
দুপুরের একটু পর, নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যালয়ে ছুটির সময় হয়নি তখনও। কিন্তু রাস্তা দিয়ে একের পর এক শিক্ষার্থীকে বাড়ি ফিরতে দেখে গাড়ি থামান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল। কাছে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফেরার কারণ জানতে চাইলে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রী জানায়, তাদের জোরপূর্বক ছুটি দেওয়া হয়েছে।
গাড়ি থেকে নেমে অন্যান্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে আরও নানা অনিয়মের অভিযোগ। শিক্ষার্থীরা জানায়, সরকারি নির্ধারিত ছুটির সময়ের আগেই তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া, নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, ক্লাস চলাকালে ঘুমানো, মোবাইলে ফেসবুক দেখা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ করে তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবালের কাছে। ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
পরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ে যান ইউএনও। সেখানে কোনো শিক্ষককে না পেয়ে মোবাইল ফোনে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন তিনি। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করেন।
পরে বই-খাতা হাতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে একটি ছবি তুলে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল। সেখানে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের করা অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। মুহূর্তেই ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
জানা গেছে, রোববার (১৬ আগস্ট) চরঈশ্বর ইউনিয়নের কয়েকটি রাস্তার উন্নয়নকাজ পরিদর্শনে যান ইউএনও রাসেল ইকবাল। এ সময় দক্ষিণ রাজের হাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের একটি সড়ক পরিদর্শনে যাচ্ছিলেন তিনি। বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় অনেক শিক্ষার্থীকে বাড়ি ফিরতে দেখে গাড়ি থামান তিনি।
শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে জানতে চাইলে তারা জানায়, তাদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রায়ই তাদের ছুটি দিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করে তারা। এ সময় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসা, উপস্থিত থাকলেও নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, ক্লাস চলাকালে ঘুমানো এবং মোবাইলে ফেসবুক দেখায় ব্যস্ত থাকাসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে। শিক্ষকদের অশোভন আচরণের অভিযোগও করে শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, আমাদের ছেলে-মেয়েরা জানিয়েছে, শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন। বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজল রানী পাল বলেন, পরদিন থেকে বিদ্যালয়ে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। তাই শিক্ষার্থীরা আগে ছুটি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই নির্ধারিত সময়ের একটু আগে তাদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। তবে আমার কয়েকজন সহকারী শিক্ষকের ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ আচরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আগেই অবহিত করেছি। বিষয়টি নিয়ে তদন্তও হয়েছে। কিন্তু এরপরও তারা নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আনেননি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে আমি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ পরিদর্শনে বের হয়েছিলাম। ওই বিদ্যালয়ের সামনেও একটি রাস্তা ছিল। সেখানে যাওয়ার পর ছাত্রছাত্রীরা আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য দাঁড়িয়েছিল। তখন তাদের অভিযোগগুলো শুনি। পরে তাদের নিয়ে আবার বিদ্যালয়ে গিয়ে কোনো শিক্ষককে পাইনি। বিষয়টি আমি শিক্ষা কর্মকর্তা ও তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বলেন, অনিয়মের বিষয়ে আমরা অবহিত হয়েছি। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে। কৈফিয়ত পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আরটিভি/টিআর


