বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ বোলার থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬ , ১২:১৫ পিএম


বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ বোলার থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে একসময় সম্ভাবনাময় বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে পরিচিত ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন নিয়ে ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করলেও সময়ের ব্যবধানে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘ডেভিড ইমন’ নামে। হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক মামলার আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে তাকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের ৯টি দলের যৌথ অভিযানে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫), মো. শামীম (২৮) এবং সাফায়েত হোসেন (২৮)।

পুলিশ জানিয়েছে, গোঁফ কেটে ছদ্মবেশ ধারণ করে সহযোগীদের নিয়ে যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন ডেভিড ইমন। টানা নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে তাকে আটক করা হয়।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেছেন বলে তিনি জানান। পরে তাদের চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, দীর্ঘদিনের নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবেই ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান আলমকে ধরতে পৃথক অভিযান চালানো হলেও তিনি পালিয়ে যান। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের একটি কৃষক পরিবারে জন্ম মোবারক হোসেন ইমনের। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। ২০১৯ সালের দিকে তিনি চট্টগ্রামের ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে যোগ দেন এবং বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউরী এলাকায় নিয়মিত অনুশীলন করতেন।

বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে দ্রুতই নজর কাড়েন তিনি। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবকে অনুসরণ করে নিজের বোলিং গড়ে তুলছিলেন। কোচ ও সতীর্থদের মতে, বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সামর্থ্যও ছিল তার।

একাডেমির কোচ আমিনুল হক বলেন, ইমন শান্ত স্বভাবের এবং পরিশ্রমী ছিলেন। করোনা মহামারির পর তিনি অনুশীলনে আসা বন্ধ করে দেন। পরে গণমাধ্যমে ‘ডেভিড ইমন’ নামে তার পরিচয় প্রকাশিত হলে তারা জানতে পারেন, সেই ক্রিকেটারই অপরাধ জগতের আলোচিত ব্যক্তি।

স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিক আর্থিক সংকট, বাবার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং ক্রিকেট চালিয়ে নেওয়ার ব্যয় বহন করতে না পারায় ধীরে ধীরে খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যান ইমন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন ডেভিড ইমন। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। পরে ছোট সাজ্জাদ কারাগারে গেলে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনায় ডেভিড ইমন ও তার সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান আলম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন বলে পুলিশের অভিযোগ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, হামলা, অস্ত্রের ব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রসহ ছবি প্রকাশের মাধ্যমেও তিনি আলোচনায় আসেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলা, বাকলিয়ার আলোচিত জোড়া হত্যা মামলা এবং পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায়ও তার নাম সামনে আসে। ওই ঘটনার তদন্তে তার দুই সহযোগীকে অস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ডেভিড ইমনকে ধরতে অভিযান জোরদার করা হয় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আরও পড়ুন

পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সক্রিয় অপরাধচক্র, অস্ত্রের উৎস, সহযোগীদের নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরটিভি/এসকে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission