বছর আগে বিমলা রানীর স্বামী নেন্দ শীল মারা যান। আগে স্বামীর বাড়িতে থাকলেও নিঃসন্তান হওয়ায় স্বামীর ভিটেবাড়িতে তার আর জায়গা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নির্জন পুকুরপাড়ে একাকী বসবাস করছেন। আগে বিভিন্ন মানুষের কাছে হাত পেতে যা পেতেন, তা দিয়েই জীবন চলত। তবে প্রায় এক বছর ধরে অসুস্থ থাকায় এখন আর বাইরে বের হতেও পারেন না।

নিজের অতীতের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিমলা রানী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর আমার আর কেউ খোঁজ রাখেনি। বাধ্য হয়ে পুকুরপাড়ে এই ঝুপড়ি ঘর তুলেছি। আগে হেঁটে মানুষের কাছে হাত পাততাম। যা পেতাম, তা দিয়ে আধপেটা খেয়ে বেঁচে ছিলাম। এখন তো উঠতেই পারি না, খাব কী?

চিকিৎসার অভাবে দিন দিন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।

বিমলা রানীর এমন পরিণতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রাও।

আরও পড়ুন

রামদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা সফিকুল ইসলাম ও রমেছা বেগম জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই বিমলা চরম অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। এলাকাবাসী এতদিন যতটুকু পেরেছে খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু এখন তার শারীরিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সার্বক্ষণিক একজন মানুষের সহায়তা প্রয়োজন। ঘরের ভেতরে বৃষ্টির পানি পড়ে, ঠিকমতো ঘুমানোরও ব্যবস্থা নেই।

কোষারানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, গ্রামে অনেক অসহায় মানুষ রয়েছেন। সাধ্যমতো তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। বিমলা রানীর বিষয়েও খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তারিফুল ইসলাম বলেন, বিমলা রানীর বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিমলা রানীর হয়ত আর তেমন কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তবে একটি নিরাপদ আশ্রয়, দু-মুঠো খাবার এবং ব্যথাহীনভাবে শেষ নিশ্বাস ত্যাগের সুযোগটুকু অন্তত তার প্রাপ্য। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সামান্য সহানুভূতিই পারে এ বৃদ্ধার শেষ দিনগুলোকে কিছুটা স্বস্তিদায়ক করে তুলতে।

এ অবস্থায় বৃদ্ধার চিকিৎসা, খাদ্য ও বাসস্থানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission