
আমনের ভরা মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় টিএসপি সারের সংকট দেখা দিয়েছে। বাড়তি দাম দিতে চাইলেও অনেক কৃষক চাহিদামতো টিএসপি সার পাচ্ছেন না। বিশেষ করে চরাঞ্চলের কৃষকেরা পড়েছেন বেশি বিপাকে। তবে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, সারের কোনো ঘাটতি নেই বরং কৃষকদের অতিরিক্ত টিএসপি ব্যবহারের প্রবণতার কারণেই সংকটের ধারণা তৈরি হয়েছে।
রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলায় টিএসপি সার নিয়ে কৃষকদের এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষকদের ভাষ্য, ইউরিয়া ও ডিএপি সার মোটামুটি চাহিদামতো পাওয়া গেলেও টিএসপি সার সংগ্রহ করতে একাধিক দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার বনগ্রাম এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম আট বিঘা জমিতে রোপা আমন চাষ করেছেন। তার প্রয়োজন ১০০ কেজি টিএসপি সার। ছয়টি দোকান ঘুরে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৪৫ কেজি। এর মধ্যে ১৫ কেজি কিনেছেন সরকার নির্ধারিত ২৭ টাকা কেজি দরে। বাকি ৩০ কেজির জন্য প্রতি কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৈলমারী এলাকার কৃষক বাবলু মিয়া ১২ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। তার প্রয়োজন ১৭০ কেজি টিএসপি সার। বিপরীতে এখন পর্যন্ত পেয়েছেন মাত্র ৫০ কেজি। তার দাবি, চাহিদার ২০ শতাংশও টিএসপি সার সরবরাহ পাচ্ছেন না। ইউরিয়া ও ডিএপি সার পাওয়া গেলেও সেগুলো কিনতে নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।
রংপুরের গংগাচড়া উপজেলার মহিপুর তিস্তা চরের কৃষক মোন্নাফ মিয়া ১০ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। তার প্রয়োজন ১৫০ কেজি টিএসপি সার। তিন দিন ধরে বিভিন্ন দোকানে ঘুরেও পেয়েছেন মাত্র ৫০ কেজি। এ জন্য তাকেও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়েছে।
চরাঞ্চলের কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বেশি। কৃষকদের দাবি, রংপুর অঞ্চলের ৮৮৩টি চরের অনেক এলাকায় সার বিক্রির কোনো দোকান বা ব্যবসায়ী নেই। ফলে দূরের বাজারে গিয়ে সার সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা এলাকার সার ডিলার জুলহাস হোসেন বলেন, তার দোকানে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১০ হাজার কেজি টিএসপি সারের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরকারি বরাদ্দ পেয়েছেন মাত্র ৫০০ কেজি। ফলে কৃষকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন। গত বছর এ অঞ্চলে ৬ লাখ ২১ হাজার ৩৯৮ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছিল।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সূত্র জানায়, সরকার প্রতি কেজি ইউরিয়া ও টিএসপি সারের খুচরা মূল্য ২৭ টাকা এবং ডিএপি সারের মূল্য ২১ টাকা নির্ধারণ করেছে। ডিলাররা সরকারের কাছ থেকে নির্ধারিত খুচরা মূল্যের চেয়ে কেজিপ্রতি ২ টাকা কমে সার কেনেন।
রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমন ধানের চারা রোপণের সময় টিএসপি সারের ব্যবহার খুব বেশি প্রয়োজন হয় না। তবে কৃষকেরা বিষয়টি না বুঝে টিএসপি সারের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। তার দাবি, ইউরিয়া ও ডিএপি সারের মাধ্যমেও প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যায়। কৃষকদের অসচেতনতার কারণে তারা প্রয়োজনের তুলনায় ৫ থেকে ৬ গুণ বেশি টিএসপি ব্যবহার করছেন। এ কারণে সরকারি বরাদ্দ তাদের কাছে কম মনে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আদর্শ কৃষির তথ্যের ভিত্তিতে টিএসপি সারের চাহিদাপত্র তৈরি করে সরকারকে পাঠানো হয় এবং সেই অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত টিএসপি ব্যবহারে জমির উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হতে পারে। কৃষকদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে রংপুর আঞ্চলিক বিএডিসির সার বিভাগের যুগ্ম পরিচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, সারের কোনো ঘাটতি নেই। আগামী অক্টোবর পর্যন্ত পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। কৃষি বিভাগ যে পরিমাণ চাহিদাপত্র পাঠায়, সে অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে এবং তালিকাভুক্ত ডিলারদের মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
তার দাবি, কোথাও সার সংকট বা বেশি দামে বিক্রির ঘটনা ঘটলে তা ডিলারদের অতিরিক্ত লাভের আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণে হতে পারে। বিষয়টি কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন মাঠপর্যায়ে তদারকি করছে।
আরটিভি/এসকে



