সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার প্রাণ কুশিয়ারা নদীর তলদেশ এখন বিষাক্ত ভারী ধাতু ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভাগাড়। ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার গভীরতার পলিমাটিতেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ক্যাডমিয়াম-সিসার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবেশবিদরা এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এর প্রভাবে স্থানীয় পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ।
সম্প্রতি এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের এক গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণার জন্য কুশিয়ারা নদীর ৯টি জনবহুল পয়েন্ট থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এসব স্থানের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি পলি মাটিতে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৩০০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গড়ে এই সংখ্যা ২ হাজার ৮০০টি।
গবেষণায় দেখা গেছে, নমুনায় নদীর তলদেশের ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীরতায়ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি নদীর তলদেশে ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, সিসা এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া উচ্চমাত্রায় ধরা পড়েছে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। এর ফলে বিষাক্ত ভারী ধাতুগুলো মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে।ৎ
জানা গেছে, বিয়ানীবাজারের নদী তীরবর্তী এলাকা থেকে প্রচুর বর্জ্য পড়ছে কুশিয়ারা নদীতে। বিভিন্ন খাল-নালা থেকেও নদীতে মিশছে বর্জ্য। ফলে দিন দিন বিষাক্ত ধাতুতে ভারী হয়ে উঠছে নদীর তলদেশ।
পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, এই নদীর পলিতে দূষণের মাত্রা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ বা ‘ক্লাস ভি’ পর্যায়ের। ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের আধিক্য নদীটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য এবং সরাসরি নর্দমার সংযোগ নদীর স্বাস্থ্যকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই নদীর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে উপজেলার বৈরাগীবাজার এলাকার মৎস্যজীবী জাবেদ বলেন, ‘দিন দিন নদীর মাছ কমছে। পানি ভালো না। জাল নিয়ে নদীতে এলে মাছ পেতাম। এখন আর সেই অবস্থা নেই। বেঁচে থাকাই কষ্ট।’
বিয়ানীবাজার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হাসান বলেন, কুশিয়ারা নদীতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য বাধাহীনভাবে পড়ছে। তিনি এ অবস্থা থেকে পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি বলে উল্লেখ করে বলেন, আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদীর দূষণমুক্ত ও অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে আমাদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আমির হোসাইন খান জানান, কুশিয়ারা নদীর স্রোতের বেগ হ্রাস পাওয়ায় ক্ষয়সাধন ও পরিবহন ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে গভীরতাও কমেছে। নদীর আবর্জনা সরিয়ে ফেলতে উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর সবচেয়ে বেশী দরকার নদী তীরবর্তী মানুষের সচেতনতা। তিনি বলেন, এখন থেকে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে।
আরটিভি/ এসকেডি




