নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে বকুল চন্দ্র সরকার (৪৫) নামের এক ব্যক্তি মাদক মামলায় সম্প্রতি জামিনে কারামুক্ত হয়ে আবারও রেকটিফায়েড স্পিরিটের কারবারি শুরু করেছেন। এবার তার নাম উঠে এসেছে পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থানায় করা একটি মাদক মামলায়। ওই মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে বকুল সরকারকে রেকটিফায়েড স্পিরিটের ‘মূল ডিলার’ বলে জানিয়েছেন তারা। পরে মামলাটিতে বকুলকেও আসামি করা হয়।
তবে মামলাটিতে বকুল পলাতক আসামি হলেও মোহনগঞ্জে প্রকাশ্যে মাদকের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বকুল চন্দ্র সরকার সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বৃষ্ণপুর এলাকার মুকুল চন্দ্র সরকারের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মোহনগঞ্জ পৌর শহরের দেওথান এলাকায় বসবাস করেন। শহরে রিপন হোমিও নামে একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান পরিচালনা করেন তিনি। ওষুধ বিক্রি বা চিকিৎসা দেওয়া-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্রই নেই তার। তবে বকুল হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার আড়ালে রেকটিফায়েড স্পিরিটের কারবার করছিলেন দীর্ঘদিন ধরেই।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২৫ জুলাই সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার কান্দাপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারি সজল মজুমদার (৩৪) ও তার স্ত্রী মর্জিনা আক্তারকে (৩৫) আটক করে পুলিশ। অভিযানে তাদের বাড়ি থেকে সাড়ে তিন কেজি গাঁজা ও নগদ ১৮ হাজার ৮০৯ টাকা উদ্ধার করা হয়।
পরে তাদের দেওয়া তথ্যে হাওরের পানিতে ডুবিয়ে রাখা প্লাস্টিকের বস্তায় ২২০ বোতল রেকটিফায়েড স্পিরিট উদ্ধার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সজল মজুমদার জানান, তাদের কাছে মোট ২৫০ বোতল স্পিরিট ছিল, যার মধ্যে ৩০ বোতল ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে সজল দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া স্পিরিটের মূল ডিলার নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌর শহরের তুলাপট্টি এলাকার বকুল চন্দ্র সরকার। তার সহযোগী হিসেবে একই উপজেলার আজমপুর এলাকার আলাল উদ্দিন সজিবের (৩৫) নামও উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় বলা হয়েছে, তারা পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক কারবার পরিচালনা করে আসছিলেন।
এ ঘটনায় ধর্মপাশা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শরীফুল ইসলাম বাদী হয়ে মাদক আইনে বকুল চন্দ্র সরকার, সজল মজুমদার, তার স্ত্রী মর্জিনাসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
এ মামলায় সজল ও তার স্ত্রী মর্জিনা আক্তারকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে বকুল চন্দ্র সরকার, তার সহযোগী আলাল উদ্দিন সজিবসহ অন্যরা পলাতক রয়েছেন।
জানা গেছে, বকুল চন্দ্র সরকার মোহনগঞ্জ শহরের তুলাপট্টি এলাকায় ‘রিপন হোমিও’ নামের একটি হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকান পরিচালনা করেন। এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে ওই দোকান থেকে ১২৮ বোতল রেকটিফায়েড স্পিরিট উদ্ধার করা হয়। সে সময় বকুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কয়েক মাস কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জামিনে বের হওয়ার পর তিনি আবারও একই কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন এবং এবার ধর্মপাশা, জামালগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে স্পিরিটের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেছেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায়ও বকুল সরকারকে মোহনগঞ্জের দোকানে ব্যবসা করতে দেখা গেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
বকুল চন্দ্র সরকারের পাশের হোমিও চিকিৎসক সাগর সরকার বলেন, ‘বকুলকে প্রতিদিন দোকান খুলতে দেখি। পলাতক আসামি হলে প্রকাশ্যে ব্যবসা করছে কীভাবে, বুঝলাম না।’
মোহনগঞ্জ শহরের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, বকুল চন্দ্র সরকারের প্রকৃত বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বৃষ্ণপুর এলাকায়। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর অর্থায়ন ও প্রশ্রয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই ভয়ংকর মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন।
হাফিজুর রহমান আরও বলেন, বকুল সরকারকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত হোতাদের পরিচয় বেরিয়ে আসবে। মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা না গেলে হাওরাঞ্চলের যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা আরও ভয়াবহ মাদকের ঝুঁকিতে পড়বে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সহিদ উল্যা বলেন, ‘দুজন মাদক কারবারিকে গাঁজা ও রেকটিফায়েড স্পিরিটসহ গ্রেপ্তার করার পর তাদের জবানবন্দিতে বকুল চন্দ্র সরকারের নাম উঠে এসেছে। পরে মামলায় তাকেও আসামি করা হয়েছে। এখন জানতে পারলাম যে, বকুল সরকার আগে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জেও রেকটিফায়েড স্পিরিটসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বকুল সম্প্রতি মাদকের কারবার হাওরাঞ্চলে সম্প্রসারণ করেছেন। তাকে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হবে।’
আরটিভি/এসএস



