যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চললেও চলতি বর্ষায় এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয়রা। জুলাইয়ের ভারী বৃষ্টিতে ভবদহের নিম্নাঞ্চলের প্রায় অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে বাড়িঘর, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, ধর্মীয় উপাসনালয় ও মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। টানা বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকার মানুষ।
যশোরের সদর উপজেলার একাংশ, অভয়নগর, মণিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে ভবদহ অঞ্চল গঠিত। এসব উপজেলার ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশন হয় শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৩ সালের পর কোনো বিলে ‘টিআরএম’ (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারাধার) চালু না থাকায় পলি জমে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে। ফলে বিলের পানি নদী দিয়ে নামতে পারছে না।
জানা গেছে, অভয়নগর উপজেলার পায়রা, কোটা, দিঘলিয়া, আড়পাড়া, দত্তগাতী, দামোখালী, ডাঙ্গা মশিয়াহাটি, সুন্দলী, ফুলেরগাতী, রামসরা, রাজাপুর, গোবিন্দপুর, সড়াডাঙ্গা, ভাটবিলা, ডহর মশিয়াহাটি, ডুমুরতলা, আন্ধা, বলারাবাদ, বেদভিটা, চলিশিয়া, বারান্দী ও কপালিয়া এবং নওয়াপাড়া পৌরসভার গাজীপুর, সাভারপাড়া, একতারপুর, গুয়াখোলা, সরখোলা, বুইকরা, ধোপাদীসহ প্রায় ৫০টি গ্রামের বেশির ভাগ বাড়ির আঙিনায় পানি উঠে গেছে। প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ এখন পানিবন্দী। অনবরত বৃষ্টিতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
এছাড়া ডুমুরতলা-বেদভিটা, বলারাবাদ, আন্ধা-বলারাবাদ, আন্ধা-ডুমুরতলা ও মশিয়াহাটি-সুন্দলী সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
ভবদহের এই দুর্ভোগ নিরসনে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর ৮১.৫ কিলোমিটার পুনর্খনন শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা। প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ হলেও দৃশ্যমান কোনো সুফল মিলছে না।
বর্তমানে ভবদহ স্লুইসগেটে ৪টি পাম্প চালু থাকলেও জলকপাটগুলো ঠিকমতো ওঠানামা করছে না। তবে আরও ৫টি পাওয়ার পাম্প বসানোর কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, নদী খননের সময় খর্ণিয়া ব্রিজের কাছে ভদ্রা নদীতে আড়বাঁধ দেওয়ার ফলে ভাটিতে ছয় কিলোমিটার এলাকা পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে, যা পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করছে। এছাড়া পানি অপসারণের প্রধান পথ ‘আমডাঙ্গা খাল’ সংস্কার না করায় পানি ঠিকমতো সরতে পারছে না। ফলে বিল উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকছে।
অভয়নগরের ডুমুরতলা গ্রামের কলেজ শিক্ষক সমরেশ বৈরাগী জানান, গ্রামের ১৫৫টি পরিবারের মধ্যে অন্তত ১৫০টির উঠানেই এক থেকে দুই ফুট পানি। নতুন করে বৃষ্টি হলে পরিবার নিয়ে রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সুন্দলী এলাকার আহ্বায়ক সাধন বিশ্বাস ও যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হামিদ গাজী জানান, বিলে টিআরএম (জোয়ারাধার) চালু না করলে এই সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তি সম্ভব নয়।
তবে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জি জানান, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নদী খনন ও পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে। নদী দিয়ে যেভাবে পানি সরছে, তাতে দ্রুতই প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নেমে যাবে। এবার ভবদহে দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা তৈরি হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আরটিভি/এসএস



